ই-শিক্ষায় বৈষম্য দূর করে Zaya Learning Labs

0

ভারত অসম বিকাশের দেশ। একদিকে যখন প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষা বদলে দিচ্ছে ভারতীয় শিক্ষাজগতের মানচিত্র অন্যদিকে প্রান্তিক মানুষদের কাছে পৌঁছচ্ছে না শিক্ষার আলো। শিক্ষার মানের এই ফারাকটা মেটাতেই শুরু Zaya Learning Labs।

আইআইএম প্রাক্তনী সোমা বাজপেয়ী ও সিসকোর প্রাক্তন ইঞ্জিনিয়ার নীল ডিসুজা ২০১৩ সালে মুম্বইতে শুরু করেন এই সংস্থা। উদ্দেশ্য, সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশের ছাত্রছাত্রীদের কাছে বিশ্বমানের শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া। ৫০ টি স্কুলের ২০০০ ছাত্রছাত্রীকে পরিষেবা দেয় এই স্টার্ট আপ।

সিসকোতে চাকরি করার সময়ই পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য কিছু করার কথা ভাবছিলেন নীল। ভাবছিলেন কী ভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তিক এলাকায় ছড়িয়ে থাকা ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার বৈষম্য দূর করা যায়। জায়া নামটি দেন তাঁরই এক উজ্জ্বল মঙ্গোলিয়ান ছাত্রী আইরুণ জায়ার নাম অনুসারে। আইরুণ সমস্ত রকম বাধা অতিক্রম করে মঙ্গোলিয়ার দূরবর্তী অঞ্চলের এক অনাথ আশ্রমে পৌঁছে দিয়েছিলেন ডিজিটাল বই।

ভারতে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করার পর এখন জাম্বিয়া ও অন্যান্য বৈদেশিক বাজারে পৌঁছচ্ছে Zaya Learning Labs। “ইন্টারনেটে উচ্চমানের ডিজিটাল কনটেন্টের অভাব নেই। কিন্তু যারা সমাজের নীচতলায় বাস করে, সেইসব প্রান্তিক ছাত্রছাত্রীদের কাছে অধিকাংশ সময়ই তা পৌঁছয় না। দুর্বল ইন্টারনেট কানেকশন, শিক্ষকদের অনিচ্ছা, বিদ্যুৎ সমস্যা, ইন্টারনেটের দাম, উপযুক্ত ডিভাইস না থাকা, রয়েছে শতেক সমস্যা। আমরা এদের কাছেই পৌঁছতে চাই, যে সমস্ত স্কুলে এই ধরণের পরিস্থিতি রয়েছে তাদের জন্যই আমাদের ক্লাস ক্লাউড”, জানালেন নীল।

জায়া ক্লাস ক্লাউড হল একটি ছোট, শ্রেণীকক্ষ নির্দিষ্ট তারবিহীন যন্ত্র। এই যন্ত্রে পাঠক্রম অনুযায়ী যাবতীয় কনটেন্ট দেখা, ডাউন-লোড করা ও স্টোর করার ব্যবস্থা রয়েছে। সুযোগ রয়েছে দুর্বল ইন্টারনেট কানেকশন বা কোনও কানেকশন ছাড়াই শ্রেণীকক্ষে তা ব্যবহার করার।

জায়ার শিক্ষা পদ্ধতিও পুরনো আমলের থেকে অনেকটাই আলাদা। শিক্ষক বলবেন আর ছাত্রছাত্রীরা শুনবে এই সাবেক পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে জায়া নিয়ে এসেছে ‘blended learning’ পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে শিক্ষক ও ছাত্রের সমান অংশগ্রহণ থাকে। ট্যাবলেটে পড়াশোনা, শিক্ষকের থেকে জানা ও ছাত্রদের নিজেদের মধ্যে একসঙ্গে কাজ করা এই তিনটি পদ্ধতি ব্যবহৃত হয় এই শিক্ষা ব্যবস্থায়। ছাত্র তার নিজের গতিতে শেখে, ফলে শিক্ষা হয় সম্পূর্ণ।

ক্লাসক্লাউডের সফটওয়্যার, কনটেন্টটি কীভাবে ব্যাবহৃত হচ্ছে তা বিশ্লেষণ করে, এই ব্যাবহারের ফলে ছাত্রদের কতটা উন্নতি হচ্ছে তাও বিশ্লেষণ করে ক্লাসক্লাউড। এরফলে শিক্ষক বুঝতে পারেন কনটেন্টটি শিক্ষার্থীর কাজে লাগছে কিনা।

সমস্যা রয়েছে নানারকম। কনটেন্টের এইরকম পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা হওয়ায় কনটেন্ট তৈরির লোক পাওয়া মুশকিল হয়, আবার ভারতীয় সময় অনুযায়ী কাজ করতে চান না অনেকে। কিন্তু জায়ার লক্ষ্য, প্রযুক্তি ব্যাবহার করে আর্থ-সামাজিক বৈষম্যকে কমানো।

পিয়ারসনের শিক্ষার শুরুয়াতির জন্য বিনিয়োগ পুঁজি, ‘পিয়ারসন অ্যাফোরডেবল লার্নিং ফান্ড’ থেকে বিনিয়োগ পায় জায়া। এছাড়াও আইআইএম প্রাক্তনী এবং গ্লোবাল রিসার্চ অ্যাট বার্কলের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ভবতোষ বাজপেয়ীর থেকেও আর্থিক বিনিয়োগ মেলে।

বেশিরভাগ শুরুয়াতির মতই Zaya Learning Labs এর অধিকাংশ কর্মীর বয়সই কুড়ির কোঠায়। জায়ার অগ্রগতির জন্য এই তরুণ কর্মীদেরই কৃতিত্ব দিতে চান নীল, বললেন, “এই ছেলেমেয়েরা খুবই বুদ্ধিদীপ্ত এবং প্রতিভাবান, আর এরা প্রত্যেকেই চায় আমাদের দেশের শিক্ষার মানচিত্রটাকে বদলে দিতে। প্রত্যেকেই একইরকম ভালবেসে কাজটা করে”।


গতবছরে কর্মী সংখ্যা পাঁচ থেকে তিরিশে পৌঁছিয়েছে, আরও কর্মী নিয়োগ হচ্ছে। কাজে সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানে উদ্ভাবন আনার জন্য কর্ম সংস্কৃতিতে জোর দিতে চান নীল।

অন্যান্য শিক্ষা-প্রযুক্তি কোম্পানির থেকে আলাদা জায়া। পৃথিবীজুড়ে শিক্ষা জগতের যে বৈষম্য তা দূর করতে নতুন নতুন পদ্ধতি ব্যাবহার করতে চায় এই স্টার্ট আপ। তাই এটা বলাই যায় যে আগামী দিনে পৃথিবীর শিক্ষায় প্রযুক্তির বাজারে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম হয়ে উঠতে চলেছে Zaya Learning Labs।

শিক্ষায় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলির কাছে ভারতবর্ষ খুবই লোভনীয় বাজার। আশা করা হচ্ছে আগামী পাঁচ বছরে ১.৫ মিলিয়ন নতুন বিদ্যালয় খুলবে এই দেশে। তবে সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, রয়েছে সমস্যাও। এই ক্ষেত্রে সকলেই জানেন প্রযুক্তির মাধ্যমে সবসময় সঠিক ফলাফল পাওয়া যায় না।

এই ক্ষেত্রের অন্যান্য কোম্পানিগুলি একটু দেখে নেওয়া যাক। কোচিং সেন্টার ভিত্তিক সমস্ত কোর্স অনলাইনে পাওয়া যায় Edukart এ। বেঙ্গালুরুর iNurture Education Solutions এ পাওয়া যায় উচ্চশিক্ষায় প্রয়োজনীয় জিনিস, অনলাইন এবং অফলাইনে। MeritNation.com সিবিএসই, আইসিএসই সহ যেকোনো বোর্ডের ক্লাস I থেকে XII এর ছাত্রছাত্রীদের জন্য। মুম্বই-এর Toppr, জয়েন্ট এন্ট্রান্স ও মেডিক্যালের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য।

শিক্ষায় ইন্টারনেটের ব্যবহার ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে, এবং সেই ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য কাজ করছে Zaya Learning Labs।

Related Stories