মাকে খুঁজতে সময় লেগে গিয়েছিল ২৫ বছর

2

সারু ব্রিয়ারলির জীবন আজ খোলা পাতার মত। এতটাই, যে সিনেমা পর্যন্ত হয়ে গিয়েছে। হলিউডের সিনেমা। নিকোল কিডম্যানের অভিনয় দেখার মত। অস্কার মনোনীত হয়েছে সেই ছবি। লায়ন। কদিন আগেই কলকাতায় এসেছিলেন সারু। আরও একবার কাহিনিটি সকলকে বলছিলেন। গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। বুরহানপুর, খান্দোয়া, কলকাতা, হাওড়া, ক্যানবেরা, তাসমানিয়া সব কেমন পাশের গ্রাম মনে হচ্ছিল। কীভাবে দুটো গোলার্ধ একটি বিপন্ন শিশুর জীবনের সুতো দিয়ে গেঁথে গিয়েছে। সেই কাহিনি আরও একবার চোখের সামনে ভেসে উঠল। সারু বলছিলেন তার জন্ম বৃত্তান্ত আর শিকড়ের সন্ধানে ভারত দর্শনের কথা। মায়ের মুখ দেখে তার প্রথম অভিজ্ঞতার কথা। বলছিলেন নিরন্ন শৈশবের কাহিনি। বলছিলেন কলকাতায় তাঁর মধুর স্মৃতি নেই। এখন এই শহরের বিভিন্ন রাস্তা ঘাট দেখলে আতঙ্ক হয়। ইনফোকমের মঞ্চে সারু বলছিলেন তার নিজের জীবনের কথা।

ওঁর আত্মজীবনী A Long Way Home দেশে বিদেশে বেশ জনপ্রিয়। সেই বই থেকেই সিনেমা। সারু ধারাবাহিক ভাবে লিখতে চান নিজের জীবনের কাহিনি।

শেরু মুন্সি খান। মধ্যপ্রদেশের খান্দোওয়ার একটি ছোট্ট গ্রাম গণেশ তালাইয়ে ১৯৮১ সালে জন্মেছেন। কিন্তু দারিদ্রের তাড়নায় বাবা ছেলে মেয়েদের ছেড়ে পালিয়ে যান। মা ফাতিমা মুন্সি অসহায় হয়ে পড়েন। সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ারও সামর্থ্য ছিল না। বড় দুই ভাই রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করত। স্টেশন চত্বরে মার্কামারা ভিখিরি হয়ে যায় দাদা গুড্ডু। ছোট্ট শেরু, দাদার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরত। একদিন বুরহানপুরে দাদার হাত ধরে আসে শেরু। তারপর মাঝরাস্তায় আর দাদাকে খুঁজে পায় না। শুরু হয় দাদাকে খোঁজার লড়াই। ভুল করে একটি মালগাড়িতে উঠে পড়ে ছেলেটা। মালগাড়ি কু ঝিক ঝিক করে ছুটতে থাকে। গাড়ি থেকে আর নামতে পারে না পাঁচ বছরের ছোট্ট শেরু। অজানা অচেনা পথ পেরিয়ে মায়ের থেকে দেড় হাজার কিলোমিটার দূরে হাওড়ায় চলে আসে সে। কলকাতায় শুরু হয় অন্য লড়াই। মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। খাবার নেই। পথের কোণে অবহেলা আর অসৎ লোকের ছোবল আছে। সব মিলিয়ে বিভীষিকার সেই দিনগুলো ওর এখনও মনে আছে। তবে সেদিন কোনও ক্রমে একটি সরকারি হোমে ঠাঁই পাওয়ায় বেচে গিয়েছিল ছেলেটি। এবং কপালের জোরে এক অস্ট্রেলিয়ান দম্পতির দত্তক নেওয়ায় নিশ্চিত অন্ধকার থেকে মুক্তি পান শেরু মুন্সি খান ওরফে সারু ব্রিয়ারলি। ব্রিয়ারলি এই নতুন মা বাবার সারনেম। অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণের এক ছোট্ট দীপ তাসমানিয়ার হোবার্টের এই দম্পতি শেরুকে মানুষ করতে কোনও কার্পণ্য করেননি। ক্যানবেরায় অস্ট্রেলিয়ান ইন্টারন্যাশনাল হোটেল স্কুল থেকে বিজনেস অ্যান্ড হসপিটালটি নিয়ে পড়াশোনা করে। দত্তক বাবার ব্যবসা সামলানো শুরু করেন। পাশাপাশি নিজের জন্মদাত্রী মায়ের খোঁজটাও ছাড়েন না। সে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, স্যাটেলাইট ইমেজ দেখে দেখে ঠিক বছর পাঁচেক আগে পৌঁছে যান নিজের মার কাছে।

তারপর সবাই সবটা জানেন। বিশ্বের সব মিডিয়ায় বেরিয়েছিল সেই খবর। তাঁর বইয়ের সিক্যুয়াল করার পরিকল্পনা রয়েছে। কলকাতায় কিছু সমাজসেবা মূলক কাজ করছেন সারু। তবে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ওঁর শিকড়ে ফেরার অদম্য টান আর জীবন সংগ্রামের হিম্মত। সারু, দুনিয়াটাকে উল্টে পাল্টে দেখার সুযোগ পেয়েছেন জীবনের কঠিন সময়েও সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন। ফলে উদার আর সাহসী হতে পেরেছেন এই অসামান্য মানুষটি। তাই নিজে কোনও ধর্ম, কোনও নির্দিষ্ট বিশ্বাসের ঘেরাটোপে পড়ে থাকেননি। তিনি বিশ্ব নাগরিক হয়ে উঠেছেন।