ব্যবসার মোড়কে সমাজসেবা, উদ্যোক্তা ডিজাইনার শ্বেতা

0

পড়াশোনা, পেশা সবটাই স্থাপত্য কেন্দ্রীক। আপাতত বাস নিউইয়ার্কে। হোম টাউন মুম্বই। কাজে অকাজে নানা ছুতো নাতায় কখনও দেশে কখনও বিদেশে, পায়ে তলায় শর্ষে যেন। স্থাপত্য পেশাটিও ঘুচে গিয়েছে। এখন তিনি কিডসওয়ার ডিজাইনার, শিশুদের পোশাক ডিজাইন করেন। এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকা তাঁর কম্মো নয়। দেশের সীমানাকে যিনি মানতে রাজি নন, দুরত্বটা ঘুচে গেলেই সব মীমানাই নিজের দেশ, ঘর-বাড়ি। এমন সব ভাবনা গিজগিজ করে শ্বেতা মুদগালের মাথায়।

আট হাজার মাইলের দূরত্বটাকে সরিয়ে দিলে নিউইয়র্ক আর মুম্বই-অবাধ বিচরণ তাঁর। দুটি জায়গার দূরত্ব ওই আট হাজার মাইল-একটা শহরে বাস, আরেকটা শহরে কাজ। সীমানার বাঁধা ঘুচিয়ে তাঁর তৈরি শিশুদের ফ্যাশন ব্র্যান্ডের নামও রেখেছেন তাই-‘এইট থাউসেন্ট মাইলস’।শুরু করেছেন এক বছর আগে।

পেশায় স্থপতি, এয়াপোর্ট ডিজাইন বিশেষজ্ঞ শ্বেতার কেরিয়ার সবসময় স্পিংবোর্ডের মতো কখনও এদিক, কখনও সেদিক। একটা বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা একেবারে না পসন্দ শ্বেতার। সবসময় নতুন কিছুর জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কয়েক বছর আগে নিউ ইয়ার্কের একটি সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে মুম্বই বিমানবন্দরের একটি প্রকল্পে কাজের প্রস্তাব পান, যেটা ছিল শ্বেতার কাছে ড্রিম অফার, স্বপ্নের প্রস্তাব। ‘এর চাইতে আর ভালো কিছু হতে পারে না। আমি আমার শহর মুম্বইয়ের জন্য কাজ করছি আমারই প্রিয় শহর থেকে’, তিনি বলেন। তখন থেকে শ্বেতা,তাঁর স্বামী,তাঁদের তিন বছরের কন্যা কখনও থেমে খাকেননি। ‘নিউ ইয়র্কে আমরা ছিলাম ১১ বছর, তারপর এক বছরের জন্য সিঙ্গাপুর, এরপর ফিরে আসি মুম্বই। এখন নিউইয়র্কে। এবং এভাবে থাকতেই আমরা ভালোবাসি’, বললেন স্থপতি শ্বেতা।

এভাবে এদেশ ওদেশ করে ঘুরে বেড়ানোর আদর্শে অণুপ্রানিত শ্বেতা নিজের ব্র্যন্ডেরও নামকরণ করছেন সেভাবে। ‘’এইট থাউসেন্ট মাইলস’ বিশ্বাস করে এমন ঘরে যার কোনও সীমা থাকে না। আমরা বিশ্বাস করি , প্রত্যেক মানুষ কারও অনুগামী হয়ে নয়, স্বাতন্ত্র নিয়ে জন্মায়, মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াতে বাধা নেই। নিষ্পাপ, নিরঅহংকার শিশুদের মধ্যে এই ধারণা আরও গভীরভাবে ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করে’, শ্বেতার ব্যাখ্যা। স্থপতি কাম ডিজাইনার বহুমুখী প্রতিভার শ্বেতা মুম্বই এবং নিউ ইয়র্ক দুটি শহরে সমান তালে ব্যবসা সামলান। এবং যেখানে সুবিধা মনে করেন তেমন বাজারে নিজের ব্র্যন্ড নিয়ে পোঁছে যান শ্বেতা। প্রথম যখন পোশাকের ব্র্যান্ডের ব্যবসা শুরু করবেন ঠিক করছিলেন তখন পেশাদার এবং বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন ইউনিট খুঁজছিলেন টিম তৈরি করার জন্য। কিন্তু এভাবে ব্যবসা চালাতে গিয়ে মনের সঙ্গে সংযোগ বা টান তৈরি হচিছল না। শ্বেতা বুঝতে পারেন ব্যান্ডের আদের্শের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে সামাজিক দায়বদ্ধতাকে ব্যাবসার মডেল করতে হবে।

আধার স্কিল ডেভেলপমেন্ট ট্রাস্ট নামে একটি এনজিওর সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। ওই এনজিও মূলত সমাজের প্রান্তিক মহিলাদের ক্ষমতা অনুযায়ী কাজ শিখিয়ে দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করে। ভারতে ‘এইট থাউসেন্ট মাইলস’এর সেলাই বিভাগে ছ-সাতজন মহিলার একটা দল রয়েছে। ‘তাঁরা প্রতিদিন প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, তারপর ব্র্যান্ড তৈরিতে নিজেকে সম্পৃক্ত করে নিচ্ছেন’, বলেন শ্বেতা। তিন জানান, মহিলাদের দলটিকে যা ডিজাইনের ভিত্তিতে মজুরি দেওয়া হয়। শ্বেতা যোগ করেন, ‘এইট থাউসেন্ট মাইলস’ দুরকম ডিজাইন ট্র্যাকে পরিচালিত হয়-উৎপাদিত অর্থাৎ ক্রিয়েটেড ট্র্যাক (মূল উৎপাদনের ৯০ শতাংশ) এবং সংকলিত বা কিউরেটেড ট্র্যাক (মূল উৎপাদনের ১০ শতাংশ)। এএসডিটির যে মহিলারা কাজ করেন তাঁরা ক্রিয়েটিভ লাইনের দিকটা সামলান। অন্য দিকে কিউরেটেড ট্র্যাকের জন্য কিছু কারিগর নির্বাচন করা হয় যাদের বোহেমিয়ান-চিক ডিজাইন নান্দনিক এবং এইট থাউসেন্ড মাইলসের জন্য তাঁরা বাছা বাছা অল্প কিছু কালেকশান তৈরি করেন কমিশনের বিনিময়ে। ‘সারা দেশের শিল্পী ও ডিজাইনারদের সমন্বয়ে তৈরি এখনও পর্য়ন্ত আমাদের কাছে রকমারি যা ডিজাইন রয়েছে এবং বাজার বুঝে কিছু পোশাক অন্য ব্র্যান্ডের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছে, যেগুলি বাজারে ছাড়া হয় এইট থাউসেন্ট মাইলসের কিউরেটেড ট্র্যাকের অধীনে’, বলেন শ্বেতা।

নিজের ওয়েবসাইটে ‘এইট থাউসেন্ট মাইলস’ অনলাইন খুচরো বিপনীতে শক্ত জমি তৈরি করে ফেলেছে। যদিও শ্বেতা বলেন বিক্রি বেশি অফলাইনে অর্থাৎ সরাসরি। অফলাইন বাজারই কেন এই ব্যান্ডের জন্য সঠিক পছন্দ, তার অনেকগুলি কারণ রেয়েছে। ‘প্রথমত, এনজিওর মাধ্যমে ছোট্ট ইউনিট গড়ে উৎপাদনের ফলে আমাদের ক্ষমতা সীমিত’, শ্বেতার ব্যাথ্যা । এর ফলে একই রকম কালেকশনের বিরাট স্টক থাকে না, যার পরিবর্তে নিত্য নতুন অল্প সংখ্যক উৎপাদনে বেশি উৎসাহী যেগুলি বাজারে অথবা মেলায় বিক্রি করা সহজ। দ্বিতয়ত, ব্র্যান্ডের আরেকটি দিক হল ক্রেতারের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্তরে যোগাযোগ তৈরি করা। মুম্বই থেকে নিউইয়র্ক কতটা দূরে এবং দুটো শহরের ক্রেতারা কতটা আলাদা সেসব ভাবায় না শ্বেতাকে। যারা তাঁর ব্র্যান্ডের পোশাক কেনেন তাদের কী প্রতিক্রিয়া দেখতে চান তিনি এবং ক্রেতাদের কাছ থেক মতামত সংগ্রহ করেন। কারণ, তিনি মনে করেন, এটা সেই সেতুবন্ধন যা এই ব্র্যন্ডের চালিকাশক্তি। ‘আমারদের কিছু নির্দিষ্ট ক্রেতা রয়েছেন। তাঁরা আমাদের ভালোবাসেন কারণ তাঁরা আমাদের ব্র্যান্ডের প্রেক্ষাপটকে ভালোবাসেন’, বলেন শ্বেতা। যদিও শ্বেতা নিউইয়র্কের বড় কোনও ব্র্যান্ডের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে খুবই আগ্রহী কিন্তু এইট থাউসেন্ড মাইলসের জন্য মুম্বইয়ের বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘’এইট থাউসেন্ট মাইলস’ থেকে শপিং-এর জন্য ক্রেতাদের কাছে কোনও ছুতোর প্রয়োজন হয় না। বছরের যেকোনও সময় তাঁরা এখান থেকে কেনাকাটা করেন কারণ, তাঁরা আমাদের আদর্শ এবং মানের কদর করেন। বাড়িতে বাচ্চা না থাকলেও বাচ্চাদের কাপড় কেনেন এই ভেবে যে প্রয়োজনে প্রতিবেশীকে দিয়ে দেবেন’, বলে চলেন শ্বেতা।

সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়া ‘এইট থাউসেন্ট মাইলস’এর জন্য যেমন বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি আরও একটা সমস্যা ভালোই ভোগাচ্ছে শ্বেতাকে। সেটি হল সেলাই বিভাগের মহিলা কর্মীরা সময়মতো কাজ ওঠাতে পারছেন না। চার জনের একটা নিয়মিত দল সবসময় থাকলেও বাকি মহিলারা অনিয়মিত হয়ে পড়ছেন। কাউকে কাউকে কাজ ছেড়ে দিতে হচ্ছে, কাউকে স্বামীর সঙ্গে চলে যেতে হচ্ছে,কেউবা পরিবারকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে কাজ ছেড়ে দিচ্ছেন। শ্বেতার ব্র্যান্ডকে এই সবকিছুর সঙ্গে লড়তে হচ্ছে এবং শ্বেতা বলেন, ‘আরও একটা ইউনিট বাড়ানোর কথা ভাবছি। অন্যান্য অলাভজনক সংস্থাগুলি আমরা প্রতিনিয়ত খুঁজে চলেছি, যাদের সেলাই ফোঁড়াই করার লোক রয়েছে, তাদের আমরা সহযোগী করে নিতে পারি অথবা সহ ব্র্যান্ড তৈরি করতে পারি’। এর ফলে ব্যবসা যেমন বাড়বে সামাজিক প্রভাবও হাতে হাত ধরে চলবে। ‘এইট থাউসেন্ট মাইলস’এর এই উদ্যোগের মজা হল এটা এমন একটা আদর্শের আবর্তে তৈরি যা সীমা বোঝে না, অসীমে বিশ্বাস করে। সীমা শারীরিকভাবে বেঁধে দিতে পারে, মানসিকভাবে নয়। ব্যবসা সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ হতে পারে, এবং বিশ্বের একেবারে অন্য প্রান্তেও চালানো যেতে পারে।তফাৎটাই শিক্ষণীয় এবং নিজের মধ্যে সেটাকে গেঁথে ফেলা সবসময় সম্ভব।