গল্পের ছলে চিকিৎসা করাই সাফল্যের চাবিকাঠি ডঃ শরদের

0

আপনি বলতে পারেন যে ইউরোপিয়ানদের গায়ের রঙ সাদা অথচ ভারতীয়দের শ্যামলা কেন? বা ভারতে বর্তমানে চিকিৎসা শাস্ত্রের সবথেকে বেদনাদায়ক বিষয় কোনটা? অথবা প্রতি বছর যদি ৩ হাজার করে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর বিনামুল্যে চেক আপ করাতে হয় তাহলে কী ব্যাবস্থা করতে হবে? আসলে এই সব প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে হলে হয় আপনাকে পৌঁছাতে হবে নির্দিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ মানুষগুলোর কাছে অথবা আপনাকে শরণাপন্ন হতে হবে এমন একজনের কাছে, যিনি একাধারে চিকিৎসক, লেখক, ব্যাবসায়ী এবং আদ্যোপান্ত একজন পরোপকারী মানুষ – ডঃ শরদ পল। ওঁর লেখা একটা বই ‘স্কিন, আ বাওগ্রাফি’ সারা পৃথিবীতে বেশ একটা আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। অনেকেই বইটা পড়েছেন আর খুব ভালো সাড়া পাওয়া গেছে পড়ুয়াদের থেকে।

শরদ - বাকি লাউঞ্জে
শরদ - বাকি লাউঞ্জে

আসলে প্রচলিত নিয়ম-কানুন বা প্রথার বিরুদ্ধে গিয়ে নতুন কিছু একটা করার নেশাই তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। নিজেকে একজন সৃজনশীল মানুষ বলেই মনে করেন তিনি আর এই সৃজনশীলতা থেকেই তিনি সবসময় চেষ্টা করেন নতুন কিছু করার, নতুন কিছু ভাবার। তিনি যে বিষয়ে হাত দিয়েছেন সেই বিষয়েই বিশেষ কিছু একটা করার তাগিদ অনুভব করেছেন তিনি। চিকিৎসাশাস্ত্রে তিনি শল্য চিকিৎসার নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন এবং হেলথ ইনোভেশন পুরষ্কার পেয়েছেন। একজন কথাসাহিত্যিক হিসাবে মানুষের জন্য একটা বিশ্বাসযোগ্য গল্প তৈরি করাই হোল তার আসল কাজ। এছাড়া নিজস্ব ব্যাবসার কাজেও তিনি সবসময় সবাইকে উৎসাহিত করেন যাতে ব্যাবসার জায়গাটা এমন একটা জায়গা বানানো যায় যাতে সেখানে গেলে মানসিক আনন্দ পাওয়া যায়।

মননে আর শরীরে আমি ভারতীয়

আসলে ছোটবেলায় যখন ডঃ শরদ তার বাবা-মায়ের সাথে প্রথমবার ভারতে এসেছিলেন তখন থেকেই তার মধ্যে একটা সামাজিক সচেতনতাবোধ জেগে গেছিলো। একটা মেডিকেল মিশনের কাজে তার বাবা-মা তাকে নিয়ে ভারতে এসেছিল, যদিও পরবর্তীকালে তাকে তার ভারতীয় পাসপোর্ট জমা করতে হয় কিন্তু এই দেশের সাথে আত্মার টান তৈরি হয়ে গেছিল তখন থেকেই। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেরালেও তিনি উপলব্ধি করেন যে ভারতের প্রতি তার টানটা অকৃত্রিম। তার মধ্যে একটা ভারতীয় সত্ত্বা আছে, যেটাকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। জন্মসূত্রে ইংল্যান্ডবাসী আর পদবী ‘পল’ হওয়ার জন্য তিনি প্রচুর ভালো ভালো কাজের সুযোগ পেলেও সামনে থেকে তাকে দেখে বা তার ভারতীয়স্বরুপ মানসিকতা দেখে সেইসব কাজের সুযোগগুলো সব হাতছাড়া হয়ে যায় তার।

উনি বলছিলেন যে আসলে শুনতে অনেকটা প্রবাদবাক্যের মতো হলেও ভারতের সাথে তার সম্পর্ক অনেকটা ব্যাক্তিগত, আনঅফিসিয়াল, অনেকটা বিশ্বাসের। তিনি বলছিলেন চিকিৎসাশাস্ত্রে তার নতুন আবিষ্কার এবং পারদর্শিতাকে তিনি আরও বেশি করে কাজে লাগাতে চান আর সেই কারনেই তিনি ভারতের কোন ইউনিভার্সিটিতে ভিসিটিং-প্রোফেসর হিসাবে কাজ করতে খুব ইচ্ছুক। তিনি চান এখানকার হাসপাতাল গুলতেও তার সার্জারির জ্ঞান কাজে লাগিয়ে এখানকার চিকিৎসাশাস্ত্রকে আরও উন্নত করে তুলতে।

রোগীকে নিজের কেউ ভাবতে পারাটাই সফল চিকিৎসকের বিশেষ গুণ

একজন সফল শল্যচিকিৎসকের দৃষ্টিকোণ থেকে হোক বা ‘মেডিকেল ইন্সিটিউট অফ অস্ট্রেলিয়া অ্যান্ড নিউজিল্যান্ড’ এর একজন শিক্ষক হওয়ার সুবাদে তিনি মনে করেন যে চিকিৎসাশাস্ত্রে (বিশেষত শল্যচিকিৎসায়) সবথেকে বড় অসুবিধা হোল বেশিরভাগ জায়গায় ব্যাবসায়িক চিন্তা ভাবনা থাকার জন্য রোগীর ঠিক যা দরকার তারথেকে বেশি কিছু করা হয়ে যায় অথবা ভুল চিকিৎসা করা হয়ে থাকে যা আখেরে রোগীর অসুবিধার কারণ হয়ে ওঠে। সবথেকে বড় কথা হোল প্রচুর টাকা থাকলেও অনেক সময় সঠিক চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব হয়না আর এখানেই তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন যে নিজের রোগীদের যদি নিজের পরিবারের একজন মনে করা যায় আর সেইভাবে চিকিৎসা করা যায় তাহলেই তাকে সঠিক চিকিৎসা করা সম্ভব – আর এই মন্ত্র কাজে লাগিয়েই তিনি তার প্র্যাকটিস চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি তার ছাত্রদেরও এই শিক্ষাই দেন। তিনি নিজের প্র্যাকটিসের সময় খুব কম খরচে রোগী দেখেন আবার কখনো কখনো বিনা পয়সাতেও চিকিৎসা করে থাকেন। আসলে তিনি মনে করেন চিকিৎসা-বিজ্ঞানের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত জনস্বাস্থের উন্নতি করা আর সেই কাজের জন্য এমন কিছু লোকজন দরকার যারা নিঃস্বার্থ ভাবে এই পেশায় যুক্ত হবেন এবং নিজের কাজের প্রতি একটা দায়বদ্ধতা থাকবে, যারা এই পেশায় একটা বড়সড় পরিবর্তন আনতে পারবে।

শতাব্দীর সেরা না হলেও দশকের সেরা বই

কল্প-বিজ্ঞানের বাইরে গিয়ে প্রথমবারের জন্য একটা আখ্যান লেখা খুব একটা সহজ কাজ ছিলনা ডঃ শরদের জন্য। তার লেখা ‘স্কিন, আ বাওগ্রাফি’ একটা অন্য মাত্রা এনে দিয়েছে সাহিত্যের জগতে। এর আগে তিনি যা সব লিখেছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘কুল কাট’, ‘টু কিল্ আ ড্রাগনফ্লাই’, ‘কাইট ফ্লায়ারস’ এর মতো রচনা। কিন্তু ‘স্কিন, আ বাওগ্রাফি’ আসলে একটা আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে লেখা এবং সেই কারণেই এত বেশি জনপ্রিয়। ডঃ কামাত, একজন সমালোচক বলেছেন যে ‘এই বইটা এই দশকের সেরা বই, যদি না শতাব্দীর সেরা হয়’। এরকম একটা মন্তব্য যেকোনো লেখকের জন্যই বেশ রোমাঞ্চকর এবং আনন্দের।

একজন কল্প-বিজ্ঞান লেখক হিসাবেও তিনি যথেষ্ট সফল আর এক্ষেত্রেই তিনি মনে করিয়ে দেন যে বিদেশ থেকে কেউ একজন তাকে ইমেল করে জানিয়েছিলেন যে তার লেখা ‘টু কিল্ আ ড্রাগনফ্লাই’ তাদের এক প্রিয়জনের মৃত্যুর পর সেই দুঃখ ভুলতে সাহায্য করেছে। আই.বি.এন এর একজন সমালোচক, নন্দিতা বোস, বইটি প্রসঙ্গে বলেন যে ‘এই বইয়ের বিশালত্ব এতটাই যে একে মহাকাব্য বললেও ভুল বলা হয়না, এই বইটা আসলে লেখকের অসামান্য প্রতিভারই বহিঃপ্রকাশ মাত্র’।

বেঁচে থাকার রশদ

অস্ট্রেলিয়াতে ‘বাকি লাউঞ্জ’' নামে একটা বুকষ্টোর খুলেছেন ডঃ শরদ, একমাত্র যেখানে টাইমের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্করণ গুলো পাওয়া সম্ভব। আর এই ব্যাবসাকে ভারতে খোলার জন্য তিনি একজন ভারতীয় পার্টনার চাইছেন যিনি সফলভাবে এই ব্যাবসাকে ভারতে চালাতে পারবেন। তিনি মনে করেন যে এই ব্যাবসা টা ভারতেও ভালো চলতে পারে। এছাড়াও তিনি ‘বাকি কস্মেটোলজি ' নামে একটা স্কিন কেয়ার কোম্পানি চালাচ্ছেন অস্ট্রেলিয়াতে আর সেখানেই তিনি এখন বেশ ব্যাস্ত। তবে এই শুরুয়াতি ব্যাবসার সাফল্লের পথটা খুব একটা মসৃণ ছিলনা। তিনি বলছিলেন যে আসলে তিনি একজন চিন্তাশীল এবং সামাজিক মানুষ ছিলেন প্রথমে, মন থেকে ব্যাবসায়ী তিনি কখনই ছিলেন না। কিন্তু মানুষের মধ্যে প্রতিদিনই নতুন কিছু করার একটা চাহিদা সবসময়ে থাকে এটা তিনি উপলব্ধি করেন। তাই জীবনে কিছুটা নতুনত্তের স্বাদ দিতে বা কিছুটা ভ্যালু অ্যাড করতে গিয়ে আস্তে আস্তে তিনি হয়ে পরলেন একজন ব্যাবসায়ী বা বলা যেতে পারে একজন সফল উদ্যগপতি। তিনি মনে করেন যে সব উদ্যোগী যেমন ব্যাবসায়ী হতে পারেনা তেমনি উল্টোটাও সত্যি। ডঃ শরদের কাছে আসলে টাকা রোজগার করাটা শুধু বেঁচে থাকার রশদ মাত্র, সেটা কখনই তার জীবনের লক্ষ্য নয়।

স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে মেলবন্ধন

ডঃ শরদের মতে তিনি বিশ্বাস করেন যে প্রতিটা মানুষ একবার করে সুযোগ পায় এই পৃথিবীর বুকে কিছু করে দেখানর জন্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হোল এই জীবদ্দশায় বেশিরভাগ মানুষের ঠিক ঠিক যা যা করা দরকার তা না করে সে নিজেকে মত্ত রাখে জাত-পাত, ভেদা-ভেদির মতো কিছু বিষয় নিয়ে। ইহুদি, খৃস্টান বা ইসলামীরা ভাবছে স্বর্গ, নরক নিয়ে আবার হিন্দু, বৌদ্ধরা বিশ্বাস করেন পুনর্জন্মে। আবার নাস্তিকরা ভাবছে তাদের নিজের মতো করে। কিন্তু আসলে সবাই ব্যাস্ত নিজেকে নিয়েই। কিভাবে অন্যের থেকে বেশি সম্পত্তি তৈরি করা যায় বা আরও বড় হওয়ার জন্য কখনো কখনো অন্যের ক্ষতি করার প্রবণতা। কিন্তু তিনি মনে করেন যে একে অপরকে সাহায্য করার মধ্যে যে আত্ম-উপলব্ধি তা মানুষ ভুলে গেছে এখন। পরস্পরের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন না করে যদি মিলিত প্রচেষ্টায় মানুষ সত্যিকারের কিছু করার চেষ্টা করে তবে নিশ্চয়ই ভালো দিন দেখা সম্ভব। কিন্তু আমরা যদি আমাদের একটু অমুল্য সময় ব্যয় করি কোন ভালো কাজের জন্য, তবেই একমাত্র এই জন্মের স্বার্থকতা পাওয়া সম্ভব।

স্টেডিয়ামে বাচ্চাদের সামনে বক্তৃতা দিচ্ছেন ডঃ শরদ
স্টেডিয়ামে বাচ্চাদের সামনে বক্তৃতা দিচ্ছেন ডঃ শরদ

স্টেডিয়াম ভর্তি ছাত্র-শিক্ষক দের সামনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি বলছিলেন যে, বিরত্তের প্রকৃত নিদর্শন দেখানোর মতো ক্ষমতা আমার আপনার মতো মানুষের মধ্যেই থাকে। সাধারণ মানুষই পারে অসাধারণ কিছু করে দেখাতে। ভালো কিছু করে দেখানোর বীজ লুকিয়ে থাকে আমার আপনার মতো সাধারণের মধ্যেই। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত আমাদের প্রতিটা কাজের হিসাব রাখতে শুরু করা। প্রতিটা কাজের যদি একটা সঠিক কারণ থাকে তবেই সেটাকে করে একটা আনন্দ উপলব্ধি করা সম্ভব। আর এখানেই জীবনের সার্থকতা।

তিনি অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা বা সমাজে পিছিয়ে পরা বাচ্চাদের পড়াশুনা করান বিনা পয়সায়। তিনি সেখান মানুষকে সৃজনশীল হতে। বাচ্চাদের সাথে তিনি তার মনের যে ভাব শেয়ার করেন, মনে মনে তিনি চান যে সারা পৃথিবীর মানুষ এইভাবে ভাবুক নিজের জীবন নিয়ে। আত্মবিশ্বাস টাই হোল আসল সম্পদ, তাই তিনি মনে করেন যদি নিজেই নিজের স্বপ্ন কে মানুষ অবিশ্বাস করে, তাহলে সেই স্বপ্ন বাস্তব করে তোলা আর কারো পক্ষেই সম্ভব না।

(লেখা- অলক সনি, অনুবাদ- নভজিত গাঙ্গুলী)