শুভলক্ষ্মীর নামে ডাকটিকিট বের করল রাষ্ট্রসংঘ  

এম এস শুভলক্ষ্মী। শতবর্ষ পেরনো এই সরস্বতীর বর কন্যাকে সম্মান জানালো রাষ্ট্রসংঘ। ভারতরত্ন আগেই পেয়েছেন। অনেক আগে পেয়েছেন ম্যাগসেসে, পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ। এবার প্রকাশিত হল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আর সম্মাননার ডাকটিকিট।

3

আজ থেকে ঠিক ৫০ বছর আগে রাষ্ট্রসংঘে অনুষ্ঠান করেছিলেন প্রখ্যাতা ভারতীয় সঙ্গীতজ্ঞ এমএস শুভলক্ষ্মী। তাঁর নামাঙ্কিত একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করল রাষ্ট্রসংঘের পোস্টাল বিভাগ। ডাকটিকিটটির মূল্য ১.২০ মার্কিন ডলার। এবছরই এমএস শুভলক্ষ্মীর জন্ম-শতবর্ষ। সেই উপলক্ষেই তাঁকে সম্মানিত করা হল রাষ্ট্রসংঘের তরফে।

রাষ্ট্রসংঘের সদর দফতরে সম্প্রতি এই উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ওই অনুষ্ঠানে প্যারিস ক্লাইমেট চুক্তিতে ভারতের ইতিবাচক ভূমিকাকে স্মরণ করা হল। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের বিরুদ্ধে লড়াই চালানো বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রসংঘের সদর দফতরে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ সুধা রঘুনাথন এমএস শুভলক্ষ্মীর সঙ্গীত পরিবেশন করলেন। সেই সঙ্গে বাজল মহাত্মা গান্ধীর প্রিয় রাম ধুনও।

রঘুনাথন সাতটি ভাষায় সঙ্গীত পরিবেশন করেন। তার ভিতর ছিল বাংলাও। শ্রোতাদের কাছ থেকে উচ্চ প্রশংসিত হলেন। রধুনাথনকে সম্মান জানিয়ে এমএস শুভলক্ষ্মীর নামাঙ্কিত প্রথম ডাকটিকিটটি তাঁকে উপহার দেওয়া হল।

এমএসের আর একটি নাম কুঞ্জআম্মা। ১৯১৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর মাদুরাইতে জন্ম কুঞ্জআম্মার। তাঁর বাবা-মা বীণা বাজাতেন। আর ঠাকুমা আক্কাম্মাল বাজাতেন ভায়োলিন। কুঞ্জআম্মার মা ছিলেন দেবদাসী সম্প্রদায়ের মেয়ে। নিয়মিত মঞ্চানুষ্ঠানও করতেন তিনি। তিন সন্তান, ভাই ও তাঁদের স্ত্রীদের গ্রাসাচ্ছাদনের জন্যে এই কাজটা করতেই হত তাঁকে।

ছোটবেলা থেকেই গানবাজনায় আগ্রহ কুঞ্জআম্মার। প্রথম গুরু তাঁর মা-ই। সেইসময় শিখেছেন সেমমানগুডি শ্রীনিবাস আয়ারের কাছে। পরে হিন্দুস্থানি সঙ্গীত শিক্ষা নেন পণ্ডিত নারায়ণ রাও ব্যাসের কাছে। পরে শেখেন পল্লবী সঙ্গীত। শিক্ষাগুরু ছিলেন এমএস ভাগবতার। এরপরেই মঞ্চানুষ্ঠান শুরু করেন কুঞ্জআম্মা। সেখানে বীণা বাজাতেন মা। মাত্র ১০ বছর বয়সেই কুঞ্জআম্মা তাঁর প্রতিভাকে পরিচিত করান।

১৯৩০ সালে মাকে নিয়ে চেন্নাইতে চলে আসেন কুঞ্জআম্মা। সেখানে সঙ্গীতজ্ঞা হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভের‌ জন্যে সংগ্রাম শুরু করেন। চেন্নাইতে তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় বিশিষ্ট সাংবাদিক ও স্বাধীনতা সংগ্রামী টি সদাশিবমের। ১৯৪০ সালে তাঁকেই বিয়ে করেন। স্বামীর দেশপ্রীতি কুঞ্জআম্মাকেও দেশের স্বাধীনতা লাভের কাজে উদ্বুদ্ধ করেছিল। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে জাতীয় নেতাদের উপস্থিতিতে সেইসময় তিনি জাতীয়তাবাদী গান পরিবেশন করতেন। পরে সি রাজাগোপালাচারীর মাধ্যমে জওহরলাল নেহরু ও মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে আলাপ হয় তাঁর। রাজাগোপালাচারী ছিলেন তাঁর স্বামীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

মহাত্মাকে ভজন শুনিয়েছিলেন এমএস শুভলক্ষ্মী। এর তিন বছর পরে ১৯৪৪ সালে কস্তুরবা মেমোরিয়াল ট্রাস্টের জন্যে অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্যে পাঁচটি কনসার্টে অংশ নেন। গ্রামের মেয়ের সহায়তায় কাজ করছিল কস্তুরবা মেমোরিয়াল ট্রাস্ট। সামাজিক কাজের জন্যে পরেও একাধিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন তিনি।

১৯৩৭ থেকে ১৯৪৭। এই সময়কালে বেশ কয়েকটি ছায়াছবিতে অভিনয় করেছিলেন এমএস শুভলক্ষ্মী। সেগুলির ভিতর রয়েছে সেবা সদন, শকুন্তলার মতো ছবি। সাবিত্রী নামে একটি ছবিতে পুরুষের ভূমিকায় অভিনয় করেন। চরিত্রটি ছিল নারদের। সাবিত্রী সিনেমাটি করা হয়েছিল জাতীয়তাবাদী তামিল সাপ্তাহিক কল্কির প্রকাশ করার উদ্দেশে। মীরা ছবিতে মীরাবাঈয়ের ভূমিকাতেও অভিনয় করেছিলেন তিনি। আসলে নিজের শিল্পীসত্তাকে বরাবরই দেশের কাজে নিয়োজিত রেখেছিলেন শুভলক্ষ্মী। ১৯৫০ সালে মীরা ছবিটি ফের হিন্দিতে করা হয়েছিল।

এমএস শুভলক্ষ্মীর হিন্দিতে গাওয়া ভজনগুলি তাঁকে দক্ষিণ ভারতের গণ্ডি থেকে বের করে এনে সারা দেশে পরিচিতি দেয়। তবে মানুষ হিসাবে তিনি ছিলে নিরভিমানী। বলবার মতো একটি বিষয় হল, কোনওদিন কোনও সংবাদ মাধ্যমকে ইন্টার্ভিউ দেননি শুভলক্ষ্মী।

জীবনে বহু পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৫৪ সালে পান পদ্মভূষণ, ১৯৭৪ সালে রামণ ম্যাগসেসে, রাষ্ট্রপতি পুরস্কার, ১৯৭৫ সালে পদ্মবিভূষণ, ১৯৮৮ সালে কালিদাস সম্মান, কোণারক সম্মান, সঙ্গীত নাটক একাডেমির ফেলোশিপ, ইন্দিরা গান্ধী অ্যাওয়ার্ড এবং দেশিকোত্তম উপাধিতে সম্মানিত করা হয়েছে তাঁকে। ১৯৯৬ সালে এমএস শুভলক্ষ্মীকে দেশের সর্বোচ্চ পুরস্কার ভারতরত্ন দেওয়া হয়। পুরস্কারের অর্থ বহু ক্ষেত্রে তিনি দান করেছেন সেবামূলক কাজে।