‘সোনার’ ফসলে নতুন পথের হদিশ

0

কোচবিহার মানে শুধু শীতলপাটি নয়, পাট দিয়ে তৈরি এখানকার নানা‌ সামগ্রীর এখন চমকে দিচ্ছে। বাইরেও ভাল কদর তৈরি হয়েছে। নতুন পথের খোঁজ পেয়ে পাটজাত সামগ্রী তৈরি হচ্ছে জেলার বেশ কিছু জায়গায়। এই হস্তশিল্পের ভরসায় স্বনির্ভর হয়েছে কোতয়ালির ডাওয়াগুড়ি গ্রাম। মেলা, প্রদর্শনীতে গিয়ে শিল্পীরাও বুঝতে পেরেছেন পরিবেশবান্ধব পাটের সামগ্রীর বিশাল বাজার।


তিস্তা, তোর্সা, কালজানি, জলঢাকার মতো অজস্র নদী। উর্বর মাটি এবং ভৌগলিক পরিবেশের জন্য কোচবিহার জেলা পাটচাষের জন্য একেবারে আদর্শ। এই জেলার পাটচাষে প্রায় এক লক্ষ মানুষ যুক্ত। বছরে উত্পন্ন হয় প্রায় সাড়ে ৪ লক্ষ মণ পাট। এই বিপুল পরিমাণ পাট বাইরে রফতানি হলেও এখন এর অনেকটাই জেলাতেই ব্যবহার হচ্ছে। কারণ পাট দিয়ে নানা সামগ্রী তৈরির ধুম লেগেছে কোচবিহারের কোতয়ালির ডাওয়াগুড়ি এলাকায়। হাতের নাগালে সস্তায় পাট কিনে ঘর সাজানোর হরেক জিনিস তৈরি হচ্ছে ঘরে-ঘরে। মা-বউরা নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় সুন্দর সব জিনিস তৈরি করছেন। আর বিক্রির ব্যবস্থা করছেন বাড়ির পুরুষ সদস্যরা। এই যেমন অজিত দেব। বছর তিনে আগেও সোফার কাজ করতেন এই যুবক। স্ত্রী রাখি পাটের কাজ করলেও ওদিকে তেমন মন দিত না তাঁর। কিন্তু পাটজাত সামগ্রী নিয়ে বাইরে বেরোনোর পর বুঝতে পারেন প্লাস্টিক সরিয়ে পাটকেই মানুষ আপন করে নেয়। তাই অজিত এখন পুরোদস্তুর পাটশিল্পী। বিপণনটাও দেখেন। অজিতের মতো ওই গ্রামের প্রতিটি পরিবারই এখন পাটজাত সামগ্রী তৈরিতে ব্যস্ত থাকেন। সোনালি আঁশ এখন এইসব পরিবারের মুখে হাসি ফুটিয়েছে।


এলাকার পাটশিল্পীরা স্থানীয় ডাওয়াগুড়ি বাজার থেকে পাট কিনে আনেন। এক মণ পিছু দাম পড়ে হাজার দুয়েক টাকা। বাড়িতে পাট ঝাড়াই বাছাই করতে হয়। বেশ কয়েক দফা এই পর্ব চলার পর অন্যান্য কিছু জিনিস পাটের সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি হয় পাপোষ, ব্যাগ, ফুলদানি বা ঘর সাজানোর নানা সামগ্রী। মণ পিছু হাজার চারেক টাকা খরচ হলেও পাটজাত এই সমস্ত সামগ্রী প্রায় পনেরো হাজার টাকার বিক্রি হয়। শীতলপাটির যেখানে রাজ্যজোড়া নাম তেমন এই শিল্পীরাও চান পাটের কারুকাজের জন্যও কোচবিহারের পরিচয় হোক। এজন্য নিজেদের উদ্যোগে কেউ কেউ কলকাতা, শিলিগুড়ি, বর্ধমান বা কল্যাণীতে হস্তশিল্প মেলা বা প্রদর্শনীতে যোগ দিচ্ছেন। সাড়াও মিলছে ভাল। প্রতি মেলা থেকে পনেরো থেকে কুড়ি হাজার পকেটে আসে শিল্পীদের। পাটশিল্পী নমিতা রায় বলেন, ‘স্বামী গাড়ি চালায়। সংসারে সাহায্য করব বলে আমি চট দিয়ে নানারকম সামগ্রী তৈরি করি। দুটো পয়সা আসায় ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা নিয়ে আর চিন্তা করতে হয় না।’ এভাবেই পাটের হাত ধরে একটু একটু করে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে কোচবিহার শহর লাগোয়া এই জনপদ।


বাড়িতে বসে কাজ। সারাবছর জোগান। অসংগঠিত হওয়ায় বিপণনের ক্ষেত্রে কিছুটা সমস্যায় পড়ছেন এইসব শিল্পীরা। এরজন্য সমবায় করে এগোনোর চেষ্টা চলছে। বেশ কিছু স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য ঝুঁকি নিয়ে বাইরের রাজ্যে যাওয়ার চিন্তা ভাবনা করছেন। প্লাস্টিকের দাপটে এখানে কদর না হলেও বিদেশে পরিবেশবান্ধব পাটজাত সামগ্রীর যে বিপুল চাহিদা তারা জানতে পেরেছেন। এরজন্য গতানুগতিক সামগ্রী ছেড়ে পাট দিয়ে নানারকম শো পিস তৈরি করছেন শি‌ল্পীরা। বিভিন্ন মাধ্যম দিয়ে শীতলপাটির মতো বিদেশের বাজারে পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন অজিত দেব, অমল সরকারের মতো উদ্যমীরা। এই ভাবনাই এই শিল্পকে ধীরে ধীরে পৌঁছে দিয়েছে অন্য উচ্চতায়।