মেডিক্যাল ব্যাঙ্ক গড়ে কলকাতার পাশে ডি আশিস

0

মানুষ মানুষেরই জন্য। মানুষের পাশে থাকার জন্য কোনও সঙ্কল্প করতে হয়নি ওঁকে। উত্তর কলকাতার বনেদি এলাকা শোভাবাজারে বড় হয়েছেন। ডি আশিস। ছোটবেলা থেকেই মানুষের পাশে থাকতে ভালোবাসেন। সত্তর-আশির দশক পর্যন্ত উত্তর কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছিল বস্তি। দরিদ্র বস্তিবাসীরা রোগে পড়লে ওষুধ কিনতে পারতেন না অর্থাভাবে। কলেজে পড়বার সময় পাড়ার বন্ধুবান্ধবদের জুটিয়ে আশি‌স করে ফেললেন এক স্বেচ্ছাসেবা আন্দোলন। কিছুটা ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া ওষুধ সংগ্রহ করে তা গরিব মানুষের ভিতর বিলিয়ে দিতেন ওঁরা। তাতে অসুখে পড়লেও দরিদ্র বস্তিবাসী মানুষটি প্রাণে বাঁচতেন।

এভাবে হয়েছিল শুরু। এরপর ১৯৮০ সালে আশিস ও তাঁর সঙ্গীরা গড়ে ফেললেন মেডিক্যাল ব্যাঙ্ক নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। এই সংস্থা চলে মানুষের দানের টাকায়। সংস্থার সম্পাদক আশিস বললেন, সরকারি কোনও দান আমরা গত ৩৬ বছরে নিইনি। কেবলমাত্র মানুষের দানের টাকায় আমরা কাজ করছি।

কাজের ক্ষেত্র স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে। মেডিক্যাল ব্যাঙ্কের নিজস্ব প্যাথোলজিক্যাল ল্যাব, অ্যাম্বুল্যান্স, প্রয়োজনে রক্ত দেওয়া, সারা বাংলা জুড়ে সময়ে-সময়ে রক্তদান শিবির বা স্বাস্থ্য সচেতনতা সম্প‌র্কিত শিবিরের আয়োজন করে থাকে মেডিক্যাল ব্যাঙ্ক। এছাড়া, ফুটপাথবাসী ও পথশিশুদের কল্যাণমূলক স্বাস্থ্য নিয়ে বছরভর নানা ধরনের অনুষ্ঠান করা হয় মেডিক্যাল ব্যাঙ্কের তরফে। বয়স্ক দরিদ্র মানুষজনকেও গত ৩৬ বছর হয়ে গেল স্বাস্থ্যপ পরিষেবা দিয়ে চলেছে মেডিক্যাল ব্যাঙ্ক।

ডি আশিস বললেন, স্কুলে পড়ার সময়ই দেখেছি, উত্তর কলকাতায় এই এলাকার দরিদ্র মানুষজন বিনা ওষুধে মারা ‌যাচ্ছেন। মানুষের চোখের জল মুছিয়ে দেওয়ার আশা পেয়ে আসছি নিজের কাজ থেকে। স্বামীজি বিবেকানন্দই আমার আদর্শ। স্বামীজিকে মাথায় নিয়ে মানুষের সেবা করি। কত বাধাই তো কেটে গেল!

১৯৮০ সালে ১৭জন স্থানীয় বন্ধুকে নিয়ে মেডিক্যাল ব্যাঙ্ক নামে সংস্থাটি খুলেছিলেন ডি আশিস। সেদিনের ওই বন্ধুরা সকলেই আজও তাঁর পাশে আছেন। সবাইকে ধরে রেখেছেন আশিস। আশিস বললেন, মানুষের কাজ করতে নেমে খবরদারি করলে জোট ভেঙে যায়। আমি তেমন কখনও করিনি।

২০জন সর্বক্ষণের স্বেচ্ছাসেবী আছে মেডিক্যাল ব্যাঙ্কের। এছাড়া, সঙ্গে আছেন বহু শুভানুধ্যায়ী মানুষ। আশিস মনে করেন, অর্থবল ও লোকবল থাকলে যে কোনও কাজই একশো ভাগ ভালো হতে পারে। বললেন, সরকারি টাকা নিই না। কারণটা হল মেডিক্যাল ব্যাঙ্ক সরকারি অনুমোদনের ছাপমারা কোনও সংস্থা হতে চায় না। গত তিন দশকে আমরা সত্যিই মানুষের কোনও উপকার করতে পেরেছি কিনা তা মানুষই বলবেন। তাছাড়া, মানুষ আমাদের টাকাপয়সা দান করেন বলে আমরা সংস্থাটা বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছি।

ডি আশিসের কথাটার ভিতরকার গভীর সত্য বলতে ধারাবাহিকতা। বহুক্ষেত্রে বহু বাঙালি উদ্যোগ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। পারস্পরিক ঠকাঠকি থেকে শুরু করে আন্তরিকতার অভাবে বেশ কিছু উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। বিনি পয়সায় মানুষকে মরতে দেখেছিলেন আশিস। দরিদ্র ওই মানুষগুলি স্রেফ পয়সা না থাকার জন্য স্বাস্থ্য পরিষেবাগুলি গ্রহণ করতে পারেননি। কৈশোরে আশিস স্বপ্ন দেখেছিলেন, একদিন তিনি দরিদ্র মানুষগুলির জন্য কাজ করবেন। স্বপ্ন সফল করার পথে নানা বাধা ছিল। কেননা, কাজের শুরুতেই আশিস সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিলেন, রাজনীতির সঙ্গে জড়াবেন না। সেবা ও রাজনীতি মেশাবেন না।

এজন্য কিছু‌টা চাপ স্বভাবতই সামলাতে হয়েছে আশিসকে। তবে, ধৈর্য্যের খেলায় তিনিই জিতেছেন। তার কাজের ক্ষেত্র বাড়ছে। এখন সেটা রাজ্য জোড়া। কলকাতায় ওঁদের কাজ চলছে সারাটা বছরই।

স্থানীয় মানুষজনের কাছে মেডিক্যাল ব্যাঙ্ক একটি অতি পরিচিত নাম। শোভাবাজার মোড় থেকে হাঁটাপথে বড়জোর মিনিট দশেক এগোলেই মেডিক্যাল ব্যাঙ্কের অফিস। ‌স্থানীয় যে কেউ অফিসের ঠিকানা চিনিয়ে দেবেন। এলাকার মানুষের কাছে ডি আশিসও অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য একটি নাম। আপদে-বিপদে মানুষ তাকে সঙ্গী হিসাবে পুরস্কৃত করেছে।

সমাজসেবামূলক কাজের স্বীকৃতিতে একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন ডি আশিস। ২০০৮ সালে ধীরুভাই আম্বানি ফাউন্ডেশন তাঁকে সম্মানীত করেছে। ২০০৯ সালে আনন্দলোক তাঁকে সালাম বেঙ্গল সম্মানে অভিষিক্ত করে। ২০০৯ সালে পেয়েছেন গডসে-ব্রেভারি অ্যাওয়ার্ড।

নামটি অন্যরকমভাবে লেখেন আশিস। নামের আগে ব্যবহার করেন পদবীর আদ্যক্ষর দত্ত। কেউ ফোন করলে বলেন, ডি আশিস বলছি। লেখেনও ওইভাবেই।

কিন্তু, এইরকমভাবে নিজের নামটি কেন ব্যবহার করেন? তাঁর কাছেই জানা গেল ব্যাপারটা মজাদার। কলেজে পড়ার সময় একজন অধ্যাপক নাকি রোল কলের সময় ছাত্রদের পদবীটা আগে বলতেন। আশিস বললেন, ব্যাপারটা আমার ভালো লেগেছিল। পরে সেটা নিজের নামের ক্ষেত্রে স্থায়ী করে নিলাম। সমাজসেবার ক্ষেত্রে আসলে এখনও আমি একজন সাধারণ ছাত্র।