একজন উদ্যোগপতির অন্তহীন দ্বন্দ্ব ও কিছু কথা

0

যে মুহূর্তে আপনি আপনার নিজস্ব ব্যবসা শুরু করবেন তৎক্ষণাৎ আপনি উপলব্ধি করবেন যে একজন উদ্যোগপতির জীবন এমন সব দ্বন্দ্ব আর সংকটে ভরা যেগুলোর কোনও সহজ সমাধান হয়না।

হ্যাঁ, আমরা হয়ত ২০০০ সালের ডট কম ক্রাশ থেকে কিছু শিক্ষা নিতে পেরেছি, যা এখনও একই ভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু এখন আমরা যে পরিস্থিতিতে কাজ করছি তা আগেকার চেয়ে অনেক জটিল ও প্রগতিশীল। ফলে এখন উত্তরের চেয়ে প্রশ্নের সংখ্যায়ই বেশী।

আর সমস্যা হল, অধিকাংশ উদ্যোগপতিদের হাতের কাছে এমন কেউ নেই যারা তাদের এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন। আত্মীয় পরিজনদের প্রশ্ন করে লাভ নেই কেননা তাঁদের ব্যবসায়িক অনুষঙ্গ নেই, আর এই বাজারে অভিজ্ঞ পরামর্শদাতা পাওয়াও চাট্টি খানি কথা নয়।

সাংগঠনিক আপোষ

সমস্যার শুরুয়াদ আপনি কি ধরণের সংস্থা গঠন করতে চাইছেন সেই থেকেই।

কেউ আপনাকে বলবে 'লীন স্টার্ট' (Lean Start up) আপ দিয়ে শুরু করতে, আবার কেউ উপদেশ দেবে বড় আকারে চিন্তা করার।

‘লীন’ স্টার্ট আপ হল এমন এক শুরুয়াতি যা নিজস্ব রিসোর্সের জোরে সাফল্যের দিকে যাত্রা করে, ‘মিনিমাম ভায়াবল প্রোডাক্ট’ এর ভিত্তিতে তৈরি, এবং প্রকৃত ক্রেতার ইনপুটের ভিত্তিতে বিভিন্ন রদ বদল আনা হয়ে থাকে। আর অন্যদিকে বড় আকারে চিন্তা করার অর্থ হল এমন শুরুয়াতি যার আকাশ ছোঁয়া পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করবার জন্য দরকার অল্প-বিস্তর বিনিয়োগ এবং সাফল্যের জন্য দরকার বিপুল চিন্তা ভাবনা।

আর আপনার যদি প্রচুর পুঁজি না থাকে তাহলে এই ব্যাপারগুলো সবচেয়ে জরুরী হয়ে ওঠে, কেননা ব্যবসায় টিকে থাকবার জন্য আপনার শুরুর এই সিদ্ধান্তটাই মূল ভূমিকা পালন করে।

তো আপনার ঠিক কোন রাস্তায় যাওয়া উচিৎ? ব্যবসা শুরু করার ক্ষেত্রে কি উচ্চাভিলাষ এর চেয়েও সতর্কতা জরুরী?


প্রোডাক্ট এর ক্ষেত্রে আপোষ

আপনি কি ধরণের প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ করছেন তা কেবল আপনার সংস্থার ওপর নয়, এমনকি আপনার ব্যবসায়িক সাফল্যেও বিশেষ ভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। 

একটি নতুন নির্মিত প্রোডাক্ট বা পরিষেবার উচিৎ একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর ক্রেতার চাহিদার দিকে নজর রাখা যে চাহিদা আগে কখনো ছিলোনা। অথবা তা এমন হওয়া উচিৎ যা বর্তমান বিকল্প প্রোডাক্টের চেয়ে সস্তা ও যথেষ্ট ভালো। কিন্তু এই “যথেষ্ট ভালো” আসলে কতো ভালো?  

আপনাকে কি প্রতি টা পুঙ্খানুপুঙ্খ বিষয়েই নিজর দিতে হবে, এমনকি প্যাকেজিং টাকেও করে তুলতে হবে পিকচার পারফেক্ট? নাকি আপনি কেবলই শিপিং ডেটের দিকে নজর রেখে ক্রেতার হাতে তুলে দেবেন একটি গোলমেলে ও ভুলে ভরা প্রোডাক্ট?

অনেকেই আপনাকে বলবে যে ফেসবুক বা গুগলের পুরনো ভার্সান গুলি ছিল ভুলে ভরা। আবার অনেকেই আপনাকে অ্যাপেল এর বিশ্বব্যাপী হিট হয়ে ওঠার পিছনে তাদের প্রোডাক্টের নিখুঁত পুঙ্খানুপুঙ্খ বিষয়গুলি নিয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা দেবে।

কোন রাস্তাটি বেছে নেওয়া উচিৎ? কোন পথে গেলে মিলবে লক্ষ্মীর ঝাঁপি?


মার্কেটের ক্ষেত্রে আপোষ

কেবল একটা দুর্ধর্ষ প্রোডাক্ট তৈরি করাই সব নয় – আপনার বিপণন কৌশলের মাত্রাতেও স্বচ্ছতা দরকার।

তাহলে এখন মূল প্রশ্নটা হল- প্রতিযোগিতা কতটা জরুরী? আপনার কি কেবল বাজার চলতি প্রতিযোগিতার দিকেই নজর রাখা উচিৎ নাকি প্রতিযোগিতা কে উপেক্ষা করে এমন একটা কিছু নির্মাণ করা উচিৎ যা আগে কেউ কখনো করেনি?

পিটার থিল তাঁর ‘জিরো টু ওয়ান’ গ্রন্থে বলছেন যে ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি আপনাকে একটা পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। এবং তাঁর মতে কেবল ক্রমবর্ধমান অগ্রগতিই যথেষ্ট নয়, দরকার টুকটাক মামুলি ব্যাপার স্যাপার কে সরিয়ে রেখে আরও সাহসী পদক্ষেপ। অন্যদিকে, এরিক রাইস তাঁর ‘লীন স্টার্ট আপ’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন নিরমান, পর্যালোচনা ও শিক্ষার মত আইটারেটিভ সাইকেল এবং ক্রমাগত টেস্টিং ও পরীক্ষা নিরীক্ষার ভালো দিকগুলি।

কিন্তু এঁদের মধ্যে কে সঠিক? কোন পথ টি বেছে নিলে আপনি আপনার বহু প্রতীক্ষিত সাফল্যের শৃঙ্গ ছুঁতে পারবেন?


পুঁজির ক্ষেত্রে আপোষ

আর উপরিউক্ত এই সমস্ত সমস্যাগুলির সব সমাধান যদি আপনার কাছে থেকেও থাকে তাহলেও আরও একটা জরুরী বিষয় তো আছেই, যা সবচেয়ে জরুরী রিসোর্সগুলির মধ্যে অন্যতম – টাকা!

আর এক্ষেত্রেও, কোন পথটিকে আপনি বাছবেন সেটা সর্বদাই যেন একটা দুরূহ ধাঁধার মতোই গোলমেলে। কেননা প্রত্যেকটি ব্যবসার ক্ষেত্রেই ব্যবহার যোগ্য পুঁজির পরিমাণ সর্বদাই সীমিত, ফলত টাকা খরচের ক্ষেত্রেও আপনাকে হতে হয় সাবধানী।

তো, কোনটা আপনার জন্য আদর্শ? প্রাথমিক পুঁজির মাধ্যমে দ্রুত বৃদ্ধির হার কে সুনিশ্চিত করা নাকি বহির্বিনিয়োগের হার কে বিলম্বিত করে মালিকানা ও ক্ষমতা কে আরও বেশী করে নিজের হাতে রাখা? আপনার কি উচিৎ কোম্পানির আয়ের দিকে নজর দেওয়া, নাকি সামগ্রিক বৃদ্ধি ও ক্রেতা অর্জনের দিকে নজর দেওয়া যাতে আপনার প্রতিযোগী আপনাকে খোলা বাজারের খেলায় বাজিমাত করে বেড়িয়ে না যায়?

এই দ্বন্দ্ব নিরূপণের শ্রেষ্ঠ রাস্তা কোনটা?


আমার 'আমি' কে খোঁজা

এক্ষেত্রে একজন উদ্যোগপতির কি করা উচিৎ?

আমার মতে এই জার্নিটা এক অর্থে অনেকটাই নিজেকে খোঁজারও। হ্যাঁ, কিভাবে ইকোসিস্টেম কিভাবে কাজ করে, ব্যবসা কিভাবে হয়, এবং অর্থনীতির ট্রেন্ড কে কিভাবে আপনার উদ্দেশ্যসাধনের ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যায় এগুলি জানাটা জুরুরি। কিন্তু এর পাশাপাশি নিজেকে জানাও জরুরী, নিজের পছন্দ ও অগ্রাধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা, কোনটা আপনার কাছে সত্যিকারের গুরুত্বপূর্ণ সেটাকে বোঝা।

আর আপনার নিজের ‘সেলফ’ কে বোঝার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এই সমস্ত দ্বান্দ্বিক প্রশ্নের সমাধান। সুর থেকে বেসুর কে আলাদা করতে পারার সুখানুভূতিই পারে আপনাকে আপনার নিজের মধ্যে থেকে এই সমস্ত প্রশ্নের সমাধান বাতলে দিতে। এবং এই বোধ থেকেই জন্ম নেয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা যা আপনাকে আপনার একলা চলার নিজস্ব পথে প্রতি পদে আপনাকে আলো দেখাবে।

লুই ক্যারল যেমন বলেছেন, “আপনার গন্তব্য যদি নির্দিষ্ট না হয়, তাহলে যে কোনও রাস্তাই আপনাকে সেখানে পৌঁছে দিতে পারে।”

হ্যাঁ, আপনি চলার পথে এমন সব পরস্পরবিরোধী পরামর্শ ও বিভিন্ন বাণিজ্যপতিদের নানাবিধ মতামত পাবেন যা সময়ে সম্যে আপনার নিজের বিশ্বাসকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দেবে। কিন্তু একজন সাচ্চা উদ্যোগপতিকে নিজের বিশ্বাসের জোরে ও ভরসায় সমস্ত দ্বন্দ্ব ও সংঘাত জয় করে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। কেননা পৃথিবী বদলানোর ক্ষমতা যাদের থাকে তারা সকলেই “খ্যাপাটে, বেমানান ও বিপ্লবী”!


স্টোরি - নভীন বাচওয়ানী

অনুবাদ - শঙ্খশুভ্র গাঙ্গুলি