বাঙালি নিতাশা লড়ছেন বিশ্বের রানী হওয়ার লড়াই

4

তিনি মানুষী চিল্লর নন। কিন্তু তবু তিনি তার চেয়ে কোনও অংশে কম হওয়ারও স্বপ্ন দেখছেন না। তিনি মানুষ নিতাশা। সম্প্রতি জিতেছেন মিস ট্রান্স কুইন ইন্ডিয়া।

মিস ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্স কুইনে ভারতের হয়ে প্রথম প্রতিনিধিত্ব করতে চলেছেন এক বাঙালি। মার্চে তাইল্যান্ডের পাটায়ায় এই প্রতিযোগিতার আসর বসছে। মিস ট্রান্সকুইন ইন্ডিয়া কলকাতার নিতাশা বিশ্বাস দেশের প্রথম রূপান্তরকামী সুন্দর মানুষ। কুইন প্রতিযোগিতায় যাচ্ছেন বলেই যে তাঁকে সুন্দরী বলতে হবে তেমন নয়। তিনি মানুষ এটাই তাঁর পরিচয়। তিনি বাঙালি এটাও। সব থেকে বড় পরিচয় তিনি রূপান্তরকামী।

একেবারেই মসৃণ ছিল না এই পথটা। পথে পথে, পদে পদে বাধা পেয়েছেন নিতাশা। শুধু এক বুক সাহস ছিল। সেন্ট জেভিয়ার্সের এই প্রাক্তনী সেই সাহসে ভর করেই গোটা দুনিয়ার সঙ্গে লড়ে গিয়েছেন। আজ তাঁকে দেখা যাবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে। যদি মুকুট পরে ফিরতে পারেন তবে তার দেশ, জাতি, রাজ্য, জনগোষ্ঠী, তাঁর মতো পরিচয়ের কাঙাল মানুষগুলোর গর্ব আকাশ ছোঁবে।

ছিলেন শুভাঙ্ক বিশ্বাস। নিতাশা হওয়ার আগে পর্যন্ত কলকাতাতেই ঘুরতেন ফিরতেন, অসম্মানিত হতেন আর একটা পুনর্জন্মের স্বপ্ন দেখতেন। NSHM এ গ্র্যাজুয়েশনের পর ভালো সুযোগের আশায় দিল্লি গিয়েছিলেন। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুলের এই পড়ুয়া তখন সপ্তম শ্রেণিতে। বুঝতে পারেন আসলে তার পুরুষের শরীরের ভিতর গোপণে লুকিয়ে আছে এক জলজ্যান্ত নারী। সেই সময়টায় দাদাকেই ভরসা করতে পেরেছিলেন শুভাঙ্ক। দাদা পাশে থেকে ভরসা যুগিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু রক্ষণশীল বাবাকে বোঝানো যায়নি কিছুতেই। ধীরে ধীরে যত বড় হয়েছেন নিজের লিঙ্গসত্ত্বা নিয়ে সমস্ত দ্বিধা কেটে গিয়েছিল। বুঝতে পেরেছিলেন নিজের মতো করে বাঁচতে হবে। বাঁচতেই হবে। কিন্তু কলকাতার সমাজ ওকে যেভাবে চেনে, সেভাবে বাঁচা যায় না। তাই বুঝেছিলেন পালাতে হবে। দিল্লি FDDI তে ফ্যাশন টেকনোলজিতে অ্যাপ্লাই করেন। বলেন নিতাশা।

দিল্লিতে যাওয়ার পর আর সময় নষ্ট করেননি। লিঙ্গ পরিবর্তনের জন্য একাধিক অস্ত্রপচার করান শরীরে। আর মডেলিংয়ে ঢুকে পড়েন। বদলে ফেলেন পুরনো নাম। তাঁর নতুন অবতারের নাম রাখেন ‘নিতাশা’। দিল্লি ওর এই পরিবর্তনকে গ্রহণ করার মানসিকতা রাখে। যে হাসপাতালে ওর অস্ত্রোপচার হয় সেখানে রূপান্তরকামীদের জন্য আলাদা বিভাগ আছে। এই ব্যবস্থা কলকাতায় নেই। নিজের শহর নিয়ে অভিমানী নিতাশা।

তৃতীয় লিঙ্গ এখন আইন সম্মত। তাহলেও বাঁধাধরা মিস ইন্ডিয়া, মিস্টার ইন্ডিয়ার বাইরে গিয়ে মিস ট্রান্স কুইন ইন্ডিয়া করাটা সোজা কাজ ছিল না। কিন্তু সেই অসাধ্যই সাধনের কথা ভাবতে পেরেছিলেন রীনা রাই। তাঁর মতে, রূপান্তরকামীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি যেভাবে বদলাচ্ছে, এই ধরনের ইভেন্ট খুবই দরকার।

যখন প্রথম ইভেন্টটা করার জন্যে আসরে নামেন তখন নানা সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। রীনাকেও এই সমাজ রূপান্তরকামী হিসেবে ভাবতে শুরু করে। তাদের চোখে রীনাও সমকামী। কিন্তু সমস্ত বাধা টপকে রীনাও লড়ে দেখিয়ে দিয়েছেন মিস ট্রান্স কুইন ইন্ডিয়া প্রতিযোগিতায় সারা দেশের ১,৫০০ রূপান্তরকামী থেকে তিনজনকে বেছে নেন বিচারকরা। ব়্যাম্পে হাঁটা থেকে কথা বলার ধরন সব পাল্টে গিয়েছিল কদিনের তালিমে।

২৬ বছরের নিতাশা আপাতত MBA করছেন। মিস ট্রান্স কুইন ইন্ডিয়া হওয়ার পর প্রচুর দায়িত্ব এসে পড়েছে। এখন এটা আর একার লড়াই রইল না। রূপান্তকামীদের অধিকার, সম্মান সব দিকেই নজর দিতে চান। তবে নিতাশা মনে করেন অধিকার কখনও কেড়ে নেওয়া যায় না। ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করেন এই লড়াকু বাঙালি। তাকিয়ে আছেন মার্চের প্রতিযোগিতার দিকে।