ভারতীয়দের স্টিউ এর স্বাদ চাখাচ্ছেন হেমন্তের স্টিউ আর্ট

0

স্টিউ ইতিহাস ঘাটঘাটি করতে হলে আমাদের প্রায় ৮০০০ বছর পিছোতে হবে। সেখানে আমরা পাব আমাজন অববাহিকার বর্ষাবন, ইউরোপ এবং মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ন অঞ্চলের আদিবাসীরা কচ্ছপের খোলকে রন্ধন পাত্র হিসাবে ব্যবহার করে নিজেদের খাবার সেদ্ধ করত। এটাই সম্ভবত স্টিউ তৈরীর প্রথম ইতিহাস।

সারা বিশ্বের রন্ধন তালিকায় স্টিউ একটি বহুল পরিচিত পদ। বিভিন্ন স্থানে এটি বিভিন্ন উপায়ে এবং বিভিন্ন ভাবে এটি রান্না করা হয়।

সাধারণত কম আঁচে সব্জী বা মাংসে বিভিন্ন মসলা সহযোগে বেশ খানিকটা সময় ধরে এই পদটিকে সেদ্ধ করা হয়। রান্না হয়ে গেলে এটি রুটি অথবা আপ্পাম বা ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়।

আমরা ভারতীরা এই স্টিউ কে ডাল এবং সম্বর হিসাবে পরিবেশন করে থাকি, যদিও এগুলি এর সঠিক ভারতীয় সংস্করণ কিনা সে বিষয়ে বিতর্কের অবকাশ থাকতেই পারে। পুনের স্টিউ আর্ট রেস্টুরেন্টের প্রতিষ্ঠতা হেমন্ত থিতে জানান "স্টিউ স্যুপ এবং তরকারীর মধ্যবর্তী সংস্করণ, এটা স্যুপের মত সরল নয় বা তরকারীর মত মশলাদারও নয়।" এ প্রসঙ্গে বলে রাখা দরকার স্টিউ আর্ট নিত্যনতুন স্টিউ এর স্বাদের মধ্যে বৈচিত্র আনার কাজ করে চলেছে।

দুই সন্তানের পিতা হেমন্তের প্রাথমিক দৃষ্টি ছিল তার সন্তানদের স্বাস্হ্যকর খাবারের উপর। তার প্রথম পদক্ষেপ ছিল একটি বিখ্যাত ব্র্যান্ডের আইসক্রিম এবং মিল্কসেখ এর ফ্রেঞ্চাইজি আউটলেট। প্রায় তিন বছর ধরে তিনি এটা চালিয়ে ছিলেন। কিন্তু তিন বছর বাদে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন এমন কিছু শুরু করবেন যা সম্পূর্নভাবে তার নিজের। তার কাছে অপশনও ছিল যেমন পিৎজা, আইসক্রিম এবং মিল্কসেক আউটলেট। কিন্তু তিনি নির্বাচন করলেন সম্পূর্ন অন্য একটি দিক, যা তার কথায় “amazing, fulfilling, guilt-free, and healthy dining experience.”

তার এই নতুন উদ্যোগ ভ্যালেন্টাইন্স ডে তে প্রথম রুপ পেল। এর একটা ট্যাগ লাইনও ছিল ‘taste falls in love with health’। হেমন্ত এ বিষয়ে একটি ব্যাখ্যা দিলেন "স্টিউ এমন একটি পদ যা বিভিন্ন সংস্কৃতির অনুপ্রেরণা, যেমন সেন্ট্রাল আমেরিকা, ইতালি, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং নিঃসন্দেহে আমাদের ভারত। স্টিউ এর উপর রিসার্চ করতে গিয়ে সারা বিশ্বে এর গ্রহন যোগ্যতা লক্ষ্য করেছি, কারন হিসাবে এর স্বাস্থ্যকর দিকটিকেই প্রতিষ্ঠা করা যায়, যা অবশ্যই আপনার কাছে অপরিহার্য।" তার নিজের রেস্টুরেন্টের কর্মকান্ড ছাড়াও হেমন্ত পুনের একটি বিখ্যাত কলেজ Creativity and Innovation এর ভিজিটিং প্রফেসর।

আমাদের এই আলোচনায় একটা প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন ঊঠে আসে আমরা ভারতীয়রা ডাল বা সম্বরকে স্টিউ বলব না কেন? এ বিষয়ে হেমন্তের বক্তব্য "এই ধারনাটি ভারতীয়দের কাছে একদম নতুন। স্টিউ আর্ট ভারতের প্রথম স্টিউ রেস্টুরেন্ট। আমাদের কাছে কোন প্রেরনা বা মডেল ছিলনা যেটাকে অনুধাবন করে আমরা কাজ শুরু করবো। প্রথম দিকে আমরা আমাদের রেস্টুরেন্টের একজন কর্মচারীকে কিছু লিফলেট দিয়ে রেস্টুরেন্টের বাইরে রেখেছিলাম, তার দায়ীত্ব ছিল যেকোন পথচলতি মানুষ একবার আমাদের রেস্টুরেন্টের দিকে তাকালেই তার হাতে একটি লিফলেট ধরিয়ে দেওয়া। এখন এটা ভাবলেও হাসি পায়, কিন্তু এই পদ্ধতিটা কাজে এসেছিল। এরপরই আমাদের প্রয়োজন হয় স্টিউ বিষয়ে বোদ্ধা লোকদের।"

স্টিউ আর্ট প্রতিষ্ঠাতা হেমন্ত থিতে
স্টিউ আর্ট প্রতিষ্ঠাতা হেমন্ত থিতে

বর্তমানে এই রেস্টুরেন্টের মেনুতে স্টিউ এর জায়গা হয়েছে - চারটি ভারতীয় এবং চারটি আন্তর্জাতিক। ভারতীয় স্টিউগুলি যথাক্রমে মালাবারী ক্যাসু স্টিউ, ঘুগনি, স্পইসি ব্রাউন স্টিউ এবং মঙ্গলোরিয়ান কোকোনাট স্টিউ। আন্তর্জাতিক স্টিউ গুলি হল হাঙ্গেরিয়ান গোউলাশ, মরোক্কান স্টিউ, মেক্সিকান বিন স্টিউ, আমেরিকান গামবো এবং কর্ন চাউডার। হেমন্ত জানালেন, "প্রত্যেকটির ক্ষেত্রেই ৪ মিলি কম তেল ব্যবহার করা হয় অথবা মাখন দিয়ে রান্না করা হয়।"

বিভিন্ন পোস্টারের মাধ্যমে স্টিউ আর্ট তাদের ব্র্যান্ডগুলি সম্পর্কে ক্রেতাদের তথ্য দিচ্ছে। পোস্টারগুলিতে এবং দেওয়ালের অন্যান্য কলাকৃতিতে স্টিউর ইতিহাসের সাথে সাথে স্টিউ তৈরীর বিভিন্ন পদ্ধতি এবং এর পরিবেশন সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে উল্লেখ করা আছে। কর্মচারীদের এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে যাতে তারা ক্রেতাদের সাথে এবিষয়ে কথা বলতে পারে। হেমন্ত সরাসরি জানালেন "আমাদের কোন নির্দিষ্ট ক্রেতা নেই, সবাই আমদের ক্রেতা যেমন, স্কুলের কিশোর, কলেজের যুবক, পারিবারিক লোকজন অথবা বয়স্কা। আমাদের এই পদ শুধুমাত্র ক্রেতাদের স্বাস্থ্যেরই নয়, পকেটেরও সহায়ক"। এই রেস্টুরেন্ট বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এবং স্যোসাল মিডিয়ার মাধ্যমে সচেতনতা ছড়াচ্ছে। পুনেতে তারা কয়েকটি কলেজে ‘Stew Art Story’ নামে সেশনও করেছে।

আমরা একদিনে ৬০ থেকে ১০০ র মত মিল যেকোন জায়গায় পরিবেশন করি। যদিও এটি আমাদের লক্ষ্যমাত্রার কিছু কম কিন্তু এই ক্রমবর্ধমান পরিস্থিতি সন্তোষজনক।"

স্টিউয়ের জন্য প্রয়োজনীয় মাংস এবং সব্জী আমরা সরাসরি মেইন সিটি মার্কেট থেকে নিয়ে আসি। এর প্রধান কারন এখানে এগুলি সতেজ অবস্থায় পাওয়া যায় এবং খরচেও পুষিয়ে যায় এর গুন মানের সাথে কোন রকম আপোষ না করে।

বর্তমানে স্টিউ আর্টে আট ধরনের স্টিউ তৈরী হয়, পরবর্তী তিন মাসে ক্রেতারা আরোও নতুন স্টিউয়ের স্বাদ পাবেন । নতুন স্টিউ গুলির স্বাদ পরীক্ষা করার পরই সেগুলি ক্রেতাদের জন্য উপলব্ধ হবে। এবিষয়ে হেমন্ত কয়েকজন বিশেষজ্ঞের তালিকা বানিয়েছেন। যাদের মধ্যে আছেন ফুড ব্লগার, তার কয়েকজন বন্ধু এবং কয়েকজন নিয়মিত ক্রেতা। তার কথায়, "ক্রেতারাই সর্বশেষ কথাটা বলবেন। আমরা তাদের স্বীকৃতি চাইব এই স্টিউগুলির পদ উপলব্ধ করার আগে।" ভবিষ্যতে হেমন্তের ইচ্ছা তিনি এই স্টিউ গুলির উন্নতি এবং মার্কেটিং এর জন্য কয়েকজন সেলিব্রেটি শেফকে নিয়ে আসবেন।পরিশেষে হেমন্ত জানান তাদের আউটলেটে প্রচুর জায়গা আছে। ওখানে সেন্ট্রাল কিচেন বানানো হবে। তারপর নিজস্ব ব্র্যান্ডগুলিকে পুনেতে বিভিন্ন ফ্রেঞ্চাইজিদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।