সেরামিক দিয়ে বিদ্রুপ বিদ্রোহ করছেন শিল্পী মৌসুমী

0

কোনোওরকমে মেরে কেটে বছর আড়াই। তাতেও দেরি হচ্ছে বলে অস্থির হয়ে ওঠেন বাচ্চার আধুনিক বাবা-মায়েরা। পিঠে ব্যাগ তুলে একটা নামী স্কুলে ভর্তি করে দিতে পারলেই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন ‘সচেতন’ অভিভাবকরা। ভাববেন না এখানেই শেষ। সবে তো শুরু। এক অশরীরি ইঁদুর দৌড় তাড়া করে বেড়ায়। পড়ার এন্তার চাপ। বাবা-মায়ের প্রত্যাশার চাপ। মাঝখান থেকে শৈশবটাই বেমালুম গায়েব! শিল্পের মাধ্যমে যান্ত্রিক শৈশবকে তুলে ধরে যেন নীরব প্রতিবাদ করে চলেছেন শিল্পী মৌসুমী রায়।

নানা ধাতুতে সেজে ওঠা শিল্পীর কল্পনা। কখনও ক্যানভাসে কল্পনাকে ফুটিয়ে তোলা আবার কখনও ক্যানভাসে স্থান পেয়েছে বাস্তবচিত্র। চেনা শহরে ক্রমাগত বদলে যাচ্ছে চেনা মানুষগুলোর অনুভূতি। পাশাপাশি পড়াশুনোর চাপে বদলাচ্ছে শিশুদের শৈশবও। শিল্পীর তুলির টানে সেই বাস্তব চিএই যেন বর্ণময়।

ভাস্কর গোপীনাথ রায়ের কন্যা মৌসুমী রায়। বাবার হাত ধরেই ভাস্কর্যের জগতে পা রাখা। প্রথম প্রেরণা বাবাই। ‘আমার যত কল্পনাকে শিল্পে রূপ দেওয়ার প্রথম পাঠ বাবার কাছ থেকেই। যে আবেগ নিয়ে আমরা বেঁচে থাকি, এক অদ্ভুত ছুটে চলার ফাঁদে পড়ে সেসব হারিয়ে যাচ্ছে। যান্ত্রিক হয়ে পড়ছি দিন দিন। নিজের শিল্পের মধ্যে দিয়ে সেই সব ছোট ছোট অনুভূতি আর আবেগকে ফুটিয়ে তোলার অদ্ভুত নেশা চেপে বসেছে আমার মধ্যে। বিশেষ করে শিশুদের এমন দমবন্ধ পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি ভাবায় আমাকে’, বলছিলেন মৌসুমী। তাঁর কাজের অনেকটা জুড়ে সেই ছাপও স্পষ্ট। শিল্পসাধনা, নানা জায়গায় প্রদর্শনীর পাশাপাশি গার্ডেন হাই স্কুলে আঁকার শিক্ষিকা মৌসুমী। সেখানেই খুব কাছ থেকে দেখেছেন, কীভাবে পড়ার চাপে, বাবা-মায়ের প্রত্যাশার চাপে শিশুগুলির নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়। খেলার সময় নেই। শুধু ছুটে চলা। মৌসুমীর শিল্পী মন মেনে নিতে পারে না শিশুদের যান্ত্রিক বেড়ে ওঠাকে। তাই তারাই বারবার ফিরে এসেছে তাঁর শিল্পের বিষয় হয়ে।

ব্রোঞ্জ, কাঠ, টেরাকোটা বা ধাতবের ভাস্কর্যে মাধ্যমের নিজস্ব রংটিকে (material colour) শিল্পকার্যের রং হিসেবে দেখা হয়। মৌসুমী আবার মাধ্যম হিসেবে বেছেছেন সেরামিককে। ফলে রঙের ব্যবহার এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশিষ্ট ভাস্কর বিপিন গোস্বামীর মতে, ‘সেরামিক একটি বেশ টেকনিক্যাল মাধ্যম। এই কাজগুলি করতে গেলে আবেগের সঙ্গে কারিগরী দক্ষতার এক সুনিবিড় মেলবন্ধন দরকার। যা মৌসুমীর কাজে দেখা যায়।’

আর্ট কলেজ থেকে ভিস্যুয়াল আর্টে স্নাতকোত্তর এই শিল্পীর কাজে রঙের ব্যবহার সবার থেকে তাঁকে আলাদা করে রাখে। সেরামিক ধাতুর সঙ্গে তুলির টান মৌসুমীর শিল্পকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। মাছ, পশু, পাখি আর মানুষের অবয়বের পাশাপাশি তাঁর কাজে বারবার ফিরে ফিরে এসেছে শৈশবের নানা ছবি। কখনও রঙের ব্যবহারে, কখনও শৈশবের নানা মুখঅবয়ব। কোনওটায় ঝলমলে হাসি, কোথাও উদাস চাউনি। বিমুর্ত শিল্প যেন মুর্ত হয়ে ওঠে মৌসুমীর তুলির টানে।