কলকাতার করিমসে চেখে দেখুন মুঘল-এ-আজম

3

মোগলাই খানার ভক্তের অভাব নেই। কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় গিজগিজ করছে মোগলাই খানার খাজানা। কিন্তু মোগলাই খানার আদত দেশ হল উত্তর ভারত। যেখানে মোগল বাদশাহদের রমরমা ছিল। সেখানেই ছিল মোগলাই খানার আসল ঘরানা।

দিল্লি যারা ঘুরতে যান তাদের অবশ্য দ্রষ্টব্যের তালিকায় থাকে জামা মসজিদের পাশে করিমসের রোস্তোরাঁ। এর সঙ্গে ইতিহাস জুড়ে রয়েছে। বলা হয় বাহাদুর শাহ জ়াফরের আমলে মোগল রসুইখানার শেফ ছিলেন মুহম্মদ আজ়িজ়। কিন্তু বাহাদুর শাহকে নির্বাসনে যখন পাঠানো হল তারপরই প্রাণ হাতে করে পালিয়ে বাঁচেন আজ়িজ়। মীরাট থেকে গাজ়িয়াবাদ হয়ে দিল্লির আশপাশে গাঢাকা দেন। এই আজ়িজ়ের ছেলে হাজি করিমুদ্দিনও ছিলেন বাবার মতই দুর্দান্ত কুক। ১৯১১ সালে যখন কলকাতা থেকে রাজধানি বদল হয়। দিল্লির দরবারে রাজা পঞ্চম জর্জের অভিবাদনের উৎসবের আয়োজন হয়, তখন করিমুদ্দিনের মগজের বাতি জ্বলে। খুলে ফেলেন তাঁর স্টার্টআপ। পুরনো দিল্লির রাজপথের ধারে একটি খোলা জায়গায় একটি ফুড স্টার্টআপ। একটা ধাবা। যেখানে মোগলাই খানা পাওয়া যেত। ওই উৎসবে যোগ দিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষ যে খানার স্বাদ নিয়ে বাহবা দিলেন। তখন মাত্র দুটি পদ ছিল। রুমালি রুটির সঙ্গে ডাল। আর আলু গোস্ত। তারও বছর দুয়েক পর ১৯১৩ সালে জামা মসজিদের কাছেই গলি কাবাবিয়ানে খুললেন তাঁর হোটেল। নাম রাখা হল করিম হোটেল। করিম বলতে তিনি নাকি মোগল সম্রাটদের শাহি খানা আম আদমিকে খাওয়াতে চান। এবং এটাই তার নাম যশ খ্যাতি বিত্ত আর প্রতিপত্তির ইউ এস পি। মুম্বইতেও করিমস আছে সে প্রসঙ্গে আসছি পড়ে। ইতিহাসের কথাই যখন চলছে তখন জেনে নিন। কলকাতায় মোগলাই খানার হকিকত। 

কলকাতাতেও শাহি খানার ইতিহাসও পুরনো। ১৮৮৫ সালে তৈরি হয়েছিল অ্যালেন কিচেন। তবে মোগলাই খানার জন্যে নয়। নাম শুনেই টের পাওয়া যাচ্ছে যে এই কিচেনের বৈশিষ্ঠ্যে মোগলাই গন্ধ ছিল না। যা ছিল, আছে, থাকবে তা ইউরোপীয় কেতা। চিংড়ি, ভেটকি কাটলেটের নানান ইনোভেশন। তবে মোগলাই খানার রমরমা কলকাতা শুরু হয় একরকম আমিনিয়া আর নিজ়ামের হাত ধরে। গোলবাড়ির কষা মাংসও বেশ পুরনো। তবে আমিনিয়া তুলনায় অধিক প্রাচীন। এখন তো রাস্তার মোড়ে মোড়ে একের পর এক মোগলাই আউটলেট। জিশান, আওয়াদ, বেদুইনের মতো শহরের বিখ্যাত মুঘলাই কুইজিনগুলির তালিকায় এবার নবতম সংযোজন করিমস। আজ্ঞে হ্যাঁ। করিমস। সেই দিল্লির দরবারি করিমস নয়। তবে তার থেকে কিছু কম ও যায় না নতুন এই করিমস। এটি হাজি করিমুদ্দিনের নয়। এটি মুম্বইয়ের নামজাদা শেফ করিম ধানানির। তার রান্নায় মোগলাই ঘরানার সঙ্গে মিশেছে আধুনিকতা। স্বাদে আর অভিনবত্বে করিম ধানানি মনে করিয়ে দিয়েছেন মুগল আমলের শাহী খানার লা জ়বাব টেস্টের সঙ্গে আধুনিক মানুষের আধুনিক পছন্দের ফিউশন। এটাই ওঁর ইউ এসপি।

দিল্লির করিমস তার মত করে ইতিহাস। মুম্বইয়ের করিমসও নিজের বাণিজ্যিক দক্ষতা আর আধুনিকতায় দুর্দান্ত। এবার চেখে দেখার পালা কলকাতার করিমস।

জিভে জল আনা করিমস ধানানির অসামান্য রেসিপিতে যদি কব্জি ডোবাতে চান তাহলে আপনাকে যেতে হবে সল্টলেক সেক্টর ফাইভে। পিএস সৃজন কর্পোরেট পার্কের প্লট জি ২, ব্লক জিপি, রিটেল ইউনিট ২, টাওয়ার ওয়ানের নীচ তলায় কলকাতায় করিমসের প্রথম ফ্রেঞ্চাইজি। ৩,৮০০ স্কয়ার ফিট জুড়ে এই রেস্তোরাঁ। দুটো তলায় মিলিয়ে ১৩০ জনের এক সঙ্গে খাওয়ার ব্যবস্থা। দ্বিতীয় তলা যেকোনও পার্টির জন্য রিজার্ভ করা যাবে। রেস্তোরাঁয় একবার ঢুকে পড়লে আপনি ফিরে যাবেন মুঘল সাম্রজ্যের রাজত্বে। খানা পিনার সঙ্গে ইন্টিরিয়রেও মোঘলাই ছাপ।

কিন্তু করিমস কেন? করিমসের ফ্রেঞ্চাইজার এবং আরজেএস মাতৃ ফুড অ্যান্ড বেভারেজের কর্ণধার সায়ন্তন সাহার উপলব্ধি, কলকাতার রসনা রসিক বাঙালির জন্য এর চেয়ে ভালো কিছু আর হয় না। ‘অনেকদিন ধরে ভাবছিলাম সারাদেশে খ্যাত অথচ শহরে নেই এমন নামী ফুডব্র্যান্ড কলকাতাবাসীকে উপহার দেব। প্রথমেই তাই মুম্বইয়ের করিমসের কথা মাথায় আসে। সেখানে গেলে একবার করিমসে ঢুঁ মারবো না ভাবতেই পারি না। সেই স্বাদ আমি এবার কলকাতায় নিয়ে এলাম। আশাকরি খুব ভাল সাড়া পাব। শিগগিরই শহরের মধ্যে আরও কয়েকটা শাখা নিয়ে আসছি আমরা। তারপর ধীরে ধীরে কলকাতার বাইরেও ছড়িয়ে দেব’, সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা সায়ন্তন সাহার।

গোস্ট বড়া চপ, মুরগ পুটলি কাবাব, দুধি হালুয়া, মুরগ দম বিরিয়ানি আর মুরগ লাহোরি- করিমসের জিভে জল আনা প্রতিটি স্পেশাল পদ কলকাতার করিমসেও পাওয়া যাবে। সামনেই পয়লা বৈশাখ। বছরের প্রথম দিনটায় আপন জনেদের নিয়ে বাইরে খাওয়া দাওয়ার প্ল্যান পাক্কা। অন্য কোথাও খাওয়ার কথা যদি ফিক্স করে থাকেন, ক্যান্সেল করে দিন। নববর্ষেই চেখে দেখুন করিমসের মোঘলাই খানা।