বাঙালি হারিয়ে ফেলছে রসবোধ? সাহসও? উদ্বেগ বিশিষ্টদের

0

শিল্পীতভাবে ব্যঙ্গবিদ্রূপ করার একটি মাধ্যম হল কার্টুন। আদতে প্রতিটি কার্টুনই হল শিল্পীর করা এক একটি মন্তব্য। ভোট চলছে। একসময় ভোট মানে ছিল তরজা, তির্যক সব দেওয়াল লি‌খন এবং সেইসঙ্গে খবরের কাগজের বুদ্ধিদীপ্ত সব কার্টুন। আজ থেকে ১৫ কিংবা ২০ বছর আগেও পত্রপত্র‌িকায় নিয়মিতভাবে ছাপা হত কার্টুন। শিল্পীর উপলব্ধির ছবি। কিন্তু, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আমূল পাল্টে গিয়েছে। কয়েকশো টেলিভিশন চ্যানেল ও সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট মানুষের যোগাযোগের দুনিয়ায় তো বটেই সেইসঙ্গে তাঁর বিনোদনের অথবা চিন্তার জগৎটাকেও অনেকটা পাল্টে দিয়েছে। তাতে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে কার্টুন। সেইসঙ্গে কার্টুনিস্টদের অস্তিত্বও।

সম্প্রতি বাইপাসের ধারে কে কে এস ফিউশন রেস্টুরেন্টে হয়ে গেল ভোটের বাজারে কার্টুন নিয়ে এক দারুণ আলোচনাসভা। আলোচনার বিষয় ছিল, ভোটের খবরে কার্টুন কোথায়? আর এবারের ভোটেই বা কার্টুন কোথায়? আলোচনা সভার আয়োজক ছিল PSSAMTEK  নামে একটি স্টার্ট আপ সংস্থা। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভাল, এই সংস্থাটি বছরভর অ্যানিমেশন ও কার্টুন নিয়ে কাজ করে থাকে। গত বছরের মতো এবছরের ডিসেম্বরেও PSSAMTEK নয়াদিল্লিতে আয়োজন করতে চলেছে ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল অ্যানিমেশন অ্যান্ড কার্টুন ফিল্ম ফেস্টিভাল।

কে কে এস ফিউশনে আয়োজিত আলোচনাচক্রে অতিথি বক্তা হিসাবে ছিলেন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ অরুণাভ ঘোষ, দেবপ্রসাদ রায়, ইয়োর স্টোরি বাংলার ডেপুটি এডিটর হিন্দোল গোস্বামী, বিশিষ্ট সাংবাদিক, ফিনান্সিয়াল ক্রনিকালের সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট এডিটর ঋত্বিক মুখার্জি, লেখক ও সাংবাদিক শীৰ্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন দেবযানী ঘোষ। 

অরুণাভবাবু বললেন, ভালো রুচিসম্মত কার্টুন আজকাল খুব কম দেখা যায়, তার কারণ হল যাঁরা শিল্পটি নিয়ে কাজ করছেন তাঁদেরও পড়াশোনার অভাব। তাঁর অভিযোগের সূত্র ধরে সাংবাদিক ঋত্বিক বললেন, আগে একটা অভিযোগ ছিল, মধ্যমেধা বাজার দখল করে বসে আছে। এখন পরিস্থিতি আরও খারাপ। মধ্যমেধার পরিবর্তে বাজার শাসন করছে নিম্নমেধা। ফলে অত্যন্ত খারাপ দিকেই যাচ্ছে গোটা ব্যাপারটা। তাছাড়া, রাজনীতিতেই আর মজা কোথায়? রাজনীতি থেকে মজা ক্রমশ হারিয়ে গিয়েছে। ফলে, কার্টুন দেখে অনাবিল আনন্দ পাওয়ার মতো মানুষও কমছে।

সঞ্চালিকা দেবযানী সূত্র ধরালেন সাংবাদিক ও লেখক শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। অরুণাভবাবুর কথার রেশ টেনে শীর্ষ বললেন, আজকাল তো প্রতিবাদ করলেই রাষ্ট্রের হাতে হেনস্থার শিকার হওয়াটা অবধারিত। সেই সাহস কোথায়? এমনকি কার্টুনিস্টদের মধ্যেও সাহসের অভাব দেখা গিয়েছে। অরুণাভবাবু বললেন, সে তো হবেই। সাহস দেখাতে গেলে যে মালিকের রোষে শিল্পীকে চাকরিটাই খোয়াতে হতে পারে। 

সেই কথাই বললেন ইয়োর স্টোরি বাংলার প্রধান হিন্দোল গোস্বামীও। হিন্দোলের কথায়, হ্যাঁ, আমরা মেরুদণ্ডের সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছি। মেরুদণ্ড সিধে রেখে কাজ করাটা মুশকিলের হয়ে উঠছে। শিল্পী কার্টুন এঁকে নাড়া দিতে পারেন। তিনি জনমতও তৈরি করতে পারেন। কিন্তু, সমস্যা হল উঁচুদরের রোমান্টিক শিল্পীও এখন আর আমরা পাচ্ছি না। এটাও একটা সামাজিক সমস্যা নিশ্চয়ই। 

কথা হচ্ছিল প্রতিবাদী সত্তা নিয়ে। রাজনীতিবিদ অরুণাভবাবু বললেন, বিরোধিতা করার অনেক ঝুঁকি আছে। রাত দুটোর সময় বাড়িতে পুলিশ যেতে পারে। তখন আপনি কী করবেন, ভাবুন তো। বিধানসভার স্পিকারকে নিয়ে সামান্য রসিকতা করেছিলাম বলে আমার তো ৬ ঘণ্টার জেল হয়ে গিয়েছিল। শীৰ্ষ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বললেন, মানুষেরও রসবোধ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। রাজনৈতিক কালচারটাই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। আদতে একটা ভ্রান্তিকে আঘাত করে কার্টুন। তা গ্রহণ করতে না পারার অন্যতম কারণ লেখাপড়ার পাট না থাকা। 

রাজনীতিবিদ দেবীপ্রসাদ রায় রাজীব গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধী, প্রণব মুখোপাধ্যায়ের রসবোধ ও দূর‌দৰ্শিতার নানান‌ উদাহরণ দিলেন। জানা গেল অনেক অজানা কাহিনি। অরুণাভবাবুও জানালেন, স্নেহাংশু আচার্য, জ্যোতি বসু, যতীন চক্রবর্তীদের রসবোধ, বুদ্ধিদীপ্ত নানা মন্তব্য ও তাঁদের সহিষ্ণুতার কথা। একালের  শ্রোতারা শুনলেন, ‌অবাকও হলেন খুব। 

হিন্দোল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করলেন। ওঁর কথায়, এখন তো সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে কার্টুনের ছয়লাপ। কিংবা অড‌িওভিস্যুয়ালেও। কিন্তু, কোথায় যেন গোটা ব্যাপারটাই একঘেয়ে হয়ে গিয়েছে। রসবোধের অভাব তো আছেই। কাটপেস্ট করে যেটা এন্তার বানানো হচ্ছে, আর যাই হোক সেটাকে শিল্প বলব না। এক মত শীর্ষও।

দেবপ্রসাদ বললেন, ঠিকই। তাছাড়া, ব্যাপারটা অনেক সময়ই শালীনতার মাত্রা ছাড়াচ্ছে। প্রয়োজনে গুলি পায়ের দিকে চালানোটাই নিয়ম। অথচ, আজকাল শালীনতা মাত্রা লঙ্ঘন করায় গুলিটা এসে লাগছে বুকে। পাশাপাশি হিন্দোল, শীর্ষদের মতে রাজনীতিবিদরা যা সব বলছেন যা সব করছেন তাঁরা নিজেরাই এখন হয়ে গেছেন কার্টুন চরিত্র টিভির পর্দায় চোখ রাখলে যদি রেগে না যান মজা পাবেন For sure।

দীর্ঘ আলোচনা। অনেক অজানা ‌তথ্যের পাশাপাশি শ্রোতারা ফেলে আসা যুগের সম্পর্কে আর কিংবদন্তি হয়ে ওঠা রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে জানলেন অনেক অজানা তথ্য। News Point এর কর্ণধার দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়ও মাঝে মাঝেই যুগিয়ে দিচ্ছিলেন নানান মজাদার খেই। আর একটি অভিনব প্রাপ্তি হল এই আলোচনা সভায় কে কে এস ফিউশনের প্রধান শেফ প্রদীপ রোজারিওর অভিজ্ঞতা।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী, সিপিএম নেতা সীতারাম ইয়েচুরি, কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীকে নানা সময়ে নিজের হাতে খাইয়েছেন তিনি। শেয়ার করলেন সেই অভিজ্ঞতার কথা। জমে গেল আড্ডা। মুখ্যমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হওয়ার সুবাদে প্রদীপ দেখেছেন টানা দুদিন মমতা প্রায় কিচ্ছু না খেয়ে কিভাবে কাটিয়ে দিতে পারেন। শুধু চা আর বিস্কুট। তৃতীয়দিন খুব জোরাজুরি করায় একটু মাছ ভাত খেলেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর পছন্দের পদ মুড়ি। তাই এদিন অলিভ অয়েল দিয়ে লেবুর রস ছিটিয়ে অভিজাত মুড়ি মেখে দিলেন রোজারিও। নরেন্দ্র মোদিকেও খাইয়েছেন প্রদীপ। তাঁর পছন্দের ডিশ খিচুড়ি। এদিন রাঁধলেন খিচুড়িও। পাশাপাশি আরেকজনের কথা বলতে গিয়ে রীতিমত নস্টালজিক হয়ে পড়েছিলেন এই স্টার শেফ। তিনি রাজীব গান্ধী। বললেন একটা ছোট্ট গল্প। একবার কী একটা রান্না করে খাইয়েছিলেন রাজীবকে। রাজীব সেটা তাড়িয়ে তাড়িয়ে খেয়েছিলেন। কিন্তু বেশি খাওয়ার পাত্র ছিলেন না উনি। তাই প্রদীপকে ডেকে বলেন যেটুকু খেতে পারলেন না সেটুকু যদি প্যাক করে দেওয়া যায় বাড়িতে ছেলে মেয়েদের জন্যে নিয়ে যাবেন। এদিন আক্ষরিক অর্থেই রাজনৈতিক খিচুড়ি রাঁধলেন রোজারিও। রান্না হল মমতার মুড়ি, মোদির খিচুড়ি, ইয়েচুরির মাছের পদ আর রাহুলের জিভে জল আনা কাবাব। একা হাতে এক সঙ্গে চারটে পদ ফাটাফট রেঁধে দেখালেন স্টার শেফ। আর তরুণ প্রজন্মের কার্টুনিস্ট প্রসেনজিৎ সাহা তা ক্যানভাস বন্দ‌ি করলেন। যা আঁকলেন তাকে বোধহয় এককথায় বলা যেতে পারে বাঘে গরুতে একসাথে খানা খাওয়ার ছবি। এরকম রসিকজন সম্মেলনে যা উঠে এল তার মোদ্দা উদ্বেগের বিষয় হল...

বাঙালি তাঁর রসবোধ, মেধা কি ক্রমশ হারিয়ে ফেলছে? মহামতি গোখলের সেই বিখ্যাত উক্তি, "What Bengal thinks today, India thinks tomorrow" এই সার্টিফিকেটের যেন ঠাঁই হয়েছে যাদুঘরে।

Related Stories

কার্টুন দিয়ে দুনিয়াকে দেখিয়ে দেবেন অঙ্কুশ
বাংলার রাজনীতিতে 'সেন্টু টাচ্‌'
এখনও ভোটের প্রচারে জমজমাটি পট-গান

 

Related Stories