পথই আলো, পথিক শীলার

0

কলকাতার এক্সাইডের মোড়ের এক ব্যস্ত বিকেল। কথা বলছিলাম সাতাশি বছরের এক যুবতীর সাথে। নাম শীলা ঘোষ। 

হলদিরামের বিশাল দোকানের বাইরে ফুটপাতের একরত্তি কোণে সাজানো শীলার নিমকি,চানাচুরের পসার। আমি শীলার কথা জানতে পারি ফেসবুকের মারফত।শীলার গল্প শুনবো বলে ছুটে যাই। তিনি সবে তাঁর দিনের বিক্রিবাট্টা সেরে তাঁর চটের থলে গোটাচ্ছেন। আমি তাঁকে কব্জা করে ঢুকে পরলাম হলদিরামের দোকানের ভিতর। শীলা তাঁর মুখে অবলীলায় চালান করে দিলেন লাড্ডু। কিন্তু কার সাথে কথা বলবো! বহু মানুষ আমাদের এসে ঘিরে ধরেছে। শীলার জনপ্রিয়তা নিয়ে আমার ধারণা নিমেষে ধূলিসাৎ। 

বুঝলাম এখানে কথা এগোনোর নয়। শীলা হয়তো না করে দেবেন জেনেও তার বাড়ি নিয়ে যেতে অনুরোধ করলাম। ওমা! অবাক কান্ড, ফোকলা হেসে বুড়ি রাজি। তবে দুঁদে ব্যবসাদারের মতো শর্ত দিলেন, "পরে থাকা বাকি সব প্যাকেট কিনে নিতে হবে।"এক প্যাকেট তিরিশ টাকা। দেখলাম খুব বেশি প্যাকেট বাকিও নেই। চটজলদি রাজি হয়ে গেলাম।

ব্যবসায় ব্যস্ত শীলা
ব্যবসায় ব্যস্ত শীলা

শীলার বাড়িতে চা পর্ব শেষ। কথা শুরু করলেন। সুরেলা গলায় শোনালেন দুলাইন,"ওহে সুন্দর..."। আমি বললাম,"বাঃ,কার গান?" লজ্জায় লাল শীলা বললেন "রবিঠাকুরের,ফুলশয্যার রাতে গেয়েছিলাম। ওনার খুব ভালো লেগেছিল।" 

পরিস্থিতিই পথে নামতে বাধ্য করেছে এই আশি পেরোনো ঠাকুমাকে।

শীলার মেয়েবেলা

বিষ্ণুপুর গ্রামের ডাক্তার বাবার সাত সন্তান। সবচেয়ে বড় আমাদের দামাল শীলা।সারাদিন দস্যিপনা, কখনও নদীর মাছ, কখনও জামগাছের বাঁদর আবার কখনও লক্ষ্মীমেয়ের মতো মায়ের পাকা চুল বেছে দেওয়া। কুসংস্কার আচ্ছান্ন গ্রামবাংলার সব বাড়নেই ছিল ছোট্ট শীলার অবাধ ঘোরাফেরা। লেখাপড়ায় বেশ ভালো ছিলেন। তবে তার ডাক্তার বাবা তাঁকে পড়তে দেননি ক্লাস থ্রির বেশি। ভাইরা স্কুল থেকে ফিরলেই তিনি তাঁদের বই কেড়ে নিয়ে পড়তে বসতেন। অনেক ভাইবোনের পরিবারের বড় বোনের বিয়ে হয়ে যায় চোদ্দ বছরে। মেয়েবেলা না কাটলেও নিমেষে উধাও শীলার ছেলেবেলা।

কঠোর শ্বশুড়বাড়ির চারদেওয়ালে ঘোমটা টানা ছোট্ট মেয়েটা বন্দি। বাড়ির বাইরে পা দেওয়া তো দূরে থাক,জানালা দিয়ে আকাশ দেখাও নিষেধ। তাঁর শ্বশুর ও বর দুজনেই রেলকর্মী। পনেরো বছরে এক মেয়ের জন্ম দেন। এরপর একটি ছেলে ও আরও দুই মেয়ের মা হন শীলা।

শীলা ঘোষ
শীলা ঘোষ

ঘুরতে আমি খুব ভালোবাসতাম, তবে...

তাঁর বরের রেল চাকুরীর সুবাদে শীলা ঘুরেছেন পুরী,ভুবনেশ্বর,দিল্লী,আগ্রা,মাদুরাই এমন আরো অনেক জায়গায়। শীলা জানালেন, "মাঝরাতে আমি তিরুপতি বালাজীর মন্দিরের বাইরে দর্শনার্থীর লাইনে তেলেভাজা বেচেছি।" 

জীবন কারো হিসেবে চলেনা। স্বামীর মৃত্যু তাঁকে ভালো মা হতে শিখিয়েছে। ছেলে আর মেয়েদের শিক্ষায় কোনো ফারাক রাখেননি। ক্লাস নাইন এ পড়াকালীন মারা গেল বড় মেয়ে। ছোটমেয়ে মানসিক রুগী। মেজোমেয়ের পক্ষেও বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বছর পেরোনো সম্ভব হলনা। সংক্রামক ব্যধির শিকার হল সে। একমাত্র ছেলে রেলে চাকরি পেয়েছিল। কিন্তু শীলার লড়াই এখনও বহু বাকি। ছেলে দূরারোগ্য ফুসফুসের ব্যধিতে আক্রান্ত হয়ে বিছানায় পড়ে রইল টানা এগারো বছর।বন্ধ হয়ে গেল বেতন। পেটের ভাত জোগাতে আর ছেলের চিকিৎসার খরচ চালাতে ধারেদেনায় ডুবে গেলেন শীলা। ১৯৯৩ সাল থেকে ভুগছিল ছেলেটা। সেই অন্ধকার দিনগুলো আওড়াচ্ছিলেন শীলা। একদিন ডাক্তার বাবুরা ওঁর ফুসফুস থেকে ৩/৪ লিটার জল পাম্প করে বের করল। পরেরদিন ৭ লিটার। যেদিন ১১ লিটার জল বেরোলো, তার পরদিন মারা গেল ছেলেটা। ৪৩ বছরের ছেলের মৃত্যু একেবারে নিঃস্ব করে দিল শীলাকে।

বাঁচার তাগিদেই শীলার স্টার্ট আপ

পথে নামলেন শীলা। প্রথমে তিনি আর তাঁর নাতনি মিলে সারাদিন ধরে বানাতেন নানান ডিজাইনের মোমবাতি। নাতি এনে দিত বানানোর সরঞ্জাম। আর গঙ্গার ধারে বসে সেগুলি বেচতেন শীলা। ভালই বিক্রি হতো। তবে কাঁচামালের দাম মিটিয়ে লাভ প্রায় হত না বললেই চলে। একদিন তাঁর নাতি বুদ্ধি দিল পাঁপড় বানানোর। আমরা জানতে চাওয়ায় তিনি বললেন তার নাতি নাকি বেচায় মোটেই পটু না। দিনে এক প্যাকেটও বেচতে পারত না। তবে বুড়ির মিষ্টি মুখের ফোকলা হাসির দিওয়ানা বহু ক্রেতা।

প্রতিদিন শীলা ৩ টে বাস বদল করে বাড়ি থেকে এক্সসাইড মোড় আসেন। ট্রাফিক পুলিশ,হলদিরামের কর্মীরা,রাস্তার লোক সবাই তাঁকে সাহায্য করে রাস্তা পেরোতে।তাঁর চোখে ছানি,বয়সের ভাড়ে নুব্জ শরীর,তবু মুখে অমলীন এক হাসি।

রাস্তা পেরোতে সাহায্য করছেন ট্রাফিক পুলিশ
রাস্তা পেরোতে সাহায্য করছেন ট্রাফিক পুলিশ

কী রহস্য শীলার এই অদম্য লড়াই এর পেছনে? তিনি নিজেও জানেন না, শুধু জানেন জীবনে এইভাবে ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া আর তাঁর অন্য কোনও উপায় ছিল না।

গর্বিত শীলা আজ সফল উদ্যোগপতি। তিনি নিজেই জানেন না তাঁর কত অনুরাগী।তাঁর নম্র স্বভাব যাদু চালাতে জানে। আমরা এটা বুঝলাম যখন তিনি বললেন সারাদিন সাক্ষাৎকার নিলে দিতে হবে ১২০০ টাকা। অবাক হয়ে বললাম তাহলে তাঁর মাসে আয় কত? বুড়ি মুচকি হেসে বললেন তিনি অল্প শিক্ষিত মানুষ, অত হিসেব কষতে পারেন না।