ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবকদের সংযোগ রক্ষার প্ল্যাটফর্ম-কলকাতার মেসেজিং অ্যাপ Arch – The Way

0

গত কয়েক বছরে সামাজিক মাধ্যম ও চ্যাট অ্যাপ্লিকেশনের হাত ধরে যোগাযোগের দুনিয়ায় এসেছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য এই সাশ্রয়ী উপায়কে বেছে নিয়েছেন মানুষ, ই-কমার্স ব্যবসায়ী ও খুচরো ব্যবসায়ীরাও এই যোগাযোগ মাধ্যমের সুবিধা নিচ্ছেন। এমন কি শিক্ষক-শিক্ষিকারাও ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য চ্যাট অ্যাপ্লিকেশন ও সামাজিক মাধ্যমগুলিকে ব্যবহার করছেন।

এই সুযোগটাকেই কাজে লাগিয়েছে মেসেজিং অ্যাপ Arch – The Way। ২০১৪ তে, বিশেষভাবে শুধুমাত্র শিক্ষক ও পড়ুয়াদের জন্য এই অ্যাপটি তৈরি করেছেন কলকাতার রুদ্রেশ চৌধুরি ও তাঁর বন্ধু নিখিল বাজোরিয়া। Arch – The Way একটি নিরাপদ মেসেজিং অ্যাপ যার মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষিকারা পড়ুয়া ও তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারেন। এছাড়াও পুরো ক্লাসের সকলের জন্য কোনো মেসেজ সম্প্রচার করা বা ফাইল শেয়ার করার সুবিধাও রয়েছে, রয়েছে পড়ুয়া ও অভিভাবকদের ফিডব্যাক দেওয়ার ব্যবস্থাও।

আর্ক অ্যাপে বা ওয়েবসাইটে, সাইন আপ করে নিজেদের ক্লাস বানাতে পারেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা। প্রতি ক্লাসের থাকে একটি নির্দিষ্ট ক্লাস কোড। শিক্ষক –শিক্ষিকার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পড়ুয়া বা অভিভাবকদের অ্যাপের মাধ্যমে সেই ক্লাস কোডটি সাবস্ক্রাইব করতে হবে।

রুদ্রেশ জানালেন, “গ্রাহকদের গোপনীয়তা রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিই আমরা। শিক্ষক, ছাত্র বা অভিভাবক কাউকেই নিজেদের যোগাযোগের নম্বর একে অপরকে জানাতে হয় না এখানে, সেটাই আমাদের ইউএসপি। গ্রাহকদের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষার জন্যই এটা করা হয়েছে। তাদের বেশির ভাগ গ্রাহক পুনে, বেঙ্গালুরু ও আহমেদাবাদের। একজন শিক্ষক গড়ে ৫০-৬০ জন ছাত্র-ছাত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এই অ্যাপের মাধ্যমে।

অধিকাংশ শিক্ষক শিক্ষিকাই বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের, এবং অল্প কয়েকজন বাইরের, যারা কোচিং ক্লাসের জন্য এই অ্যাপটি ব্যবহার করেন। রুদ্রেশের বক্তব্য অনুযায়ী এখনও অবধি শিক্ষকদের থেকে ভাল ফিডব্যাক পেয়েছেন তাঁরা, শিক্ষকরা জানিয়েছেন এই অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগের ফলে পড়ুয়াদের হোমওয়ার্কের উন্নতি হয়েছে। এছাড়া অভিভাবক, ছাত্র ও শিক্ষকের মধ্যে সুস্থ্য ও ফলপ্রসু আলোচনা সম্ভব হচ্ছে।

স্বপ্নের পথে চলার জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ

রুদ্রেশ ও নিখিল দুজনেই চার্টাড অ্যাকাউনট্যান্ট হওয়ার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্তু ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়ার আগে দু’জনেই পড়াশোনা ছেড়ে দেন নিজেদের উদ্যোগ শুরুর স্বপ্নপূরণের জন্য। দু’জনের কারোরই প্রযুক্তি নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা না থাকায় প্রাথমিকভাবে অ্যাপ লঞ্চ করার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে হয় তাঁদের। এমন কি অ্যাপ লঞ্চ হওয়ার পরও সমস্যা চলতেই থাকে। প্রথম মাসে প্রযুক্তিগত সমস্যার জন্য অনেক গ্রাহকই তাঁদের অ্যাপ ব্যবহার বন্ধ করে দেন।

রুদ্রেশ বলছিলেন, “শুরুর দিকে এত গ্রাহক হারানোটা খুবই দুঃখজনক, কিন্তু এটা আমাদের প্রযুক্তিগত দিকটিকে ঠিক করতে সাহায্য করেছিল”।

মার্কেট রিসার্চের সময় তাঁরা লক্ষ্য করেন শিক্ষা-প্রযুক্তির ক্ষেত্রে প্রচুর টুল রয়েছে কিন্তু কোনোটাই শিক্ষক-ছাত্র-অভিভাবকের যোগাযোগের বিষয়টিতে জোর দেয় না, আর সেখান থেকেই Arch – the Way এর ভাবনার জন্ম।

পরবর্তীকালে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন বন্ধু নিখিল বাজোরিয়া, নীতেশ আগরওয়াল, অবিনাশ বিসওয়াল ও সৌম্য মালানি। সৌম্য লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স থেকে ফিন্যান্স নিয়ে স্নাতোকত্তোর করেছেন, নীতেশের নিজের স্টিলের ব্যবসা রয়েছে। অবিনাশ বিসওয়াল একজন পেশাদার শিল্পী, তিনি ডিজাইনের দিকটি দেখেন। বর্তমানে তাঁদের টিমে সদস্য সংখ্যা ৯।

প্রথম গ্রাহক হিসেবে রুদ্রেশ পান তাঁরই স্কুলের শিক্ষককে। তবে ব্যবসায় প্রথম গতি আসে যখন পুনের ভিক্টোরিয়াস কিডস এডুকেয়ারের অভিভাবকরা স্কুলের অধ্যক্ষকে আর্কের নাম সুপারিশ করেন। এরপর অগস্ট ২০১৫ তে এইমস পটনা সেই স্কুলের শিক্ষকদের Arch – The Way এর ব্যবহার শেখানোর জন্য তাঁদের আমন্ত্রণ জানায়।

“পরবর্তী পদক্ষের ছিল কীভাবে আরও বেশি সংখ্যক শিক্ষকদের আর্কে নিয়ে আসা যায়। আমরা বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে যাই শিক্ষকদের কাছে পৌঁছনোর জন্য। এভাবেই আমরা এক নতুন অংশের শিক্ষকদের পাই যারা প্রযুক্তির সুবিধা নিতে উত্সাহী। পাশাপাশি সেমিনার ইত্যাদিও আয়োজন করা হয়”, বললেন রুদ্রেশ।

হাজার হাজার গ্রাহকের কাছে পৌঁছনো

পরবর্তী ১৮ মাসে পাঁচ মিলিয়ন গ্রাহকের কাছে পৌঁছতে চায় আর্ক। স্টার্টআপটির দাবি তারা Content Delivery Networks (CDN) এর সর্বোচ্চ সুবিধা নিচ্ছে যাতে ছাত্ররা সহজেই পড়াশোনার জিনিসপত্র আদানপ্রদান করতে পারে।

রুদ্রেশ জানালেন, এই অ্যাপের পরিষেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাওয়া যায়। এখন অবধি নিজেদের সঞ্চয় থেকেই ফান্ডিং করছেন তাঁরা। তিনি আরও জানান কয়েকজন বিনিয়োগকারীর সঙ্গে কথা চলছে ও আগামী মাসের মধ্যেই বিনিয়োগ তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বললেন, “বর্তমানে লাভ করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়, বাজারে ঢোকা ও বেশি সংখ্যক গ্রাহক সংগ্রহই প্রাথমিক উদ্দেশ্য, ২০১৭ এর শুরুতে লাভ করতে শুরু করব আমরা।

ইওরস্টোরির মতামত

রুদ্রেশের দাবি অনুযায়ী Arch – the Way ভারতের সর্বপ্রথম শিক্ষক-ছাত্র-অভিভাবকদের যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম, এবং তাদের সরাসরি প্রতিযোগী ইউএস –এর রিমাইন্ড। তবে গুগল সার্চে দেখা যাচ্ছে গুরগাঁওয়ের myschoolapp, SINE এর ইনকিউবেট করা Trumplab ও কোচির EdDairyও একই কাজ করে।

IBEF এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৭ তে ভারতের অনলাইন শিক্ষার বাজার ৪০ বিলিয়ন ইউএস ডলারে পৌঁছবে। এখন আর ছাত্ররা ক্লাসে বসে অ্যাসাইনমেন্ট লেখে না বা স্কুলে যেতে না পারলে বিপদে পড়ে না। আমাদের রোজকার জীবনে অ্যাপ যেমন একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে আগামী দু বছরে এইধরণের আরও বেশ কিছু অ্যাপ বাজারে আসবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

লেখা-অপরাজিতা চৌধুরি

অনুবাদ-সানন্দা দাশগুপ্ত