মৃত্যুর সঙ্গে নিত্য পাঞ্জা লড়েন বালির বীরেন সাঁতারু

2
জলে নামার সম্বল বলতে সাঁতারের চশমা, হাফ প্যান্ট, তোয়ালে আর অলিভ অয়েল। প্রশিক্ষিত ডুবুরিরা যেখানে যেতে ভয় পান, সেখানে ডাক পড়ে বেলুড়ের বীরেন কর্মকারের। জলে ঝাঁপিয়ে ডুবন্ত মানুষকে উদ্ধার করা তাঁর কাছে জলের মতোই সোজা। আধুনিক সরঞ্জাম বা ডুবুরির পোশাক, কিছুই নেই। সে অর্থে ঢাল তলোয়ারহীন এই নিধিরাম সর্দারের পুঁজি শুধু সাহস আর পরোপকারের ইচ্ছে।

স্রোতকে হার মানিয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে জীবন ছিনিয়ে আনাই তার প্যাশন। কিন্তু, এত সাহস আর দৃঢ় এই সংকল্পের উৎস কোথায়? কীভাবে পান মনের এত জোর? বীরেনের কথায়, ‘বুকভরা শ্বাস, সাহস আর মানুষের ভালোবাসাই আমার পুঁজি’।

এই প্যাশন শুরুর গল্পটাও বেশ টানটান উত্তেজনার। তখন বয়স কত হবে তের চোদ্দ ম্যাক্সিমাম। ক্লাস সেভেনে পড়তেন। বিকেলে ফুটবল খেলার পর রোজকার মত সেদিনও গঙ্গায় সাঁতার দিতে গিয়েছিলেন। হঠাত দেখেন পরিচিত এক মহিলা জোয়ারের টানে ভাসছেন। তাকে বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পরেন বীরেন। ওই বয়সেই ঝাঁপিয়ে পড়ে সাঁতরে তাঁকে টেনে তুলে এনেছিলেন এই নির্ভীক কিশোরটি। ওই শুরু। তিনি এখন বালির দেবদূত। বীরেন কর্মকার। এক ডাকে তল্লাটে সবাই চেনে।

৪০ পার করেও এতটুকু বিরাম নেই। ‘কোনও পারিশ্রমিক ছাড়াই যেখান থেকেই ডাক আসুক, পুলিশ বা ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট আসার আগে পৌঁছে যান বীরেন বাবু। মৃত্যুর হীমশিতল নিশ্চিত গহ্বর থেকে একের পর এক জীবন ফিরিয়ে দিয়েছেন এই যুবক। আবার অনেক সময় এই পাঞ্জায় হেরেওছেন। হয়ত খবর পেয়েছেন দেরিতে। মৃতদেহ টেনে তুলতে হয়েছে অনেক। মনের ভীতর তখন অন্য স্রোত চলে। বিষাদের বান ডাকে মনে। বলছিলেন, “আত্মীয়, পরিজনদের কাছে প্রাণহীন দেহটারও তো অনেক মূল্য। তা পৌঁছে দিতে পেরে নিজেকে কৃতার্থ মনে করি।

আশপাশের সমস্ত থানা তো বটেই, দূর দূরান্ত থেকেও বীরেনের ডাক আসে মানুষকে উদ্ধারের জন্য।

নিজের শরীরের ব্যাপারে সতর্ক বীরেন। নিয়মিত যোগাভ্যাস করেন। আর করেন গুরুমুখী ক্রিয়া অভ্যাস। শরীরকে তাজা রাখতে নানান কসরত করেন রোজ সকালে। কাকভোরে উঠে প্রাণায়াম আর যোগাভ্যাসের পর গঙ্গায় সাঁতার কাটেন অনেকক্ষণ ধরে। সাহসিকতার জন্য পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার। পত্রপত্রিকায় তাকে নিয়ে হইচইও হয়েছে অনেক। তাতে অবশ্যি অহমিকার ডানা গজায়নি। এসব নিয়ে মাথাই ঘামান না। সংসার চালাতে সম্প্রতি স্থানীয় একটি জুটমিলে অস্থায়ী নিরাপত্তা কর্মীর কাজে যোগ দিয়েছেন। টের পেয়েছেন সংসার এক কঠিন সমুদ্র এখানকার জল তত সোজা নয়। তাই সেই সাঁতারে অত মন নেই। মন পড়ে থাকে শুধু বিপন্নকে বাঁচানোর সাঁতারে।