যোগাসনে শান্তিপুরের মান রাখল তাঁতির মেয়ে রিয়া

0

গণেশ পাল তাঁত বোনেন। ওটাই সংসারে একমাত্র রোজগারের পথ। শুধু তাঁত বুনে আজকাল আর পেট চলে না। তবু উপায় নেই। মেয়েটাকে আরও অনেকটা রাস্তা পেরোতে হবে। তাঁত আকড়ে স্বপ্ন বোনেন গণেশ। মেয়ে বছর বারোর রিয়া পাল বাবার স্বপ্ন বৃথা যেতে দেয়নি। কুয়ালালামপুরে ২৪ তম আন্তর্জাতিক যোগা প্রতিযোগিতায় সব্বাইকে টেক্কা দিয়ে সোনা জিতে ফিরেছে।

শান্তিপুর স্টেশন থেকে ৩ কিলোমিটার। গঙ্গার ধারের ছোট্ট চলতা ওঠা ভগ্নপ্রায় বাড়িটা এখন গোটা গ্রামের গর্ব। ছোট বড় যে কাউকে জিজ্ঞাসা করুন, সোনার মেয়ে রিয়া পালের বাড়ি চিনিয়ে দেবে সবাই। ছোট্ট মেয়েটা এখন গ্রামের সেলিব্রিটি। শুধু গ্রাম কেন, বিশ্বের দুয়ারে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে।

মূলত বাবা গণেশ পালের উৎসাহে যোগাসনে হাতে খড়ি রিয়ার। বাবার হাত ধরে মাত্র ৩ বছর বয়সে স্থানীয় শান্তিপুর বেঙ্গল ইউনিটি যোগা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পৌঁছে যায়। তখন থেকেই শুরু কঠোর অনুশীলন। বাপ-বেটির স্বপ্ন ছিল, একদিন আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছে দেশের নাম উজ্জ্বল করার। লক্ষ্য স্থির, তাই সাফল্য পেতেও দেরি হয়নি। শান্তিপুর শরৎকুমারী উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রী রিয়া ২০১৪ সালে হায়দরাবাদে জাতীয় যোগা প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে ওয়ার্ল্ড যোগা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের ছাড়পত্র পায়। এরপর গত ১৮ থেকে ২০ ডিসেম্বর,২০১৫য় মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে ২৪ তম আন্তর্জাতিক যোগা প্রতিযোগিতার আসর বসে। অনুর্ধ্ব ১২ বিভাগে প্রতিযোগী ছিল নদিয়ার শান্তিপুর ব্লকের চরজিজিরা গ্রামের তাঁতির মেয়ে রিয়া।

কুয়ালালামপুর পৌঁছানোর পথটাও ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। কারণ বাবার আর্থিক সঙ্গতি। তাঁত বুনে সংসার চালাতেই হাঁপিয়ে ওঠেন গণেশ পাল। মেয়েকে বিদেশে নিয়ে যাওয়া একরকম অসাধ্যই ঠেকে গরিব বাবার কাছে। মন খারাপ হয়ে যায়। ভাবেন, মেয়ের প্রতিভা সামান্য কটা টাকার জন্য এভাবে নষ্ট হয়ে যাবে। সাহায্যের হাত বাড়ান স্থানীয় বিধায়ক তথা শান্তিপুর পুরসভার চেয়ারম্যান অজয় দে, শান্তিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি পার্থপ্রতিম রায়। পাশে ছিল স্থানীয় নানা সংগঠনও। রিয়া পৌঁছে যায় কুয়ালালামপুর।

নিরাশ করেনি। বাবাকে দেওয়া কথা রেখেছিল ছোট্ট মেয়েটা। নিজের পরিশ্রম আর অধ্যবসায় তাকে নিয়ে গিয়েছে সাফল্যের শিখরে। অন্যান্য দেশের প্রতিযোগীদের হারিয়ে সোনা ছিনিয়ে আনে দেশের জন্য, নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, গ্রামের জন্য। তাইতো অমন সোনার মেয়ের পা শান্তিপুরে পড়তেই মানুষের ঢল নামে। ফুলে, মালায়,সংবর্ধনায় ভরিয়ে দেয় শান্তিপুরের মানুষ। সেদিন স্টেশন থেকে বাড়ি পর্যন্ত ৪০ মিনিটের পথ পেরোতে তিন ঘণ্টা সময় লেগেছিল। ছোট্ট রিয়া অবশ্য সাফল্যের পুরও কৃতিত্বই দেয় বাবা, মাকে।

এখানেই থেমে থাকতে চায় না শান্তিপুরের সোনার মেয়ে। এবার লক্ষ্য আরও কঠিন- এশিয়াড অলিম্পিক। একে একে আরও বড় পাহাড় ডিঙানোর লড়াইয়ে নামছে রিয়া। এইটুকুন বয়সেই জেনে গিয়েছে চ্যালেঞ্জ কাকে বলে। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি কঠোর অনুশীলনই এখন রিয়ার রোজকার নিয়ম।