পরিবর্তনই অনুকে সচল রাখে

0

ভারতীয় হিসাবে তিনিই প্রথম হাফ আয়রন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে নামার যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। প্রথম এশিয়ান প্রতিদ্বন্দ্বী। যিনি আলট্রামান শেষ করেছিলেন। আলট্রামান হল একটি ট্রায়াথলন প্রতিযোগিতা। যেখানে তিনটি বিভাগ থেকে – ১০ কিলোমিটার সাঁতার,‌ ৪২০ কিলোমিটার বাইক চালনা ও ৮৪.৪ কিলোমিটার দৌড়ের কঠিন প্রতিযোগিতা। খেলোয়াড় হওয়ার পাশাপাশি, ডক্টর অনু বৈদ্যনাথন একজন উদ্যোক্তা হিসেবে প্যাটএনমার্কস নামের এক ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি সংক্রান্ত সংস্থা চালাচ্ছেন। ইওর স্টোরির সঙ্গে কথা বলছিলেন অনু। জানতে পারলাম অনুর গল্প। নিজের কথা নিজেই বলতে ভালোবাসেন অনু।

ছোটোবেলা থেকেই আমি অত্যন্ত সরল ও শান্ত। সম্ভবত ব্যাঙ্গালোরে থাকাকালীন ছোটোবেলার দিনগুলো খুব মনোরম ছিল। তখন চারপাশটা ছিল সবুজে ঘেরা।কোনও বড় বড় শপিং মল ছিল না। রাস্তাঘাট ছিল নিরাপদ। আমরা সাইকেল চালিয়ে যাতায়াত করতাম। যদি ১০-এর মধ্যে নম্বর দেবার কথা বলা হয় তো আমি আমার শৈশবকে ১৫ দেব! আমার শৈশবের প্রথমদিকটা তামিলনাড়ুর একটা গ্রামে কেটেছিল, ওখানে আমাকে দেখাশোনার জন্য একজন মহিলা ছিলেন কারণ আমার মা চাকরি করতেন আর খুব দায়িত্বের কাজ বলে ব্যস্তও থাকতেন। 

এই সময় থেকে পরিবেশের সঙ্গে আমার গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ছেলেবেলা থেকে আমার মধ্যে একটা যাযাবর বাস করে। আমরা সেই সময় প্রায় তিন চারটি গ্রামে ঘুরে ঘুরে থাকতাম। তখন আমার বছর পাঁচেক বয়স হবে। 

একজন পেশাদার মহিলাকে মা হিসাবে পাওয়া, তাঁকে একটি ছোট ব্যবসা শুরু করতে দেখা এবং ওই প্রজন্মের প্রাণোচ্ছল জীবন – এ সবই আমি দেখেছি। আমি গতিশীল থাকতে পছন্দ করি, মানুষের সাথে মিশতে, তাদের কথা শুনতে ভালোলাগে, সেই থেকে কিছু অভিজ্ঞতা জড়ো করি নিজের জীবনের জন্য। আপনি যদি গ্রহন করতে পারেন তাহলে অনেক ভুল এড়িয়ে যেতে পারেন।

খেলাধূলা ও বানিজ্যিক উদ্যোগ

আমার সংস্থাকে ভালোভাবে চালনা করতে আর ক্রেতাদের সময় দিতে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করি। আমরা একটি ছোট্ট দল। কোটিপতি হাওয়া আমাদের লক্ষ্য নয়। আর খেলাধুলোর ব্যাপারে যদি বলতে হয়, খেলার জন্যই আজ আমি নিজের পরিচিতি তৈরি করেছি। তিন বছর আগে যখন বাচ্চাদের খেলার কোচ হিসাবে কাজ শুরু করি তখন সেটা ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতা। দারুণ ভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছি। 

যে কোনও বিষয়, তা সে খেলা হোক বা ব্যবসা অথবা কোচিং সবগুলোই দারুণ। পরিবর্তনই সচলতার প্রতীক, যখন স্কুলে ছিলাম তখন পিটি, মার্চ পাস্ট হত, তবে আমার পছন্দ ছিল বাইক চালিয়ে স্কুল যাওয়া। কখনও কখনও মনে হয় কিছুটা বোকামি আর পারিপার্শ্বিক বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা আমাকে একজন ক্রীড়াবিদ হতে সাহায্য করেছে। আমার মনে হয় যাত্রাটা বেশ সন্তোষজনক ও দুঃসাহসিক হয়েছে, তবে একই সঙ্গে আমি নারীশক্তির কোনও ছবি আঁকতে পারব না, কারণ আমরা তা নই। দৈনন্দিন জীবনে আমাদেরকে বিভিন্ন সমস্যার সাথে যুঝতে হয়, পৃথিবীতে আমরা সবচেয়ে পরিশ্রমী জাতি। কিন্তু তুলনামূলক বিচারে আমরা অনেকটাই নীচে আছি। খেলা আমাকে জীবনে অনেক কিছু শিখতে ও নিজেকে জানতে সাহায্য করেছে, খেলা আমার কাছে পুর্ননবীকরনযোগ্য, একে থামিয়ে দেওয়ার কোনও কারণ আমি দেখি না।।

স্বামীই শক্তি, স্বামী প্রেরণা

আমার বড় সাফল্য হল আমার স্বামীর সঙ্গে দেখা হওয়া। আমি যা হতে চেয়েছি তাতে সর্বদা আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন। আমাকে অনেকেই জিজ্ঞেস করেন, একজন উচ্চাকাঙ্খী মহিলা যদি জীবনে এগিয়ে চলতে চায়, তবে তাঁর স্বামীর মধ্যে কী কী গুণ থাকা উচিত? আমার মনে হয়, তিনি যেন কখনও সেই চলার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ান। এবং এটি তখনই সম্ভব যখন পুরুষ মানুষরা এই সম্পর্কের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত বোধ করেন। আবার তোমার থেকে তোমার গ্রাহকরা যখন এমন কিছু নেন যা তাদের অন্য প্রতিযোগীদের থেকে বেশী সুবিধা দেয়, তখনও খুবই ভালো লাগে। অথবা নিজের মা-বাবাকে তাঁদের পছন্দের জিনিসগুলি করতে দেখলেও। যেমন আমি মায়ের সঙ্গে বাগান করি, বাবার সাথে হাঁটতে যাই, এখন এগুলো করার জন্য সময় পাই। আমার মনে হয় এই ছোট বিষয়গুলি আমার সাফল্যকে বর্ণনা করে...

সময় সামলানো

আমি সবসময় মনে করি যে একসঙ্গে সবকিছু কখনই পাওয়া যায় না, কিন্তু কেউ যদি সেটা তোমাকে বলে তবে নিশ্চয় তা ভেবে দেখা উচিত। আমি ছ’মাস আগে থেকে প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি, এটা আমার ফোকাসের সময়, এই সময় আমি অন্য কিচ্ছু করি না, এমনকি মক্কেলের সঙ্গেও দেখা করি না। পরবর্তী ছ’মাসে আমি আবার কাজে ফিরে যায়। তুমি কীভাবে তোমার সম্পত্তি রক্ষা করবে, এই পথটি খুব নিয়ন্ত্রিত। যখন তোমার পরিবার ও সন্তান রয়েছে তখন বিভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে ক্রমাগত প্রশ্ন উঠবে তুমি কে। তোমাকে নিজে বুঝতে হবে বাস্তব জীবনকে, যদি তোমাকে সব কিছুতে পারদর্শী হতে হয় তাহলে তোমাকে একটা প্রান্তে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে, তবে এটা ভাবার কোনও কারণ নেই যে তুমি যা চাইবে তাই পাবে। নারী হওয়া বেশ চ্যালেঞ্জের এবং আমি খুশি বহুমুখী হয়ে। সময় পরিচালনার ক্ষেত্রে আমি কঠোর আগ্রাধিকার মেনে চলি। আমি সবসময় বলেছি, আমি যা সন্মান পেয়েছি, তা আমাকে শুধুমাত্র খেলা এনে দেয়নি, দিয়েছে এই নিয়মানুবর্তিতা। তোমায় সব কিছুকে আলাদা করে জানতে হবে। সবসময় আমিও সব কিছুর মধ্যে সমতা রাখতে পারি না, কিন্তু অগ্রাধিকারগুলিকে মনে রাখি।

নিয়ম যখন অভ্যেস

দীর্ঘকালীন নিয়মানুবর্তিতা অভ্যাসে পরিনত হয়। এটি একদিনে হয় না। বাগান পরিচর্যার মতো একটি সাধারণ কাজেও প্রতিদিন গাছে জল দিতে হয়। তাদের নিজের মতো করে থাকতে দিতে পারো না। খুব ছোট থেকে নিয়মানুবর্তী হতে হয় এবং এটি জন্ম নেয় খুব সাধারণ কিছু কাজের মধ্য দিয়ে। যেমন খাবার বাড়া, টেবিল পরিষ্কার করা। তুমি যদি ২১ বছর বয়সের পরও মা-বাবার সঙ্গে থাকছ, তবে বাড়ি ভাড়া দিয়ে দেওয়া উচিত। মোট কথা, কিছু করতে হবে – সব এমনিই হয়ে যাবে, এমন ভাবা ঠিক নয়। আর আমার অভিভাবকরা যেহেতু নিয়মানুবর্তী ছিলেন, কিছু না করলে ওনারা বলতেন। হয়তো প্রবল কর্তৃত্বে কিছু বলতেন না, বলতেন পারস্পরিক শ্রদ্ধার জায়গা থেকে। তারা বলতেন, --’’তুমি এই কটা কাজ করলে তোমার জীবনই আরও ভালো হবে। আশা করি তুমি তা বুঝতে পারছ।’’ তাঁরা আমাদের সঙ্গে যখন মিশেছেন, সবসময় সমবয়স্কর মতো পাশে থেকেছেন। কখনো ছোট করে দেখেননি আমাদের। অথবা পরীক্ষায় ৮৫% নম্বর পেতেই, এমন কিছু বলে কখনো চাপ দেন নি।

পরামর্শ

আমার একটি পরামর্শ – আন্তরিকভাবে চেষ্টা করো। আমি আগেই বলেছি, ওই ১০০ কোটিই আসল কথা নয়, একজন কী ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তার ব্যাপ্তিই আসল। ব্যবসায় উদ্যোগী হবার পিছনে কী আছে তা দেখো। যদি তোমার মধ্যে সেই খিদে থাকে, যদি তুমি কাজটি করতে আনন্দ পাও, যদি তুমি মূল্যবা‌ণ কিছু করতে পারছ, তবে যেভাবে পারো তা করো। কিন্তু অন্যের সঙ্গে তুলনা করে নিজের মূল্য ঠিক করো না। নিজের সাধ্যের মধ্যে নিজেকে রাখো। শুধু ফেসবুক, ইউটিউব-ই নয়, আমি এমন অনেক ছোট উদ্যোগপতিদেরও সফল হিসাবে দেখি যারা ২০ বছর ধরে ব্যবসা করে চলেছেন। আপনি যদি তাদের দপ্তরে যান, আপনাকে তারা এক গ্লাস জল অন্তত দেবেন। এই মূল্যবোধ আমি ব্যাপ্ত হতে দেখছি না। আন্তরিক থাকো। নীতিপরায়ণ থাকো। এমন কিছু সৃষ্টি করার চেষ্টা করো যা বেঁচে থাকবে। কখনো কেবল যশের পিয়াসী হয়ো না।

Related Stories