পরিবেশ বাঁচাতে স্যানিটারি ন্যাপকিনে বিপ্লব ওয়াকলিংয়ের

0
টিম ইকো ফেমি
টিম ইকো ফেমি

নিউজিল্যান্ডের এক গ্রামে বেড়াতে গিয়েছিলেন। ছোট্ট একটা দোকানে থমকে দাঁড়ান। ওই দোকানে এক রকম স্যানিটারি প্যাড রীতিমতো অবাক করে দিয়েছিল স্কাথি ওয়াকলিংকে। বেড়াতে গিয়ে গণ্ডগ্রামে এমন জিনিস দেখবেন ভাবতেই পারেননি। সেই দিনের ওই এক টুকরো কাপড়ই বদলে দেয় তাঁর জীবন, বলছিলেন ওয়াকলিং। পশ্চিমের দেশে এমন জিনিস দেখেননি কখনও। তিনি বা তাঁর দেশে অনেক মহিলা যা ব্যবহার করতেন তার থেকে আলাদা। স্যানিটারি প্যাড যে ধুয়ে আবার ব্যবহার যায়, ভাবতেই পারেনিন। আর সেই পদ্ধতিটাই মনে ধরেছিল ওয়াকলিংয়ের। পয়সা যেমন বাঁচে, তেমনি পরিবেশও দূষিত হয় না। এক হিসেবে দেখা গিয়েছে শুধু আমেরিকাতে বছরে ১২ মিলিয়ন প্যাড আর ৭ মিলিয়ন তুলোর বান্ডিল বর্জ্য হিসেবে ফেলা হয়। তাতে যে প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয় সেগুলির পঁচন ধরতে বছর কোটে যায়। শুধু তাই নয়, ওই প্যাডেগুলির ক্লোরিন ব্লিচ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।

১৯৯৭ সালে ওয়াকলিং আসেন অরোভিলে (পণ্ডিচেরির একটি গোষ্ঠী), তখন আবার স্যানিটারি বর্জ্য ভাবিয়ে তোলে তাঁকে। যদিও তিনি পশ্চিমী পদ্ধতির সঙ্গেই পরিচিত, যেখানে এই সমস্যা দেখা যায় না বললেই চলে। ভারতে স্যানিটারি প্যাডের বর্জ্য একটা বড় সমস্যা। অনেক সময় পুড়িয়ে ফেলা হয়, যার নিট ফল পরিবেশ দূষণ। অথবা মাটিতে পুঁতেও ফেলা হয়। কিন্তু প্লাস্টিক থাকা্য় সহজে পঁচন ধরে না। এই সমস্যা মিটিয়ে কীভাবে পরিবেশ বাঁচানো যায় ভাবতে শুরু করলেন ওয়াকলিং। গ্রামের দোকানের কাপড়ের স্যানিটারি প্যাডের কথা মনে ছিলই। এবার সেটা নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবনা চিন্তা শুরু করে দিলেন। তিনি এবং তাঁর টিম ঋতু এবং তার নানা সমস্যা নিয়ে কথা বলেন ৩০০ জন মহিলার সঙ্গে ।বুঝতে পারেন এখানে ঋতুর সময় পরিচ্ছন্নতা নিয়ে নানা সংস্কার এবং বিধিনিষেধ, খোলাখুলি আলোচনাতে আপত্তি- এমন হাজারো সমস্যা দেখা যায়। গোটা এলাকা চষে ফেলন। স্থানীয় মহিলাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের বাড়ির পুরনো কাপড়ের তৈরি প্যাড (৪৩শতাংশ) ব্যবহারের ধরণ কিংবা যারা ন্যাপকিন(৪১ শতাংশ) ব্যবহার করে কী সুবিধা-অসুবিধা বোঝার চেষ্টাকরেন। ১৫ শতাংশের মত মহিলা কাপড়, প্যাড দুইই ব্যবহার করেন। কিন্তু পুরনো যে কাপড় ব্যবহার করা হয় সেগুলিতে তেমন একটা শুষে নওয়ার ক্ষমতা নেই। ৭ বছর নিজে ব্যবহারের পর ওয়াকলিং ডিজাইন নিয়ে ভাবনা চিন্তা শুরু করলেন। ২০০৯ সালে ফ্লানেল-সুতি কাপড়ের বারবার ব্যবহার করা যায় এমন খুব অল্প সংখ্যক প্যাড বানান। জন্ম নিল ইকো ফেমি।


প্যাড তৈরি হল। ওয়াকলিং এবার তা বাজারে বিক্রি শুরু করলেন।চাহিদা বাড়তে থাকল। কিছু দিনের মধ্যে কয়েকজন মহিলা ফোন করেন জানান, প্যাডগুলি তাঁরা বাজারে বিক্রি করতে চান। ‘কাপড়গুলির শোষণ ক্ষমতা আমি নিজে পরীক্ষা করে দেখেছি। প্যাডগুলি হবে এমন যার পাশে ডানা থাকবে, নরম হতে হবে, নানা আকারে এবং সর্বোপরি শোষণ ক্ষমতা থাকা জরুরি। কিছুদিনের মধ্যে লোগো পেলাম, চেন্নাই থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করলাম।’, বলছিলেন ওয়াকলিং। ইকো ফেমির প্রডাক্টগুলি লিকপ্রুফ (তরল যাতে বেরিয়ে না যায়)। ডানা বিশিষ্ট, দিন, রাত এবং প্যান্টি লাইনার-এই চার ধরণের পাওয়া যায়। এক একটি প্যাকেটে থাকে চারটি করে প্যাড। পাঁচ বছর পর্য়ন্ত ব্যবহার করা যায়। যদি ঠিকভাবে যত্ন করা হয় তাহলে ৭৫ বার পর্যন্ত ধুয়ে ধুয়ে ব্যবহার করা যায়। আর্থিকভাবে অসমর্থ এমন ১৫ জন মহিলা যারা অরুভিল ভিলেজ অ্যাকশন গ্রুপের সদস্য তারাই প্যাড সেলাই করেন। আয়ের পথও খুলল। কাজের জন্য টাকা পান সবাই।

এতটা পথ সহজছিল না। কাজ করতে করতেই আর্থিক সমস্যার সম্মুখীন হন ওয়াকলিং। গিস স্পুর (সংস্থার সহ স্থপতি জেসমিন মাদেমার স্বামী)তামিলনাড়ুতে যিনি ইউএন লিমিটেডে সামাজিক বিযয়গুলি দেখভাল করেন তিনি পরামর্শ দেন ইকো ফেমিকে সামাজিক সংস্থা হিসেব গড়ে তোলার । ‘এই পরামর্শ আমার মনে ধরে। খুব বেশি খাটতে হয়নি। কারণ সেলাই জানা অনেক মহিলা এবং মেশিন দুইই প্রস্তুত ছিল’, বলেন ওয়াকলিং।

পরিবেশ বান্ধব স্যানিটারি ন্যাপকিন পশ্চিমে বেশ জনপ্রিয় বিশেষ করে সেই সব মহিলার কাছে যারা পরিবেশ এবং একই সঙ্গে স্বাস্থ্য সচেতন। কারণ বেশিরভাগ স্যানিটারি প্যাডে ব্লিচ(ক্ষার) থাকে। ঠিক সেই সমস্যার মূলে আঘাত করতে চেয়েছে ইকো ফেমি। ‘আমরা আন্তর্জাতিক ভাবে বিশেষ করে পশ্চিমী দেশে ৮ থেকে ১০ ডলার পাইকারি দামে প্যাডের বিক্রি বাড়াতে চোয়েছিলাম। আমি ব্যাবসায়ী নই, তাই অনেক কিছু শেখার ছিল। মনে প্রাণে সামাজিক উন্নতি চাই। সেই কারণে দীর্ঘকালীন সাপ্লাই-চেন বানানোর দিকে ঝুঁকছিলাম’, ব্যবসা বাড়ানো প্রসঙ্গে বলেন ওয়াকলিং। বর্তমানে ১৪টি দেশে ইকো ফেমি রপ্তানি হয়। বিদেশের বাজারের জন্য ২০১৪য় ভেষজ সুতি থেকে আরও উন্নতমানের প্যাড তৈরির পরিকল্পনা হয়। কীভাবে উৎপাদন হবে তার জন্য গবেষণামূলক কাজও হয়। সমস্যা একটাই। বড় বিনিয়োগ দরকার ছিল। কিন্তু ওই সময়টার আরও ঝুঁকি নিতে ভয় পাচ্ছিলেন ওয়াকলিং। তাড়াহুড়ো না করে আস্তে আস্তে ব্যবসা এগিয়ে নিয়ে যাওয়াতেই বিশ্বাসী তিনি। ইতিমধ্যে তিনিএবং তাঁর দুই বন্ধু ১ লক্ষ টাকা করে ব্যবসায় ঢুকিয়েছেন, এক পরিচিত বন্ধুর কাছ থেকে বিনা সুদে ৫ লক্ষ টাকা ঋণ নেন।সেই দিয়েই আস্তে আস্তে স্বপ্নের পথ ধরে হাঁটছিলেন ওয়াকলিং। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে এবং ভারতের মেট্টো মন্ত্র(মুম্বই) এবং গ্রিন অ্যান্ড গুড অথবা বক্সট্রির মতো অনলাইনে সাইটে ইকো ফেমি খুচরো বিক্রি হয়। মাসে গড়ে ১২০০ প্যাকেট বিক্রি । চাহিদা যেভাবে বাড়ছে ওয়াকলিং এবং পার্টনাররা ভাবছেন, বছর শেষের আগেই সংখ্যাটা দ্বিগুন হয়ে ২৫০০ ছাড়িয়ে যাবে।

তামিলনাড়ু এবং উত্তরপ্রদেশে ২ বছর পরীক্ষার পর গ্রামেও ইকো ফেমি ধীরে ধীরে বাজার পেতে শুরু করেছে। নান গবেষণার পর ওয়াকলিং বুঝতে পারেন মহিলারা সব জায়গায় একইরকম। ইকো ফেমিও তাই সব জায়গায় সমান জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। গ্রামীণ মহিলাদের জন্য রাখা হয়েছে ভাঁজ করা যায় এমন, ডানা সমেত এবং আরও একটি মডেল যেটিতে বেল্ট রয়েছে। দাম একটু বেশিই। যেগুলি রপ্তানি করা হয় সেই একই কাঁচামাল দিয়ে তৈরি ইকো ফেমির দাম গ্রাম্য এলাকায় ঠিক হয় ৮০ টাকা করে। তবে প্রথম কিছু বিনামূল্যে দেওয়া হয়। কারণ প্যাড ফর প্যাড ক্যাম্পেইন থেকে গ্রামীণ এলাকার জন্য কিছু টাকা পাওয়া যায় সেই সময়। সেটাই ব্যবসার স্ট্র্যটেজি সহজ করে দেয়। একটি এনজিওর মাধ্যে গ্রামে প্রথম প্যাড বিক্রির বরাত মেলে। ঋতুকালীণ পরিচ্ছন্নতার শিক্ষার সঙ্গে প্যাডগুলি স্কুলেও দেওয়া হবে। ‘আমরা প্যাডগুলি মেয়েদের দিকে ছুড়ে দিতে চাইনি বরং বোঝার সুযোগ দিয়েছি। শিক্ষার দিকটা সামলানোর জন্য আমাদের সহযোগীর দরকার ছিল’, বললেন ওয়াকলিং।

কীভাবে উৎসাহ পেলেন ওয়াকলিং? তিনি বলেন, মহিলাদের জাগাতে চেয়েছিলেন, একইসঙ্গে পরিবেশে বাড়তে থাকা দূষণের সঙ্গে লড়তে চেয়েছিলেন। মহিলাদের শরীর নিয়ে ভুল ধারণাগুলি ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, ঋতু নিয়ে লজ্জা পাওয়া বা লুকানোর কিছু নেই। ওয়াকলিং শেষ করলেন এই বলে যে, ‘পণ্যটা আসলে হিমচূড়ার শিখর, মহিলাদের উন্নয়ন এবং যোগ্য সম্মান দেওয়াই ছিল মূল লক্ষ্য’।