শিক্ষার মান বাড়াতে সলমন খানের পাশে রতন টাটা

0

দু'জনেই নিজ ক্ষেত্রে নামজাদা। একজন টাটা সন্সের চেয়ারম্যান এমেরিটাস রতন টাটা। অন্যজন 'খান অ্যাকাডেমি' খ্যাত সলমন খান (ইনি কিন্তু বলিউড স্টার সেই সলমন নন)। শিক্ষার প্রসারে স্পেশালাইজড অনলাইন কনটেন্ট তৈরি করতে ডিসেম্বরের গোড়ায় টাটা ট্রাস্টের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে নট-ফর-প্রফিট সংস্থা খান অ্যাকাডেমি। মাল্টি মিলিয়ন ডলারের এই পার্টনারশিপে কাজে লাগান হবে ভারতীয় শিক্ষকদের। একইসঙ্গে বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় তৈরি করা হবে অনলাইন কনটেন্ট। প্রাথমিকভাবে কনটেন্ট তৈরি হবে এনসিইআরটি'র পাঠ্যবই থেকেই।

এই পার্টনারশিপ শিক্ষাক্ষেত্রে ভারতে জোয়ার আনবে বলেই মনে করে ইয়োর স্টোরি। ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, কনটেন্ট ডেভেলপার, শিক্ষা সংক্রান্ত স্টার্টআপ -সবার জন্যই খুলে যাবে এক বিশাল সম্ভাবনার দরজা। যে সব ছাত্রছাত্রী উন্নতমানের শিক্ষার সুযোগ পায় না এবার তা তারা পাবে। খান অ্যাকাডেমির প্রতিষ্ঠাতা সলমন খান জানিয়েছেন, ভারতে ed-tech startups-এর সঙ্গে কাজ করতে তিনি খুবই আগ্রহী। যাতে তাঁর সংস্থার যে লক্ষ্য, সকলের জন্য ও সব জায়গায় বিনামূল্যে বিশ্বমানের শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া যায়।

সবথেকে আকর্ষণীয় বিষয় হল কনটেন্ট মিলবে অনলাইন ও অফলাইন দু'ভাবেই। এ জন্য সামান্য কিছু খরচ করলেই চলবে। ইতিমধ্যেই পাইলট প্রোগ্যাম হিসাবে বেশ কয়েকটি স্কুলে কাজ শুরু করে দিয়েছে খান অ্যাকাডেমি। শিক্ষকরা যাতে তাঁদের দক্ষতা বাড়াতে পারে সে দিকেও নজর দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রফেশন্যালস, যাঁরা শিক্ষাদান করতে চান তাঁরাও এগিয়ে আসবেন বলে আশা রাখে খান অ্যাকাডেমি। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা দরকার, খান অ্যাকাডেমির টিউটোরিয়াল শিক্ষকদের অন্যভাবে কাজে লাগাতে চায়। শিক্ষকরা যাতে ছাত্রছাত্রীদের বাড়তি সহায়তা করতে পারেন সেদিকেই ফোকাস রাখা হবে।

সলমন খানের এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন রতন টাটা। অ্যাকাডেমির এই চিন্তাভাবনাকে একটু অন্যরকম বলেই মনে হয়েছে টাটার। এতে যে শুধুমাত্র নিরক্ষররা সাক্ষর হবে তা নয়। পাশাপাশি যে কোনও সময়, যে কোনও জায়গায় এবং যে কেউ সেই শিক্ষার সুযোগ নিতে পারবেন। ঠিক এই মডেলই পছন্দ ১০ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের সংস্থা টাটা ট্রাস্টের। রতন টাটা তাই বলেছেন, "একজন ভারতীয় এবং এই গ্রহের একজন বাসিন্দা হিসাবে আমার কাছে এই পার্টনারশিপ একটা দারুণ সুযোগ। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এর ফলে উপকৃত হবে বলেই মনে করি।"

যারা এই সলমন খানের সঙ্গে পরিচিত নন, তাদের জানিয়ে রাখি কর্মসূত্রে ইনি হেজ-ফান্ড অ্যানালিস্ট। MIT ও Harvard থেকে ডিগ্রিও রয়েছে তাঁর। তাঁর খান অ্যাকাডেমি গড়ে তোলার গল্পটা বেশ মজার। খুড়তুতো এক বোনের পড়াশোনার জন্য তিনি একটি ভিডিও তৈরি করেছিলেন। সেই বোনের থেকে তা জানতে পেরে তার বন্ধুরা আরও এই ধরনের ভিডিওর আবদার করতে থাকে। ফলে আরও ভিডিও তৈরি করে ফেলেন খান। এই সব ভিডিও তিনি ইন্টারনেটে আপলোড করে দেন। মুখে মুখে তাঁর নাম ছড়াতে থাকে। শুধু আমেরিকা নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তাঁর কাছে প্রশংসাসূচক চিঠি আসতে থাকে। কেউ লেখে যে বীজগণিত শেখাটা সহজ হয়ে গিয়েছে। কেউ লেখে ফের কলেজে ভর্তি হওয়ার কথা। আবার অভিভাবকরা আর্জি জানান, এভাবেই তাঁদের সন্তানদের সহযোগিতা করতে। খান বললেন," খুব শিগগিরই বুঝতে পারলাম বিশ্বজুড়ে এই ধরনের কনটেন্টের কী ভীষণ চাহিদা। সম্ভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে মানুষ কতটা আগ্রাসী সেটাও বুঝতে পারলাম।"

এখনও পর্যন্ত এ ধরনের প্রায় ২৭০০টি ভিডিও তৈরি করেছে খান অ্যাকাডেমি। সবক'টিই ১০ মিনিটের এবং বিনামূল্যে নেটে দেখা যায়। বিষয়ের মধ্যে রয়েছে গণিত, বিজ্ঞান, কম্পিউটার সায়েন্স, হিউম্যানিটিজ এবং অনুশীলনের জন্য টেস্ট পেপার্স। প্রাথমকিভাবে সব ভিডিও-পাঠ্যই ছিল ইংরেজিতে। কিন্তু ভারতের মতো বিশাল দেশে, যেখানে জনসংখ্যা ১০০ কোটির বেশি, সেখানে প্রভাব ফেলতে অন্য ভাষার কথাও ভাবতে শুরু করেন সলমন খান। বিশেষত ভারত তাঁর নিজের দেশ। তাঁর আত্মীয়তার শিকড় ছড়িয়ে রয়েছে এই দেশেই। শুধু কথা নয়, কাজেও করে দেখিয়েছেন। কয়েক সপ্তাহ আগেই চালু হয়ে হিন্দি ভাষায় পোর্টাল। যদিও খান বলছেন, "এটা কিন্তু কিছুই নয়। আগামী ৪-৫ বছরের মধ্যে, পরবর্তী দশকের মধ্যেই আমরা ভারতীয় সংস্থা হতে চাই।"

প্রথম দফায় পার্টনারশিপের লক্ষ্য হল, শহরাঞ্চলের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য শিক্ষা সরঞ্জামের ব্যবস্থা। দ্বিতীয় দফায় বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় কনটেন্টের ব্যবস্থা করা হবে। শুরুর দিকে সাব-টাইটেল থাকবে, পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় অনলাইন কনটেন্ট মিলবে। ছাত্রছাত্রীরা যাতে সহজেই কম্পিউটার বা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কনটেন্ট পেতে পারে, সেটাই চায় খান অ্যাকাডেমি। এ ব্যাপারে রতন টাটাকে পাশে পাওয়াটা সৌভাগ্য বলেই মনে করেন সলমন খান। এই দু'জনের দেখা হল কী ভাবে? দুই তরফেই যোগাযোগ আছে এমন বন্ধুদের মাধ্যমে সাক্ষাৎ হয় রতন টাটা এবং সলমন খানের। কোটি-কোটি মানুষকে কী ভাবে ফ্রি এডুকেশন দেওয়া যায় তা নিয়ে আলোচনায় ডুবে যান তাঁরা। সেই আলোচনাই কাঠামো নিতে থাকে এবং যার পরিণতি এই পার্টনারশিপ।

ইয়োর স্টোরির সংযোজন

'খান অ্যাকাডেমি' যে ভাবে বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলে দিয়েছে তাতে বলাই যায় নট-ফর-প্রফিটের এই মডেল কতটা কার্যকরী। বিশেষত আপনি যদি গভীরে সাড়া ফেলতে চান। শুধুমাত্র সংখ্যায় নয়, দেখতে হবে বিশ্বজুড়ে কতটা প্রভাব ফেলতে পারল। একবার যদি সেই সাড়া ফেলা যায়, ডোনাররা বারবার আপনাকে সহযোগিতা করবেন। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল মডেল অনিবার্যভাবেই লাভালাভের হিসাব কষে (তার মধ্যে ভুল কিছু নেই), বিশেষ কোনও মিশনকে ঘিরে নানারকম চাহিদাও থাকে। ফলে লক্ষ্যটাই একসময় চাপা পড়ে যায়।

(Disclaimer: রতন টাটা ইয়োর স্টোরির একজন বিনিয়োগকারী)

লেখা - শ্রদ্ধা শর্মা