কল্পনা আর বাস্তবের সফল ব্লেন্ডার অরিজিৎ

0

মফস্বলের সরকারি স্কুলে পড়া সাধারণ বাড়ির দস্যি একটি ছেলে। মন ছিল ছবি আঁকায়।  এভাবেই কখন যেন রীতিমতো কমিক স্ট্রিপ আঁকতে শুরু করে দিল ছেলেটি। সমস্ত বিষয়েই তার অদম্য কৌতূহল। একদিকে সে যেমন কল্পনাপ্রবণ, আর একদিকে বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি বিষয়গুলিতেও সমান নজর তার। শিল্পীমন যখন অবচেতনেও নানা স্কেচ আর রঙের খেলা নিয়ে ভাবতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই আর একদিকে নিজের চেষ্টায় কম্পিউটারের একের পর এক প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ শিখতে সাহায্য করছে তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি। সবসময় নতুন কিছু করতে চাওয়া ছেলেটির কল্পনা আর বাস্তবের মিশেল ঘটাতে খুব একটা সময় লাগেনি। নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে আজ তিনি একজন সফল উদ্যোগপতি। অ্যানিমেশন এবং কম্পিউটার গেমিংয়ের আজব দুনিয়ায় তাঁর সাফল্য গর্বিত করে রাজ্যবাসীকে। আজ ইওর স্টোরিতে সোদপুরের অরিজিৎ ভট্টাচার্যের কাহিনী।

ভার্চুয়াল ইনফোকমের প্রতিষ্ঠাতা অরিজিৎ ভট্টাচার্য। গেম ডেভেলপমেন্ট, অ্যানিমেশন, কমিক্স, ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির মতো বিষয় নিয়ে কাজ করে তাঁর সংস্থা। ছোট্ট শহরে বেড়ে ওঠা অরিজিতের ব্যবসার পরিধি বাড়তে বাড়তে আজ বিশ্বের ১৩৪টি দেশে বিস্তৃত। প্রায় ৬৭,০০০ সংস্থার জন্য কাজ করে ভার্চুয়াল ইনফোকম। ইন্টেল, নোকিয়া, অ্যান্ড্রয়েড, স্যামসাং, বিভিন্ন সোশ্যাল নেটওয়ার্ক এবং ওয়বসাইট, ব্ল্যাকবেরি, ওপেরা, অ্যামাজন, এলজি সহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের জন্য গেম তৈরী এবং প্রকাশ করেন তাঁরা। সেইসঙ্গে অ্যানিমেশন এবং গেম ডেভেলপমেন্টে বিশেষ প্রশিক্ষণও প্রদান করে থাকে তাঁর ইনস্টিটিউট ভিআইসি। শূন্য থেকে শুরু করে প্রযুক্তির দুনিয়ায় অরিজিতের এই স্বপ্নের উড়ানের যাত্রাপথ যেন লেখা হয়ে গিয়েছিল সেই স্কুলে পড়ার সময় থেকেই।

ছবি আঁকার শুরু

ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার শখ ছিল অরিজিতের। কোনও কিছুতেই দমে যাননি অরিজিৎ। একটা দুটো করে ছবি আঁকতে আঁকতে একসময় নিজের আস্ত একটা কমিক স্ট্রিপও এঁকে ফেলেছিলেন ওই ছোটবেলাতেই।

স্কুলের সেই সময় থেকেই অরিজিৎ জানতেন, বড় হয়ে অ্যানিমেশন আর কমিক্স নিয়েই কিছু করতে চান তিনি। স্কুলের শেষের দিকে যখন তাঁর প্রায় সব বন্ধুরাই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন, তখন অরিজিৎ ভাবতেন, "যদি এমন কিছু করা যায় যাতে রোজগারও হবে আবার অন্য অনেক মানুষের চাকরির সংস্থানও করা যাবে, তাহলে কেমন হয়? "

স্বপ্ন এবং বাস্তব

স্বপ্ন দেখা সহজ হলেও তাকে বাস্তবায়িত করা যে কতটা কঠিন তা সকলেই জানেন। কিন্তু অরিজিতের ক্ষেত্রে একেবারে অন্যরকম একটা বিষয় ঘটেছিল। একদিকে যেমন তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল আমাদের প্রাচীন পূরাণ এবং বিভিন্ন ধর্মগ্রন্হ, আর একদিকে সমানতালে বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনো চালিয়ে যাচ্ছিল সে। আমাদের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির পিছনেও যে আসলে লুকিয়ে রয়েছে সেই বিজ্ঞান, কল্পনার সঙ্গে বিজ্ঞানের মিশেল ঘটানো যে সম্ভব -সকলের সামনে তা তুলে ধরাই ছিল অরিজিতের লক্ষ্য। 

লেখা পড়ায় চিরকালই ভালো। উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগে ভালো ফল করার পর পরিবারের সকলেই ভেবেছিলেন, এবার কমিক্সের দুনিয়া থেকে বেরিয়ে আসবেন তিনি।  অরিজিতের ক্ষেত্রে হলো উল্টো। বাড়িতে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, "কোনও সংস্থায় কাজ করতে নয়, শিল্প এবং প্রযুক্তির মেলবন্ধনের মধ্যে দিয়ে নিজের একটি সংস্থা গড়ে তুলতে চাই আমি।" বাবা আপত্তি করেননি। কিন্তু শর্ত ছিল একটাই, লেখাপড়া থামালে চলবে না। ক্লাসে স্ট্যান্ড করতেন। ফলে পড়াশুনোকে গুরুত্ব দিতে জানতেন। বাবার কথা মতো লেখাপড়াকে কখনও অবহেলা করেননি।  অর্থনীতি নিয়ে পড়াশুনো করেছেন। এমসিএ করেছেন। ম্যানেজমেন্ট পড়েছেন। এমসিএসই, সিসিএনএ, এমসিএসডি এবং বিসিএসএ ডিগ্রি আছে রীতিমত। 

প্রস্তুতিপর্ব

ছেলের একটা কোম্পানি হোক তা বাবাও চেয়েছিলেন। তার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দিতে না পারলেও, কষ্ট করেই তাকে কম্পিউটার কিনে দিয়েছিলেন। আর অরিজিতও বাবার কাছ থেকে পাওয়া উপহারের মূল্য দিতে পেরেছিলেন। একদিকে যেমন নিজের পড়াশুনো চলছিল, পাশাপাশি কম্পিউটার নিয়ে পড়াশুনোও শুরু করে দেন তিনি। কোনও ইনস্টিটিউট থেকে প্রথাগত শিক্ষা নয়, কম্পিউটার এবং ইন্টারনেটকে কাজে লাগিয়েই শিখতে শুরু করেন কম্পিউটারের বিভিন্ন প্রোগ্রামিং। স্কুলের শেষের দিকেই নিজের ব্যবসা শুরু করেন অরিজিৎ। ১৯৯৮ সালে তিনি যখন প্রথম কম্পিউটার নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন, তখন পকেটে ছিল মাত্র ৫০ টাকা। নিজের অ্যানিমেশন হাউস খুলতে হলে পুঁজি প্রয়োজন। তা জোগাড় করতেই কম্পিউটার অ্যাসেম্বল করা শুরু করেন তিনি। 

পাশাপাশি উদ্যোগপতি হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার প্রস্তুতিও ছিল। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কলেজে অর্থনীতি, স্ট্যাটিসটিক্সের ক্লাস আর ব্যবসা সংক্রান্ত নানাবিধ পাঠ - বিকেল চারটে থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত কম্পিউটার অ্যাসেম্বলিং এবং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্রদের প্রোগ্রামিংয়ের কোচিং করানো -এটাই ছিল অরিজিৎ ভট্টাচার্যর রোজনামচা। "ব্যবসার কাজে অনেকসময় দিনেরবেলা অ্যাপয়েন্টমেন্ট রাখতে হতো। তাই সবসময় সব ক্লাসও করা হয়ে উঠত না। নিজের ব্যবসার জন্য পড়াশুনোয় গাফিলতির কথা মানতে কলেজের প্রিন্সিপাল যদি রাজি না হন, তাই তাঁকে জানিয়েছিলাম যে আমি একটি ছোট সংস্থায় চাকরি করি," বললেন অরিজিৎ।

সাফল্যের পথ সহজ নয়...

পড়াশুনো আর ব্যবসা একসঙ্গে সামলানোর ঝক্কি প্রচুর। তবে অরিজিৎ এক মুহূর্তের জন্যেও নিজের ফোকাস থেকে সরে যাননি। যখন যেখান থেকে ডাক আসত কষ্ট করে হলেও দেখা করতে যেতেন। "সেই সময় মিটিংয়ে যাওয়ার জন্য লোকাল ট্রেন ছাড়া অন্য কিছুতে যাতায়াতের সামর্থ্য ছিল না। আমি রোজ বাড়ি থেকে একটা সাধারণ জামা পরে বেরোতাম। মিটিংয়ের জন্য একটা ভালো শার্ট আর একজোড়া জুতো ব্যাগে রাখতাম। ট্রেন থেকে নেমে কাছাকাছি কোনও একটা জায়গায় পোশাক পরিবর্তন করে নিতাম। তারপর মিটিংয়ে যেতাম।" প্রথম তিনবছর শুধু যন্ত্রপাতি অ্যাসেম্বল করেই কেটেছিলো। "সেই সময় বাজার সেরকম না থাকায় আমরা অ্যানিমেশন বা গেমিংয়ের কোনও অর্ডার পাচ্ছিলাম না। কিন্তু টাকার প্রয়োজন ছিল। সংস্থা টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি কর্মচারীদের নিয়ম মতো বেতন দিতে পারাও প্রয়োজন। তাই আমি পরবর্তী ভাবনাচিন্তা শুরু করি। অ্যানিমেশন এবং প্রোগ্রামিং শেখানোর একটা ইনস্টিটিউট খুলে ফেলি। দশম, দ্বাদশ শ্রেণি এবং বি টেক এর প্রচুর ছেলেমেয়ে প্রশিক্ষণের জন্য আসতে শুরু করে।" এরপরই নতুন এক আইডিয়া মাথায় আসে অরিজিতের। তাঁর কাছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে টিম তৈরী করার কাজ শুরু করে দেন তিনি। সকলে মিলে নতুন প্রোডাক্ট এবং গেম প্রস্তুত করতে থাকেন। ২০০২ সালে প্রথমবার অ্যানিমেশনের অর্ডার পান তাঁরা। ইয়াহু চ্যাট ইঞ্জিন এবং ডায়াল আপ কানেকশনের জন্য ক্যালটাইগার ব্যবহার করে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করতে শুরু করেন।


প্রথম কাজ থেকেই নিজেদের স্বকীয়তার পরিচয় দিয়েছেন অরিজিৎ এবং তাঁর ভার্চুয়াল ইনফোকমের টিম। ফলে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ব্যবসার পরিধি বাড়তে বাড়তে আজ ভারতের বাইরেও বিভিন্ন দেশে পৌঁছেছে। বর্তমানে ৩২৭ জনের একটি টিম সরাসরি ভার্চুয়াল ইনফোকমের অধীনে কাজ করে। শুধুমাত্র কলকাতা শহরেই তাঁদের তিনটি অফিস রয়েছে। পাশাপাশি নিজের বাড়িতেও অফিস করেছেন অরিজিৎ ভট্টাচার্য।

"অ্যানিমেশন ট্রেনিং এবং গেম ডেভেলপমেন্ট ও ডিজাইন ট্রেনিংয়ে আমরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি। ১৯৯৯ সালে ভারতে এধরণের ট্রেনিং ভাবাই যেত না। কিন্তু সেই সময় থেকেই আমরা আমাদের ছাত্রছাত্রীদের সেই মানের প্রশিক্ষণ দিতে পেরেছি।" জানালেন অরিজিৎ। আজ বহু নামী সংস্থায় কাজ করছেন তাঁর এবং তাঁর ইনস্টিটিউটের ছাত্রছাত্রীরা।

২০০২ সাল থেকেই নিজেরা গেম ডেভেলপ করে বাজারে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে ভার্চুয়াল ইনফোকম। কলকাতা শহরেই তাঁরা তাঁদের প্রথম গেম রিলিজ করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন বড় সংস্থার জন্য জাভা বেসড গেম, ক্যাসুয়াল গেম প্রস্তুত করে টেলিফোন অপারেটরদের মাধ্যমে তা বিক্রি করতেও শুরু করেন। ধীরে ধীরে সেখান থেকে উপার্জন হতে থাকায় কর্পোরেট অ্যানিমেটেড ভিডিও তৈরীর কাজেও হাত লাগান তাঁরা। টাকা আসতে থাকায় মার্কেটিং করতেও অসুবিধা হয়নি। আজ ইন্টেল, এল জি, আলিবাবার মতো সংস্থার সঙ্গে সফ্টওয়্যার ডেভেলপমেন্ট পার্টনার হিসেবে কাজ করে অরিজিতবাবুর সংস্থা। ভারতের বাইরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউ এ ই এবং ইওরোপের বিভিন্ন প্রান্তেও ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর ব্যবসা। সাফল্যের পথ চড়তে গিয়ে অরিজিতের মুকুটেও যোগ হয়েছে নানা পালক। ভারতের প্রথম গেমিং ক্লাব তৈরী করেছেন তিনি, মোবাইল অ্যাপ, অ্যানিমেশন এবং গেম ডেভেলপমেন্টের জন্য প্রথম ক্লাউড বেসড ক্লাসরুমও তাঁর হাতেই তৈরী। আর্চার, মহাবীর, নিউট্রন, হাগলুর মতো কমিক্সের পাশাপাশি প্রথম হিন্দু মাইথোলজিকাল গেম 'মহাভারত'-ও প্রস্তুত করেছে অরিজিতের সংস্থা। ২০০৮ সালে “TATA UDUYOG PARBO”-র মেন্টর ছিলেন অরিজিৎ। যুক্তরাজ্যের গেম ডেভেলপমেন্ট কম্পিটিশন “Dare to be Digital” এর একজন বিচারক ছিলেন তিনি।

অরিজিতের কথায়..

"আমি কখনওই মনে করি না যে আমি বিশাল কিছু করেছি। তবে এটা ঠিক, ১৯৯৮ সাল থেকে এখন পূরাণ এবং কল্পবিজ্ঞানের সঙ্গে প্রযুক্তির মিশেল ঘটিয়ে ১৫০০-র বেশি গেম তৈরী করেছি। । যার মধ্যে অশ্বত্থামা, অর্জুন, সুর্পনখা, রাবন, ফাইট অফ দ্য লেজেন্ডস(১ ও ২), সুখু দুখুর মতো কিছু অত্যন্ত সফল গেম রয়েছে। কস্টিউম প্লে বিষয়ক একটি ওয়েবসাইট (নাম কসপ্লে) তৈরী করতে পেরেছি, ভারতের প্রথম গেমস্টোরগুলির মধ্যে একটাও আমাদেরই তৈরী। ধীরে ধীরে আম গেম পাবলিশিং এর দিকে এগিয়েছি। এখন বহু ডেভেলপার এবং বিভিন্ন স্টার্ট আপ যাঁরা সফলভাবে নিজেদের গেম এবং অ্যাপ চালু করতে চায় তাদের আমরা সাহায্য করে থাকি।"

এভাবেই তাঁর ভাবনাচিন্তা আর প্রযুক্তিকে এক ছাদের তলায় এনে আরও অনেক কাজ করতে চান অরিজিৎ। এরাজ্যে এমন একটা ইকো-সিস্টেম তৈরী করতে চান, যাতে মেধাবী ছেলেমেয়েরা চাকরি পেতে পারেন এবং তাঁদের বাইরে চলে যাওয়ার কথা না ভাবতে হয়। ইতিমধ্যেই অরিজিৎ এবং তাঁর অন্যান্য উদ্যোগপতি বন্ধুরা মিলে 'Bong Entrepreneurs' নামে একটি গ্রুপ তৈরী করেছেন। তাঁদের একটাই লক্ষ্য, পশ্চিমবঙ্গকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। এখানে ভালো কাজের পরিবেশ তৈরী করা। তাঁর মতে "যদি আপনি সত্যিই নতুন কিছু করতে চান, তাহলে টাকার জন্য নয়, সেই ইচ্ছেটার জন্যই তা করতে শুরু করুন। টাকা ঠিক আসবে।"