সংসারের অভাব ভুলে নাটকের মঞ্চ দাপাচ্ছেন মানবেন্দ্র

0


সংলাপ, ইমপ্রোভাইজেশন, অ্যাকশন, প্রপস। নিশিদিন এইকটা শব্দই ঘুরে ফিরে কানে বাজে। অভাবের সংসারে কোনওদিন হাঁড়ি চড়ে কোনওদিন চড়ে না। সংসারের অভাবের সঙ্গে লড়তে লড়তেই দিন কাবাড়। তবু নাটকের সঙ্গে আপোষ করেননি মানবেন্দ্র। কঠিন জীবন সংগ্রামে নাটকের মঞ্চ তাঁর কাছে মরুদ্যানের মতো। অভিনয় যেন ধ্রুবতারা, আর মঞ্চ তো মন্দির।

ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে চাঁদে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন বসিরহাটের মানবেন্দ্র পাল। বছর পঁচিশের নাটক পাগল যুবকের রোলমডেল মনোজ মিত্র। সংসারে বড় অভাব। তাই স্কুলে থাকতেই পড়াশোনার পাশাপাশি রাজমিস্ত্রীর যোগালির কাজও করেছেন। সবকিছুর ফাঁকে অভিনয়ের জন্য সময় তুলে রাখতেন। ছেলে অভিনেতা হতে চায় জানতে পেরে আকাশ ভেঙে পড়েছিল বাবা বিশ্বনাথ পাল আর মা সীমা পালের মাথায়। কিন্তু মানবেন্দ্র যে ছোট থেকেই বড্ড জেদী। পড়াশোনা, বাবার সঙ্গে রাজমিস্ত্রীর জোগালির কাজ, পুজোর সময় বাড়তি টাকা রোজগারের আশায় বেলুন ফেরি, সঙ্গে নাটকের তালিম। নাটকের প্রতি ভালোবাসা আর অসম্ভব মানসিক দৃঢ়তা মানবেন্দ্রর জীবনে পুরস্কার হয়ে ফিরে এসেছে। মুকাভিনয়ের জন্য সদ্য পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ছাত্র-যুব উৎসবে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন।

এত থাকতে নাটক কেন? হাসিমুখে মানবেন্দ্র বলেন, ‘ওটাইতো আমার জীবন। মঞ্চে দাঁড়িয়ে অতগুলো লোকের সামনে সংলাপ বলার মধ্যে আত্মবিশ্বাস খুঁজে পাই’। ইতিমধ্যে মনোজ মিত্রর সুন্দরম নাট্যগোষ্ঠীর প্রধান মুখ হয়ে দাঁড়িয়েছেন বসিরহাটের যুবক। সুন্দরমের হয়ে কলকাতার প্রথম শ্রেণির সব নাট্যমঞ্চেই চুটিয়ে অভিনয় করে ফেলেছেন এই ছেলে। এমনকী সুন্দরম নাট্যগোষ্ঠীর হয়ে কলকাতা পেরিয়ে দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা এমনকী বাংলাদেশ, ত্রিপুরাতেও থিয়েটার করে এসেছেন।

অভিনয়ের কেরিয়ারের রুপোলি রেখার ঝিলিক দেখা গেলেও সংসারের রসদ যোগাতে রাজমিস্ত্রীর কাজ করেন। মাঝে সাঝে আবার লটারিও বিক্রি করেন। বলে চলেন, ‘শেষ হতে বসেছিল স্বপ্ন। একদিকে সংসারে অনটন, অন্যদিকে নাটকের নেশা। দুইয়ের মাঝে পড়ে মন বড় চঞ্চল হয়ে উঠছিল। দেবদূত হয়ে অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখিয়েছিলেন কাশীনাথ পাল। বিশিষ্ট নাট্যকার বীরেশ চট্টোপাধ্যায়ের সহকারি মনোজ রায়ের হাত ধরে অভিনয়ের জগতে পাকাপাকিভাবে চলে আসা। পরবর্তীতে আরও এক ধাপ এগিয়ে শ্যামল চক্রবর্তী থেকে মনোজ মিত্রর সুন্দরম নাট্যগোষ্ঠীর প্রোডাকশন বেঙ্গালুরু হয়ে কাজের পরিধি বাড়িয়ে সাড়া ফেলেছে মানবেন্দ্র পাল। পরিচালক দুলাল লাহিড়ি থেকে শুরু করে বিভাস চক্রবর্তী, সবাই একবাক্যে মানবেন্দ্রর অভিনয় দক্ষতার গুনমুগ্ধ। দূরদর্শনে অভিনয় অভিনয় নামে শিক্ষণ বিষয়ক অনুষ্ঠানে মানবেন্দ্রর অভিনয় দেখে বিভাস চক্রবর্তী মনোজ মিত্রকে ফোন করে বলেছিলেন, ‘নায়ক তৈরি হচ্ছে তোমার দলে। দেখে মনে হচ্ছে বাচ্চ মনোজ হেঁঠে আসছে’।

ছেলের ভাবসাব দেখে ভয় পেয়েছিলেন বাবা-মা। অভিনয় করলে কী আর পেট চলবে? মান রেখেছেন মানবেন্দ্র। তাঁর অভিনয় মন কেড়েছে দর্শকদের, বিশ্বাস যুগিয়েছে নাট্যকারদের মনে। আর স্বপ্নকে একটু একটু করে বাস্তরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছেন মানবেন্দ্র।