সরকারি মাছ বেচবে এলাকার বাইক বাহিনী

2

কথায় বলে মাছে ভাতে বাঙালি। কিন্তু প্রশ্ন হল আপনি কি রোজ মাছ খান? ইচ্ছে থাকলেও অনেক বাঙালিরই তা জোটে না। কারণ বাজার যাওয়াটা একটা হার্ডেল। যারা বাজার যান নিয়মিত তাদের সকালের রুটিনে বাজার একটা লম্বা সিরিয়াল। ভর্তি মেলো ড্রামা। ভর্তি কলহ। উত্থান পতন আর তৃপ্তি বিরক্তির একটি চক্রাকার ঘূর্ণন। রাতে বাড়ি ফেরার পথে ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে বাজারে ঢুঁ মারার অভিজ্ঞতাও সমান নাটুকে। কেউ কেউ সপ্তাহে একবার বাজার করেন। শনি রবি কিংবা ছুটির দিন। ব্যাপারটায় ঝক্কি আছে, ঠিকই কিন্তু সারা সপ্তাহে কাজের চাপ, অফিসের টেনশন, সকালে কোনও মতে দুটো মুখে তুলে ছোটাটাই যখন রুটিন। তখন আর কী করবে বাঙালি। এই হার্ডেল দূর করতে অবশ্য বাড়ির দরজায় আজকাল বাজারের গাড়ি আসে। সকাল থেকেই হাঁকডাক দেয় রুই কাতলা, ভোলা ভেটকি, কাজলি, বাটার ঝাঁক। সাইকেলে সাইকেলে। কেউ কেউ পাড়ায় ঢোকার আগে বৌদিদের ফোন করেন। কী মাছ আছে কত দাম সব ফোনে ফোনেই হয়ে যায়। যুগ যুগ জিও অফারের সুবিধে সবাই যখন নিচ্ছেন, তবে মাছ বিক্রেতারাই বা বাদ যান কেন। এই গোটা গল্পে আরও একটি চরিত্রের অবতারণার প্রয়োজন ছিল। সেটা অনস্বীকার্য ভাবেই রাজ্য মৎস্য উন্নয়ন নিগম।

নিগম এক অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে। যার ফলে নিগমের জলাশয়ের টাটকা মাছ বাড়ি বাড়ি পৌঁছে যেতে পারে শহরের ঘুম ভাঙার আগেই।কীভাবে? শুনুন তাহলে। নিগম ঠিক করেছে, নিজস্ব মোটরবাইক আছে এমন কেউ যোগাযোগ করলে নিগমের জলাশয়ের টাটকা মাছ অল্প দামে কিনে নিতে পারেন। একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ লাভ রেখে বাড়ি বাড়ি গিয়ে অনেকটা অনলাইন সংস্থাগুলির মতো মাছ ডেলিভারি দিয়ে আসতে পারেন। তবে মাছের দাম সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করবে নিগমই। ফলে মাছ বাজারদর থেকে যেমন সস্তা পড়বে তেমনি ক্রেতার ঠকার কোনও আশঙ্কাও থাকবে না। আপাতত দমদম, সল্টলেক, নিউ টাউন ও রাজারহাটের মধ্যেই এই পরিষেবা সীমিত থাকছে।

নিগমের শর্ত অনুযায়ী, মাছ বিক্রেতার নিজস্ব মোটরবাইক থাকতে হবে। বাইকের পিছনে একটি ‘রেফ্রিজারেটর বক্স’ থাকবে। ‘নিগমের জলাশয় থেকে সস্তায় মাছ কিনে তা বিক্রি করে ১৫ শতাংশ লাভ করতে পারবেন বিক্রেতা। মোটরবাইকে যারা মাছ বিক্রি করবেন, তাঁদের মাছের দাম বেঁধে দেবে নিগম। রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবোস ছাড়াও থাকবে বাটা, পাঙাস, তেলাপিয়া, ট্যাংরা, পাবদা, কই, চিংড়ি। সকাল-বিকেল দুই শিফটে মোটরবাইকে করে মাছ বিক্রি করা যাবে’, বলেন নিগমের চেয়ারম্যান সৌম্যজিৎ দাস ।প্রাথমিক ভাবে সল্টলেক, নিউ টাউন ও দমদমে ৪০টি মোটরবাইকে কাজ চলবে। আর ব্যস্ত অফিস বাবু-বিবির বাড়তি পাওনা, ঘুম ভাঙতেই সস্তার টাটকা নানা রকম মাছ হাজির হবে দোরগোড়ায়।

সকালের দিকে নিগমের জলাশয় থেকে জ্যান্ত মাছ ডেলিভারির পর বিকেলে কুকড ফুড। অর্থাৎ, যারা সকালে মাছ দিয়ে গেলেন বিকেলে তাঁরাই বেরলেন ফিস ফ্রাই, ফিস ফিঙ্গার, ফিস রোল, ফিস কাবাব, ফিস বিরিয়ানি ছাড়াও রকমারি মাছের ভাজা পদ নিয়ে। টাটকা মাছের মতোই বিকেলের চায়ের সঙ্গে মুখরোচক স্ন্যাকস হাজির বাড়ির দোরগোড়ায়। নিয়ম বলছে, মোটরবাইকে করে মাছ বা মাছের পদ বিক্রির জন্য নিগমের কাছে বিক্রেতাকে ‘সিকিউরিটি মানি’ বাবদ তিরিশ হাজার টাকা রাখতে হবে।

‘চল্লিশ জন বিক্রেতা চল্লিশটি এলাকায় মাছ বিক্রির দায়িত্বে থাকবেন। তাঁদের ফ্র্যাঞ্চাইজি দেওয়ার প্রাথমিক শর্তটাই হল, এলাকার প্রতিটি বাড়ির ফোন নম্বর নিজেদের কাছে রাখতে হবে। ওই বিক্রেতার ফোন নম্বরও প্রতিটি বাড়িতে থাকবে’, নিয়ম বলছিলেন নিগম কর্তা সৌম্যজিৎ দাস। নিউ টাউন, সল্টলেক, রাজারহাট এলাকায় অনেকেই অনলাইনে বা শপিং মলে মাছ কেনেন। বরফে রাখা ওই মাছ অনেক দিন ধরে প্যাকেটে থাকায় তার স্বাদও ভাল থাকে না। নিগম এ ক্ষেত্রে টাটকা মাছ বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিতে চায়।

এই উদ্যোগ সফল হলে শুধু হাতেগোনা কয়েকটি এলাকা নয় সারা শহরের মাছ প্রিয় বাঙালির ঘরে ঘরে সস্তায় টাটকা মাছ পৌঁছবে। আবার কিছু বেকার যুবকের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ হবে। অর্থাৎ এক ঢিলে দুই পাখি। প্রথম দফা সফল হলে প্রকল্প আরও বড় আকারে আনার কথা ভাববে নিগম।