মিসিসিপির যাদুতে স্ন্যাকসও স্বাস্থ্যসম্মত

0


স্ন্যাকস, ফাস্টফুড মানেই ভুরি ভুরি ক্যালরির সুস্বাদু সব খাবার। সেই স্ন্যাকস খেয়ে ছোটবেলা থেকে স্বাস্থ্যের বারোটা বেজে যায় কত শিশুর। বড়রাও বা কম কী যায়। সব জেনেও কখনও বাধ্য হয়ে, কখনও রসনার তাড়না সামলাতে না পেরে হাই ক্যালরির ফাস্টফুড খেয়ে চলেছেন। কিন্তু এই স্ন্যাকস বা ফাস্টফুডকেই যদি স্বাস্থ্যসম্মতভাবে বাজারে ছাড়া যায় তাহলে কেমন হয় বলুন তো? সম্ভাবনার বাজার দেখে ভারতে বড় বড় কর্পোরেটগুলি মোটা অঙ্কের পুঁজি নিয়ে এই সেক্টরে জাঁকিয়ে বসেছে। রীতিমতো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে দেশি থেকে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ক্যালগস, পেপসিকোর ক্যোয়েকার। তাছাড়া ব্যাগ্রিস এবং সাফোলা ওটসও জায়গা দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে।যারা স্ন্যাকস ছাড়া একটা দিনও ভাবতে পারেন না অথচ হাই ক্যালরির ভয়ে মন খুলে খেতেও পারছেন না তাদের জন্য এর চাইতে সুখের খবর আর কীই বা হতে পারে?

কর্পোরেটদের জন্যই এই প্রতিযোগিতা বেশ নতুন, সেই জায়গায় স্টার্টআপের জন্য তো ভীষণ ভালো আইডিয়া। স্টাইল কিচেন এন্টারপ্রাইজের প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও জয়দীপ সিপ্পি এই সেক্টেরের ভবিষ্যৎ নিয়ে বলেন, ‘৫৫ হাজারের বেশি মশলাদার খাবার এবং ১৫ হাজারের বেশি বিস্কুট, কুকিজকে স্বাস্থ্য সম্মত করে তুলতে হাজার রকম গবেষণা চলছে’। ভালো পুষ্টিমানের, স্বাস্থ্যকর কুকিজ, স্ন্যাকস এবং আরও নানা খাবারের ব্র্যান্ড মিসিসিপি সদ্য লঞ্চ করেছেন জয়দীপ। ২০০৯ সাল থেকে চেষ্টা চরিত্র চলছিল। শেষ পর্যন্ত এই বছরের গোড়ায় মিসিসিপির প্রডাক্ট লঞ্চ হয়। জয়দীপ বলেন, লঞ্চ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মিসিসিপিকে ভালোভাবেই নিয়েছেন গ্রাহকরা। খুব দ্রুত স্টক ফুরিয়ে যাচ্ছে।

মিসিসিপি নামকরণের মধ্যেও একটা মজা আছে। আসলে জয়দীপের পরিবারের মিসেস সিপ্পিদের নামে সংস্থার নামকরণ। মহিলারা যে উষ্ণতা এবং নির্মলতার প্রতীক, ব্র্যান্ডের নামকরণ তারই ছায়ায়। ‘খাবার আমি দারুণ ভালোবাসি। বড়ই হয়েছি ঠাম্মা-দিদার রান্নাঘরে। তারপর হোটেল স্কুলে যাই। গত আট বছর দেশে লাইফস্টাইল, লাক্সারি ব্র্যান্ড নিয়ে কাজ করেছি। খারাপ খাবার খেয়ে খেয়ে শেষে অসুস্থ হয়ে পড়লাম। সুস্থ হতে প্রচুর ফাইবার যুক্ত ডায়েট নিতে হল। ভাবলাম আমার এই সমস্যা আরও অনেকের। এই ভাবনা থেকেই মিসিসিপির জন্ম’, বলে চলেন জয়দীপ। উদ্যোক্তা হওয়ার আগে জয়দীপের ব্যস্ত জীবনে ছুটেচলা ছাড়া গতি ছিল না। ফাস্টফুড, বিমানের খাবার, প্রসেসড ফুড এবং খাবারে ফাইবারের ঘাটতি শরীরের ব্যাপক ক্ষতি করছিল। এমনকী অস্ত্রোপচার পর্যন্ত করতে হয়। এই ঘটনাই বিপদঘণ্টি বাজিয়ে জাগিয়ে তুলেছিল জয়দীপকে।

নিজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে জয়দীপ দ্য স্টাইল কিচেন (TSK)গড়ায় মন দেন। একটা প্রডাক্ট বাজারে চালু হতে বেশ সময় নেয়। প্রডাক্ট তৈরি হয়ে গেলে টিএসকে টিম পুনের কর্পোরেট ক্যাম্পাসে কিয়স্কে কিয়স্কে স্যাম্পল দিতে থাকে। বিভিন্ন সংস্থা এবং তাদের কর্মীদের কাছ থেকে ভালো সাড়াও মেলে। ‘আমার মনে হয়, যেকোনও জায়গার মতো ভারতের যুবসমাজও ভাবে তারা চিরজীবী। ফুড রিটেল চেইনে নিজেদের জায়গা পাকা করতে আমরা ডিস্ট্রিবিউশন মডেলটিকে একটু পালটে দিই’, জানান জয়দীপ। বর্তমানে দিল্লি, মুম্বই, পুনে, গুড়গাঁওয়ের ১০০টি দোকানে মিসিসিপি পাওয়া যায়। জয়দীপ জানান, বাজারের প্রতিক্রিয়াও বেশ ভালো।

মিসিসিপ হল প্রাকৃতিক হাই ফাইবারের তৈরি স্ন্যাকস। আমাদের শরীরে প্রতিদিন ফাইবারের যা প্রয়োজন, তার এক পঞ্চমাংশ পুরণ করে দেয় এই স্ন্যাকস। অমরনাথ নামের পুষ্টিকর শস্য থেকে কেক তৈরি হয়। কুকিজ এবং অন্যান্য স্ন্যাকসগুলি ওটস, বাদামি চাল থেকে তৈরি হয়। সব খাবারই নানা ফ্লেভারে পাওয়া যায়। ‘এখনও অনেক রাস্তা বাকি। আমাদের প্রডাক্টে অপ্রাকৃতিক কিছু ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। খাবার নিয়ে নানা গবেষণা চলছে ক্রমাগত। স্বাদের সঙ্গেও আপোষ করা চলবে না’, জানান জয়দীপ।

স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং সুস্থতার দিকে নজর রেখে খাবার তৈরি করায়, মিসিসিপির মূল লক্ষ্য শহুরে বাজার। যদিও জয়দীপ বলেন, ‘কোনও নির্দিষ্ট জায়গায় আটকে থাকতে চান না তাঁরা। আমরা সত্যিই বিশ্বাস করি, একটা বড় অংশের মানুষের জন্য আমাদের প্রডাক্ট উপকারী। এবার সাপ্লাই চেন এবং ডিস্ট্রিবিউশন (সরবরাহ) জোর দিয়েছি। আমার বিশ্বাস, ঠিক দিকেই এগোচ্ছি’, বলেন তিনি। সামনের দিনগুলিতে বেঙ্গালুরুর বাজার ধরার দিকে নজর দেওয়া হবে।

দেড় কোটি টাকার নিজস্ব পুঁজি দিয়ে শুরু করে টিএসকে ব্লুম ভেঞ্চারের নেতৃত্বে আরও আড়াই কোটি টাকা বাজার থেকে তোলে। মিসিসিপির মূল গ্রাহক হল ৩০ থেকে ৫০ বছরের মহিলারা এবং তাঁদের মাধ্যমে ওই বয়সেরই পুরুষ, তাছাড়া শিশুরাও টার্গেট অডিয়ান্স। ১০ জন লোক দিয়ে টিএসকে চলে। প্রডাক্ট ডেভেলপমেন্ট, সোর্সিং, মার্কেটিং, সেলস এবং ডেলিভারি স্কিল ডেভেলপমেন্ট- এই বিভাগগুলিতে ওই ১০ জনই কাজ করেন। প্রাথমিক সাড়া বেশ ভালো হলেও জয়দীপ জানেন থামার আগে আরও অনেকটা পথ যেতে হবে। মিসিসিপির সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হবে ডিস্টিরিবিউশন বা সরবরাহ। এবং তার মাধ্যমে দ্রুত যতটা পারা যায় ততদূর ছড়িয়ে পড়া। নতুন শহরগুলির পাশাপাশি আরও অনেক জায়গায় মিসিসিপিকে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। ‘আমাদের বিশ্বাস তিনটি প্রধান শহরে হাজারের ওপর দোকান রয়েছে যেখানে গ্রাহকদের চাহিদার ভিত্তিতে আমাদের পণ্য সহজেই বিক্রি হয়ে যাবে’, বলেন জয়দীপ। বাজারে মিসিসিপি, টিএসকের পরিচিতি বাড়াতে স্যোশাল মিডিয়া, ডিজিটাল মার্কেটিংকে ব্যবহার করা হচ্ছে। ‘আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, প্রথম এক হাজার থেকে দশ হাজার গ্রাহকের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তুললেই বুঝতে পারব, আমাদের প্রডাক্ট মানুষের পছন্দ হয়েছে কি না’, ধারণা জয়দীপের।