রচনার আঁকিবুকি

0

"ইতনি সিদ্দত সে ম্যায়নে তুঝে পানেকি কৌশিস কি হ্যায়, কে হর জার্রে না আকমুঝে তুমসে মিলানে কি কৌসিস কি হ্যায়," শাহরুখ খানের একটি সিনেমার এই সংলাপ খুব বিখ্যাত। আমরা যদি খুব আন্তরিক ভাবে কোন কিছু চাই, তাহলে গোটা দুনিয়া আমাদের তা দেওয়ার জন্য চেষ্টা করে। এটা বোঝাতে অনেকেই এই সংলাপ ব্যবহার করেন।

বাস্তবেই এই থিয়োরী রচনা প্রভুর জীবনে প্রচুর কাজে এসেছে।"ডুডল ডু" এর প্রতিষ্ঠাতা ও একজন উদ্যোগপতি রচনা প্রভু, যেদিন প্রথম পেনসিল ধরতে শেখেন সেদিন থেকেই এঁকে চলেছেন।"আমার ড্রইং এর কোনও প্রথাগত শিক্ষা ছিল না। স্কুলে বন্ধদের থাতায় ড্রইং করে দিতাম( )আর নিজের খাতাতেও আঁকিবুকি কাটতাম।আমার বাবা মা ওই ছোট বয়সেও আমায় খুব উৎসাহ দিতেন।ড্রইং এর নানান পদ্বতি নিয়ে আমি বছরের পর বছর পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েছি।শেষপর্যন্ত কুড়ি বছর বয়সে এমন একটা পদ্বতি আমি পেলাম যেটা আমার ইউনিক লাগল।আজও সেই পদ্বতিতেই আমি এঁকে চলেছি।"ড্রইং এর দুনিয়ায় তার যাত্রাপথকে এই ভাবেই বর্ণনা করলেন রচনা।

তার একটি অনলাইন স্টোর আছে।তবে কাস্টমারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে তিনি বেশী পছন্দ করেন।রচনার মতে এই যোগাযোগ বিক্রি বাড়ানোর কাজে সাহায্য করে। মহিলারাই মূলত তার টার্গেটেড ক্রেতা।কমবয়সী মহিলাদের জন্য নজরকাড়া ডিজাইনই তার ইউ এস পি।রচনা জানালেন"রাজকন্যারা কোনদিন রান্না করেনা"এই ফ্রীজ ম্যাগনেটটা আমার অন্যতম জনপ্রিয় প্রোডাক্ট,তবে এর পাশাপাশি আমার পকেট আয়নায় গ্রাহকদের কাছে খুব জনপ্রিয়।"

কূর্গের বাসিন্দা এই শিল্পী মাইশোরের তার বাড়ির স্টুডিওতেই তার যাবতীয় কাজ করেন।চাকরিসূত্রে তার বাবা-মাকে কেরালার বরাবরি বাইরে থাকতেন,সেকারণে উটির একটি বোর্ডিং স্কুলে তার ছোটবেলা কেটেছে।বিয়ের পর দুবছর ধরে তিনি মাইসোরে থাকছেন।

বিজনেস ম্যানেজমেন্টের স্নাতক রচনা,বেঙ্গালুরুর কমিটস থেকে মাস কমিউনিকেসনে স্নাতকোত্তরের পড়াশোনা করেছেন। "সাংবাদিকতার কোর্স করার সময় একদিন আমার প্রফেসর আমায় বললেন আমাদের কলেজের মাসিক ম্যাগাজিনের জন্য আমায় ছবি এঁকে দিতে। ওই কাজটা আমায় বদলে দিল।আমি বুঝলাম আমার ছবি দিয়ে অনেক কিছু করতে পারব।"

বেঙ্গালুরুর পি আর ফার্মে কাজ করার সময় তিনি স্হানীয় প্রকাশকদের তার আঁকা ছবি মেল করতে শুরু করলেন।আশা ছিল যদি বাচ্চাদের ব‌ইয়ের ছবি আঁকার কাজ পাওয়া যায়।"ভাগ্য খুলল, যখন একজন প্রকাশক আমার কোন আর্ট পোটফোলিও না থাকা সত্বেও আমায় কাজের সুযোগ দিলেন।এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি।" প্রযুক্তির দুনিয়ার আমূল পরিবর্তন আমাদের কাজের আর ভাবনার জগতকে পাল্টে দিচ্ছিল।তিনি জানতেন তাকেও ডিজিটাল ফর্মেই নিজের কাজ জমা দিতে হবে।

"কিভাবে কোন সফটওয়ার ইউস করতে হয় তাৱনিয়ে আমার কোন ধারনা ছিলনা।আমি ইউ টিউব ঘাঁটাঘাঁটি করতে শুরু করলাম ফটোশপ শেখার জন্য।আর নাইট শিফটে আমার বইয়ের ছবি আঁকার কাজ শুরু করলাম।"

সেবছরই আমি তিনটি বইয়ের অলংকরনের কাজ করি।ইন্টারনেটেই আমি সবচেয়ে বেশী শিখেছি।আর আমি আজ অবধি যা শিখেছি কাজ করতে করতেই শিখেছি।এর চাইতে বড় বড় প্রাপ্তি আর কিছু নেই।"একথা বলার সময় রচনার চোখে সাফল্যের দিপ্তী ঝলক মারছিল।

এর পর অনেক চাকরি বদল হল রচনার।প্রথমে একটি কনটেন্ট ফার্মের চাকরি তো তারপর একটি বহুজাতিক আই টি ফার্মে কর্পোরেট কমিউিকেশন সামলানোর চাকরি। তবে সব কিছুর মধ্যেই চালিয়ে গিয়েছেন ছবি আঁকার কাজ।নটা-পাঁচটার ডিউটি সামলে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কাজও করে ফেললেন রচনা।দুবছর আগেও তিনি রাত্রিবেলা আর উইকএন্ডে নিজের চিত্রশিল্পীর কাজ সামলাতেন।

তবে এই বিয়ের পর স্বামীর ইচ্ছাতেই তার এই বাঁধা ছকে বদল আসে। "একজন ফ্রিল্যান্স শিল্পী থেকে ফুলটাইমের পাক্কা শিল্পী হয়েছি আমি।আর ডুডল ডু তৈরী করেছি,যেটা আমার জীবনের সেরা সিদ্ধান্ত।আর এই সব কিছুই সম্ভব হয়েছে আমার সুপার সাপোর্টিভ বরের জন্য।"

রাতে কাজ করতে করতে ,রচনা কোন জিনিসের উপর কিভাবে ছবি ছাপিয়ে তা বিক্রি করা যায় তা ভাবতেন।" পকেট আয়নাগুলোই সবসময় আমায় টানত। কারণ যখনই আমি কোন দোকানে যেতাম,আমি ফ্যান্সি পকেট আয়নার খোঁজ করতাম।কিন্তু কোনদিনই মনের মত জিনিস খুঁজে পেতাম না।আমি জানতাম আমার নিজের ডিজাইন করা প্রথম প্রোডাক্ট কি হবে।আর কোথায় প্রডাক্ট বিক্রি করব তাও জানতাম।ব্যাঙ্গালোরের পাইকারি বাজারই এর জন্য ঠিক ছিল।কারণ আমি নিজেও সেখানে যেতাম।

তাই রচনা যখন চাকরি ছাড়লেন তার কাছে পরিষ্কার ছিল তিনি কি করতে চান।নিজের ডিজাইন করা জিনিস বিক্রিই তার লক্ষ্য ছিল।এভাবেই ডুডল ডু শুরু হল।তিনি তার প্রিয় পকেট আয়না, ফ্রিজ ম্যাগনেট,কিচেন টাওয়েল,কুকুর থেকে সাবধান স্টিকার আর একটা রান্নার বইয়ের ডিজাইন করলেন।সম্প্রতি তিনি একটি ২০১৬ এর ডেস্ক ক্যালেন্ডারও ডিজাইন করেছেন।

বর্তমানে রচনা একাই ডুডুল ডুর যাবতীয় ঝক্কি সামলাচ্ছেন।জিনিস তৈরী থেকে মেলের রিপ্লাই করা,অনলাইন অর্ডার সামলানো, প্যাকেজিং মালের ডেলিভারি সবকিছু।কাজের ধরন অনুযায়ী একটা ছবি পুরো শেষ করতে কয়েক ঘন্টা থেকে কয়েকদিনও লেগে যায়।"আমি আমার স্কেচবুকে খসরাটা করি,তারপর গান শুনতে শুনতে ফটোশপে সেটা ঠিকঠাক করি।তবে মাঝে মধ্যে আমার কিছু ক্রিয়েটিভ ব্লকও হয়।" বললেন রচনা।

তবে এই চলার পথ কোনদিনই রচনার কাছে মাখনের মত মসৃণ ছিলনা।ব্যাবসার কোনও রকম অভিজ্ঞতা নাথাকায় তার কাছে ব্যাবসা শুরু করাটাই সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।" আমার কাজের বাজারে কোনও দাম আছে কিনা তা নিয়ে আমার সন্দেহ ছিল। লোকজন সেগুলো পছন্দ করবে কিনা তাও আমি জানতাম না।কিন্তু প্রথম দিনের বিক্রিবাট্টার পর আমার আর তানিয়ে কোনও সন্দেহ ছিল না।তাদের মুখের হাসি আর কৌতুহল থেকে বুঝলাম আমি সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছি। ইন্টারনেট আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।স্যোসাল মিডিয়া বিশেষ করে ফেসবুককে ধন্যবাদ দিতেই হবে,তাদের দৌলতেই আমার অনলাইন দোকানের আজ এক বছর পূর্ণ হচ্ছে।"

"যেকোন ফ্রীল্যান্স আর্টিস্টের কাছে শুরুর কটা মাসই সবচাইতে বড় লড়াই।কিন্তু ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যায়।অন্তত আমার ক্ষেত্রে তো তাই হয়েছিল।তারপর আপনি ওই কাজটা করতে পারেন যা আপনি ভালবাসেন।" বললেন রচনা।

রচনার ব্যাবসার মন্ত্র হল"অন্যের থেকে আলাদা হবার জন্য আপনাকে সবসময় চেস্টা করে যেতে হবে।তাহলে সাফল্যা আসবেই।আর ছোটখাটো সাফল্যগুলোকেই সেলিব্রেট করতে শিখুন"

নিজেই নিজের বস হওয়াটা খুব উপভোগ করেন রচনা।বাড়ির জীবন আর কাজের মধ্যে ব্যালেন্স কিকরে করেন প্রসঙ্গে রচনা বললেন ''কাজ আর ছুটির মধ্যে ব্যালেন্স বের করতে পারাটা খুব চাপের।তবে আস্তে আস্তে সেটাও শিখছি।আপনি শিখবেন মাঝে মাঝে সারাদিন বা বেশী রাত অবধি কাজ করাটাই নিয়ম।''

এই জীবনেই রচনা খুশী।তবে তার পরিকল্পনা রয়েছে'' ভবিষ্যতে আরও কিছু জিনিস আমার অনলাইন স্টোরে রাখার।এছারা আরও কিছু গ্রাহক বা মানুষজনের সঙ্গে কাজ করতে চাই যারা আমার শিল্পীসত্ত্বাকে চ্যালেঞ্জ করবে।''

তার কাস্টমারদের ফীডব্যাকই রচনাকে তাতায়।তার থেকেই আত্মবিশ্বাস পান রচনা।তার মত ব্যাবসায়ীদের একটাই পরামর্শ দিতে চান রচনা।'' নিজেকে কঠোর পরিশ্রম করে যেতে হবে।আর ধৈর্য রাখেত হবে।কারন আপনার প্রোডাক্ট ভালবাসবে এরকম কাস্টমার আপনি রাতারাতি পাবেন না।"

অনুবাদ সুজয় দাস।