ড্রাইভার থেকে ছুতোর মিস্ত্রি, সবার জন্য কাজ খুঁজে দেবে ন্যানোজবস

0


চাকরি প্রার্থীদের হোয়াইট কলার যব (অফিসে বসে কাজ)খুঁজে দেওয়ার জন্য বসে রয়েছে হাজারটা কনসালটেন্সি ফার্ম। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু যখনই ব্লু অথবা গ্রে কলার যব যেমন, প্লাম্বিং, ড্রাইভিং, ছুতোর কাজ এবং এই ধরনের কাজ খুঁজে দেওয়ার প্রয়োজন পড়বে সেখানে হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র কনসালটেন্সি ফার্ম যেমন, বাবাযব, জ্যাক অন দ্য ব্লক-তার বেশি মিলবে না। এই তালিকায় নতুন সংযোজন মুম্বইয়ের সংস্থা ন্যানোজবস। এটা হল জব কাম এমপ্লয়মেন্ট পোর্টাল, যারা চাকরিপ্রার্থী (নিম্ন এবং মধ্যবর্তী স্তরের) এবং চাকরিদাতাদের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করে। বর্তমানে এই স্টার্টআপে গাড়ির চালক থেকে প্লাস্টিক গলানোর মেশিনের কর্মী, হাজার ধরনের চাকরিপ্রার্থী রয়েছে।

অনুপম সিঙ্ঘল এবং বিকাশ চৌধুরীর হাত ধরে ন্যানোজবসের আত্মপ্রকাশ। বর্তমানে শুধুমাত্র মুম্বইতেই পরিষেবা পাওয়া যায়। অনুপম বেঙ্গালুরুর P.E.S.I.T থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে বি-টেক। বিকাশ অস্ট্রেলিয়ার কুইনসল্যান্ড ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক। উদ্যোক্তা হয়ে নিজের ব্যবসা শুরুর আগে অনুপম আইবিএম এবং কননিজেন্টের মতো সংস্থায় কাজ করেছেন। অন্যদিকে বিকাশ নিজের প্রথম ভেঞ্চার রাজ কনসালটেন্সি চালাচ্ছিলেন।

বিকাশের প্রথম ভেঞ্চার ছিল হোয়াইট কলার জব খুঁজে দেওয়ার জন্য কনসালটেন্সি ফার্ম। একবার মুম্বইতে চার হাজার ড্রাইভার খুঁজে দেওয়ার কনট্রাক্ট পান। ওই কাজটা করতে গিয়ে বিকাশ বুঝতে পারেন, অফলাইনে এই কাজ করা যথেষ্ট কঠিন। আরও অবাক হয়ে যান যখন বুঝতে পারেন, তিনি যে ধরনের লোক খুঁজছেন কোনও অনলাইন পোর্টালে তারও কোনও ডাটাবেস নেই। ‘চার হাজার ড্রাইভার খুঁজে দিতে ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে ব্লু এবং গ্রে কলারদের জন্য প্ল্যাটফর্ম তৈরির আইডিয়া মাথায় ঘুরতে থাকে। প্রথম থেকেই বুঝতে পারি কলের মিস্ত্রি, ড্রাইভার, ছুতোর মিস্ত্রি, গাড়ির মেকানিকদের ডাটাবেস তৈরি করা কী কষ্টসাধ্য’, বলেন বিকাশ। চাকরিপ্রার্থীদের নাম তালিকাভুক্ত করতে গিয়ে ন্যানোজবস নানা অফলাইন স্টল বসায়। সেই সঙ্গে ছোট ছোট দোকানদার, মোবাইল রিচার্জের দোকানগুলিকেও কাজে লাগায়। দুই প্রতিষ্ঠাতাই এমন এক উপায় খুঁজছিলেন যাতে সমাজেও প্রভাব পড়ে।

প্রথম দিকে ন্যানোজবসে কাজ করার জন্য অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কেউ রাজি হচ্ছিলেন না। দক্ষ এবং মেধাবী কর্মী নিয়োগ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ‘যাইহোক, অনেক কষ্টে বেশ কিছুদিন সময় নিয়ে ভালো একটা টিম তৈরি করতে পেরেছিলাম। ম্যনেজেরিয়াল কাজ দেখার জন্য জুনিয়র কিছু কর্মীকেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল’, জানান বিকাশ। এই পর্যন্ত দুই উদ্যোক্তা নিজেরা ২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। এক বছরের মধ্যে ব্রেক ইভেনে পৌঁছানো যাবে বলে তাঁদের আশা। এরই মধ্যে, বিকাশ জানান, কিছু কিছু সংস্থা তাঁদের স্টার্টআপে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে। খুব দ্রুত ফান্ড তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে সংস্থার।

রমেশ সিং। বছর ছাব্বিশের এই বিহারি যুবক ন্যানোজবসের অবদান ভুলতে পারেন না। ‘মুম্বইয়ের লালবাগে ন্যানোজবসের হোর্ডিং দেখি। তাতে লেখা একটি ফোন নম্বর-০৭৩০৩৪৪০৫৫০ এ মিসড কল দিই। পরে ন্যানোজবসের এক কর্মী ফোন করেন আমাকে। বায়োডাটা তৈরির জন্য বিস্তারিত তথ্যসংগ্রহ করেন’, বলেন রমেশ। আট দিনের মধ্যেই রমেশ দ্বিতীয় ফোন পান। মুম্বই বেসড একটি স্টার্টআপে অফিস কাম ডেলিভারি বয়ের কাজ পান রমেশ।

বর্তমানে বেশিরভাগ কনসালটেন্সি ফার্ম যে জব পোর্টাল ব্যবহার করে তা ছোট এবং মাঝারি স্টাফিংয়ে তেমন নজর দেয় না। সাধারণত, জনশক্তি কনসালটেন্ট বা স্টার্টআপগুলি হয় মুখের কথা বা সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন দেখে। দুটি ক্ষেত্রেই খামতি রয়েছে। ‘মুখের কথার ওপর তো একেবারেই নির্ভর করা যায় না। অন্যদিকে, কাগজের বিজ্ঞাপন খরচ সাপেক্ষ এবং বিজ্ঞাপনের স্থায়ীত্ব মাত্র একদিন’, বলেন অনুপম। এইসব অসুবিধার কথা মাথায় রেখে দুই উদ্যোক্তা পোর্টাল করেন। তাতে শুধু প্রত্যেক বাড়ি এবং বিভিন্ন সংস্থায় যাদের প্রয়োজন পড়ে তাদের তালিকা তৈরি করেন এবং কাজের ব্যবস্থা করেন।

ন্যনোজব ফোনেই চাকরিপ্রার্থীদের বায়োডাটা তৈরি করতে সাহায্য করে। ইন্টারভিউর জন্য শর্টলিস্টেড হলেও যারা টেকস্যাবি নন তাদের জন্য অফলাইন পরিষেবা দেওয়া হয়। ভালো সাড়া পাচ্ছে ন্যনোজবস। ‘যারা গাড়ির ড্রাইভার বা বাড়ির কাজের লোক পেতে হন্যে হয়ে যাচ্ছেন তারা NanoJobs.com ব্যবহার করছেন’, জানান বিকাশ। ২০১৩র সেপ্টেম্বরে লঞ্চ করার পর থেকে এক বছরের মধ্যে ন্যানোজব ২৫ লাখ টাকার ওপর ব্যবসা করেছে। ‘আমাদের ইউএসপি হল সংগৃহীত ডাটাবেস। নানা স্তরে খোঁজ খবর নিয়ে তবে ফ্রিল্যান্সারদের সঙ্গে যোগাযোগ করি’, বলেন বিকাশ।

চাকরিপ্রার্থীদের যারা ডাটা সংগ্রহ করছেন সেইসব ফ্রিল্যান্সারদের ওপর খুব বেশি নির্ভর করতে হয় এই স্টার্টআপকে। এখনও পর্যন্ত দেড়শো ফ্রিল্যান্সার কাজ করেছেন। সংখ্যা কয়েকগুন বাড়ার সম্ভাবনা দেখছেন দুই তরুণ উদ্যোক্তা। চাকরিপ্রার্থীদের ডাটা তৈরি করার মধ্যে বিরাট চ্যালেঞ্জ দেখছে ন্যানোজবস। ‘যেহেতু তারা অনলাইনে আসবেন এমন আশা করতে পারি না, তাই তাদের কাছে গিয়ে আবেদনপত্র পূরণ করাই আমরা। এইসব চাকরিপ্রার্থী যাদের কোথাও খুঁজে পাওয়া মুশকিল, তাদের কাছে পৌঁছাতে আমরা নানা মাধ্যম ব্যবহার করেছি’, বলেন বিকাশ। সংস্থায় রেজিস্ট্রশনের জন্য আলাদা কোনও চার্জ লাগে না।

খুব শিগগিরই বেঙ্গালুরু, দিল্লি, কলকাতা, আমদাবাদ, পুনে ও হায়দরাবাদে সংস্থার শাখা খোলার পরিকল্পনা রয়েছে। ‘আগামী ১৮ মাসে ৫ লক্ষ চাকরিপ্রার্থীর ডাটা তৈরির লক্ষ্য রয়েছে’, শেষ করেন বিকাশ।

লেখক-জয় বর্ধন

অনুবাদ-তিয়াসা বিশ্বাস