পুরুলিয়ার অযোধ্যায় অজস্র দশরথ, পাহাড় কেটে পথ

0

কেউ ছিল না পাশে। একা বাইশ বছর ধরে পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করেছিলেন দশরথ মাঝি। গযার গেহলরগঞ্জের এই যোদ্ধার কথা হযতো জানেন না অযোধ্যা পাহাড়ের ধানচাটানি গ্রামের বাসিন্দারা। তবে গেহলরগঞ্জের সঙ্গে এখানে অনেক মিলও আছে আবার তফাতও আছে। এখানে অনেক দশরথই আছেন। তাই অযোধ্যা পাহাড়ের একদা বিচ্ছিন্ন ধানচাটানি গ্রামের মানুষরা নিজেরাই যোগাযোগের পথ খুঁজেছেন। স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে দুর্গম পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করছেন তাঁরা।

বিক্রম, রঞ্জিৎ পালের কথা মনে পড়ে। প্রথম সারির এই মাওবাদীদের নেতাদের একসময়ের ডেরা ছিল এই এলাকা। যা মাওবাদীদের আঁতুরঘর হিসাবে পরিচিত ছিল। গ্রামের নাম ধানচাটানি। পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের অন্যতম উঁচু জনপদ। যেখানে যেতে হলে কোনও রাস্তা নেই। স্রেফ বড় গাছকে নিশানা করে যেতে হবে। ধরে নেওয়া হয় ওই গাছের আশেপাশে কোনও বসতি থাকতে পারে। এমন প্রত্যন্ত এলাকায় উন্নয়ন কী জিনিস এক সময় জানতেন না বাসিন্দারা। পড়াশোনা দূরের কথা, কীভাবে পেট ভরবে এই ভাবতেই দিন কেটে যেতে বাসিন্দাদের। সকালের খাবার বলতে ছিল গাছের মূলের মতো খেড়ুয়া আলু। তা সেদ্ধ করে খাওয়া হত। দুপুরে কিছু জুটলে খাওয়া হত, কখনও কখনও না খেয়েই থাকতে হত। জীবনধারণের ব্যাপারে প্রকৃতিই বাসিন্দাদের তাদের অন্যতম ভরসা। স্নানের জন্য ঝর্ণার জল, কিংবা পানীয় জলের জন্য কুয়ো। বঞ্চনার শেষ সীমায় থাকা এমন একটা জনপদে দীর্ঘদিন ধরে ছিল মাওবাদীদের আনাগোনা। বছর আটেক আগে তারা সেখানে জাঁকিয়ে বসেছিল। এমন ভৌগলিক অবস্থান তাদের অনেকটাই সুবিধা করে দিয়েছিল। কারণ নিচ থেকে কেউ অভিযান চালাতে এলে ওপর থেকে সহজেই দেখা যেত। ২০১১ সালের পর ওই এলাকার বাসিন্দাদের ২ টাকা কেজি দরে চাল, গম দেওয়া হয়। কিছু কাজও হয়। তারপর থেকে মাওবাদীদের আনাগোনা অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়। কিছু কাজ হলেও অনেক কিছুই এখনও করার বাকি। কেউ অসুস্থ হলে দড়ির খাটিয়ায় করে আনতে হয় উঁচু পাহাড় থেকে। উঠতে গেলেও জান বেরিয়ে যায়। অবস্থা এমনই যে গ্রামের একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নামা-ওঠার ঝক্কি না নেওয়ার জন্য পরিবার নিয়ে বাধ্য হয়ে স্কুলেই থাকেন। কাঠ, পাতা কুড়িয়ে বিক্রি করতে চাইলেও কয়েক কিলোমিটার হেঁটে নিচের সিরকাবাদ বাজারে যেতে হবে। সোজা কথায় নুন কিনতে গেলেও ওই চরাই উতরাই পেরোতে হয় ভুক্তভোগীদের।


বছরের পর বছর এমন দুর্ভোগ আর মানতে পারছিলেন না ধানচাটানির শতাধিক পরিবার। একটার পর একটা ভোট গিয়েছে শুধু রাস্তার কথা জেনেছেন গ্রামবাসীরা। প্রতিশ্রুতি পেতে পেতে ক্লান্ত মানুষগুলো একদিন নিজেদের মধ্যে বৈঠক করেন। বৈঠক ঠিক হয় পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করতে হবে। কিন্তু কীভাবে। চটজলদি সমাধানও হয়ে গেল। প্রায় প্রত্যেকের বাড়িতে আছে কোদাল, গাঁইতি, ঝুড়ি। ওই নিয়েই নেমে পড়তে হবে। ঠিক হল সপ্তাহের মঙ্গলবার, হবে কাজ। আর প্রতি পরিবার স্বেচ্ছাশ্রম দেবে। মঙ্গলবার সকাল হলেই কোদাল, গাঁইতি, ঝুড়ি নিয়ে নেমে পড়েন গ্রামে কচি-কাঁচা থেকে বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা। সব্বাই জানেন নিজেদের কাজ নিজেদের করতে হবে। ধানচাটানি থেকে নালাকচা পর্যন্ত সাত কিলোমিটার রাস্তা তৈরি করা তাদের প্রথম টার্গেট। তার জন্য হইহই করে নেমেও পড়েছেন তাঁর। মাস তিনেকের কাজে অনেকটা পথ তৈরি হয়েছে। যাতে গ্রামের প্রায় পাঁচশো মানুষের অবদান রয়েছে।প্রায় পাঁচ ফুট চওড়া রাস্তা করতে গিয়ে ছোটখাটো দুর্ঘটনাও ঘটেছে। কারো হাত কেটেছে, কেউ পায়ে আঘাত পেয়েছেন। কিন্তু এসব মাথা ঘামাতে চান না গ্রামবাসীরা। তাঁর নিজেদের লক্ষ্যে অবিচল।


আর বড় গাছকে সিগন্যাল ধরতে হবে না। কোথায় পায়ের ছাপ তাও খুঁজে বেড়াতে হবে না। মানসী সোরেন, রবি মুর্মুরা জানেন তাঁরা ঠিক সফল হবেন। তার জন্য মঙ্গলবার ভোর হলেই তাঁরা তড়াক করে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েন। ধানচাটানির বাসিন্দারা মনে করেন রাস্তা হয়ে গেলে আর খাটিয়ায় করে রোগীকে নিয়ে যেতে হবে না। গ্রামে সহজেই ঢুকে যাবে অ্যাম্বুল্যান্স। সাইকেল ঠেলতে হবে না। বাইক সব দূরত্ব ঘুচিয়ে দেবে। রবি মুর্মু বলেন, ‘‘আশা করছি আর কয়েক মাসের মধ্যে আমাদের স্বপ্নের রাস্তা তৈরি হয়ে যাবে। প্রথমে ভাবতেই পারিনি এতটা আসতে পারব। এখান বিশ্বাসটা এসেছে আমরা পারব।’’ এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা জলধর মাহাতোর আবেগ আর ধরে না। এই প্রবীণের কথায়, ‘‘ জীব্বদশায় রাস্তা দেখে যেতে পারব, তা ভাবিনি। এবার হয়তো সেটা হতে চলেছে। রাস্তা না থাকায় কতদিন নিচে নামিনি। সেই আক্ষেপ বোধহয় মিটবে।’’ প্রশাসন মনে করছে নিজেরাই যেহেতু রাস্তা করেছেন তাই গ্রামবাসীরা বুঝবেন তাঁদের কাজের মর্ম। রাস্তা যাতে ঠিক থাকে তার জন্য মানুষই উদ্যোগ নেবে। সেই রাস্তা যাতে আরও ভাল থাকে সে ব্যাপারে কিছু পরিকল্পনা নিয়েছে পুরুলিয়া জেলা প্রশাসন। সভাধিপতি সৃষ্টিধর মাহাতো বলছেন কয়েক মাসের মধ্যে ওরা যা করেছে তা খুবই প্রশংসনীয়। ওখানে কংক্রিটের রাস্তা করা হবে। তার জন্য অর্থ বরাদ্দও হয়ে গিয়েছে।

কারও অপেক্ষায় না থেকে স্রোতের উল্টো দিকে হেঁটেছেন। ধানচাটানির বাসিন্দাদের ‌এমন উদ্যোগে প্রভাবিত অযোধ্যা পাহাড়ের অন্যান্য গ্রামগুলি। কে জানে এমন বিন্দু বিন্দু থেকে একদিন সিন্ধু তৈরি হবে।

Related Stories