বাড়িতেই পৌঁছে যাবে হাসপাতাল

0

স্বাস্থ্য পরিষেবা মানেই যেন ডাক্তার, নার্স বা হাইটেক যন্ত্রপাতিতে ভরা অত্যাধুনিক হাসপাতাল। কিন্তু এরপর? হার্টের জটিল অপারেশনের পর যে বৃদ্ধ বাড়ি ফিরলেন, তাঁর স্ত্রী অসুস্থ। ছেলে-মেয়ে বিদেশে।তবে কে নেবে শুশ্রুষার ভার? কে করবে যত্ন-আত্তি? আজকের ব্যস্ত সমাজে, রোগশয্যায় কাতর বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের শয্যার পাশে থাকার মতো মানুষের যে বড্ড অভাব। সেই শূন্যস্থান ভরাটের লক্ষ্য নিয়ে ফ্ৰ্যাঙ্ক গোল্লের, ভি ত্যাগরাজন এবং সমীর মেহতা নামের তিন উদ্যোগপতি চেন্নাইয়ে তৈরি করলেন সংস্থা - ‘‘ইন্ডিয়া হোম হেলথ কেয়ার।’’ যেমন নাম, উদ্যোগও তাদের খুব সোজা। অসুস্থ মানুষটির প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়া হবে তাঁদের নিজের বাড়িতে।

নিজ গৃহে স্বাস্থ্য-পরিষেবা ব্যাপারটা কিন্তু আমাদের দেশেও নতুন কিছু নয়। পাড়ার অলি-গলিতে বিভিন্ন সেন্টারে যোগাযোগ করলে নার্স মেলে। পাওয়া যায় আয়া।কিন্তু তাঁদের কতটুকু বিশ্বাস করা যায়? প্রশিক্ষণই বা কী? অর্থাৎ সংশয় এবং হাজারো প্রশ্ন। ফ্রাঙ্কদের ‘ইন্ডিয়া হোম হেলথ কেয়ার’-এর দৌলতে নিজ গৃহে স্বাস্থ্য-পরিষেবার সংজ্ঞাটাই যেন বদলে গেল রাতারাতি- স্মার্ট, মানবিক এবং বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি। ফ্রাঙ্কের কথায়, ‘‘এজেন্টের ভূমিকায় যে সংস্থাগুলো কাজ করছিল, তাদের থেকে আমাদের চিন্তা-ভাবনা এবং পরিকাঠামোয় আলাদা। কটা বাড়িতে আমরা কাজ করছি, তার থেকেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল পরিষেবার গুণগত মান। আমাদের কর্মীরা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তাঁদের কাজে পাঠিয়ে আমাদের কাজ শেষ হয় না। ওদের কাজের ওপর আমরা নজর রাখি। দরকারে প্রশিক্ষণ দিই। এমনভাবে আমরা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছি, যাতে ফিল্ড স্টাফদের সঙ্গে সংস্থার আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বাড়ছে পরিষেবার মান।’’

কেউ কেউ বলে থাকেন, ইন্ডিয়া হোম হেলথ কেয়ার হল ভারতের স্বাস্থ্য পরিষেবার এক নতুন দর্শন। যুগান্তকারী বিপ্লব। পরিবর্ত‌নের সেই অধ্যায় নিয়ে আরও ভালভাবে জানতে হলে আমাদের আলো ফেলতে হবে পরিবর্তনের কান্ডারীর ওপর। ফ্র্যাঙ্ক গোল্লের। জার্মান নাগরিক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়াগোর হাইস্কুলে পড়াশোনা। বৈদ্যুতিন মাধ্যমের জন্য তিনি একটা বিঞ্জাপন সংস্থা গড়ে তোলেন। পরে সংস্থাটিকে তিনি বিক্রি করে দেন। দিলয়েওি কনসালটিং-এর ইন্টারন্যাশনাল প্রজেক্টস বিভাগে দশ বছর ম্যানেজার হিসাবে কাজ করেছেন। স্বাস্থ্য-পরিষেবা এবং উৎপাদন শিল্প নিয়ে তাঁর আগ্রহ দীর্ঘদিনের। জার্মানির কোলন থেকে স্নাতক, ইতালির মিলানে ইন্টারন্যাশনাল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়াশোনা। বিশ্ব নাগরিকের তকমা পাওয়ার জন্য যেটুকু অবশিষ্ট ছিল, সেটাও তিনি পেয়ে গেলেন চেন্নাইয়ে চার বছরের কর্মজীবনে। চার বছর তিনি ছিলেন ইন্ডিয়া হেলথ কেয়ারের সিইও পদে। ২০০৯ সালে ইস্তফা দিয়ে তিনি নিজের দেশ জার্মানিতে ফিরলেন। কিন্তু এখনও তাঁর সঙ্গে সংস্থার যোগসূত্র অটুট। রয়েছেন ডিরেক্টর হিসাবে। এখনও ফ্রাঙ্ক মানেই ইন্ডিয়া হোম হেলথ কেয়ার।


কিন্তু এত বিষয় থাকতে, কাজের এত অভিজ্ঞতা কেন হোম হেলথ কেয়ারের মতো বিষয় বাছলেন ফ্র্যাঙ্ক? তাঁর সাফ কথা, চাহিদা থাকলে তৈরি হয় ব্যবসার সম্ভাবনা। হোম হেলথ কেয়ার হল ভবিষ্যতের ব্যবসা। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি পশ্চিমী দেশগুলোতে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর সেবা-যত্ন পাওয়ার জন্য অনেক বেশি অর্থ খরচ করা হয়। এখনও ভারতে নিজ গৃহে স্বাস্থ্য পরিষেবার ধারণা ছড়ায়নি। কিন্তু ফ্র্যাঙ্ক বলেন, ‘‘আমরা ভাবনায় বদলে আনতে চেয়েছিলাম। এমন কিছু করতে চেয়েছিলাম যা নতুন এবং সম্ভাবনাময়।’’

পরিষেবার গুণগত মানের বৃদ্ধি মানে বাড়ে খরচ। সমাজের বেশিরভাগ মানুষের পক্ষে সে খরচ বহন করা যে সম্ভব নয়, তা ফ্র্যাঙ্ক বিলক্ষণ জানেন। তবুও মানের সঙ্গে আপসে তিনি রাজি নন। ২০১৩ সালে মার্কিন সংস্থা বায়াদা হোম হেলথ কেয়ারের সঙ্গে গাঁটছাড়া বাঁধল ইন্ডিয়া হোম হেলথ কেয়ার। এর ফলও মিলতে শুরু করল। চেন্নাই থেকে সংস্থা ছড়াল আরও বেশ কয়েকটি শহরে। ব্যবসার সম্প্রসারণের পাশাপাশি সুযোগ মিলল উন্নত প্রশিক্ষণের।

কিন্তু এরপর? ভবিষ্যতের জন্য যে নীল নকসা তৈরি হয়েছে তাতে আগামী ৫ বছরের মধ্যে ১০টি মেট্রো শহরে শুরু হবে পরিষেবা। আগামী দশ বছরের মধ্যে পরিষেবা ছড়িয়ে দেওয়া হবে সব স্তরের মানুষের মধ্যে। অন্যান্য উদ্যোগপতিদের উদ্দেশ্য ফ্রাঙ্কের পরামর্শ একটাই। ‘‘যে পণ্য আপনি তৈরি করেছেন, কিংবা যে পরিষেবা আপনি দিচ্ছেন, সেটাই হোক আপনার প্রধান লক্ষ্য। অন্য কিছুতে মন না দিয়ে, পরিশ্রম করুন, সাফল্য আসবেই।’’

Related Stories