দীপিকা-রনবীরের রিল ও রিয়েলের রসায়ন

1
সেই শ্রীলঙ্কা। পদ্মাবতীর প্রেমের সেই উৎস। বনসালীর সিনেমার হিরো রতন সিং নন বরং ভিলেন খিলজিই দীপিকার প্রথম পছন্দ। আজ্ঞে হ্যাঁ ঠিকই শুনছেন। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কায় গিয়ে নিজের বত্রিশ-তম জন্মদিন এবং সিনেমার সাফল্যকে জমিয়ে উদযাপন করে এলেন অভিনেত্রী দীপিকা পাড়ুকন এবং তাঁর বয়ফ্রেন্ড রনবীর সিং। খোলাখুলি স্বীকার না করলেও তাদের একে অপরের প্রতি আসক্তি টিনসেল টাউনসহ মিডিয়া কিংবা তাদের ফ্যান ফলোয়ার কারও নজর এড়ায়নি।

মিডিয়ার চতুর নজর এড়ায়নি আরেকটি বিষয়। লোকচক্ষুর আড়ালে গোপনে শ্রীলঙ্কায় নিজেদের এঙ্গেজমেন্ট সেরে ফেলেছেন রনবীর দীপিকা। নেহা ধুপিয়ার জনপ্রিয় টকশো BFFs with Vogueএ একথা অস্বীকার করেছেন দীপিকা। আইনি ভাষায় যাকে বলে ঠোস সবুত তাও কিছু নেই। কিছুদিন আগেই গাঁটছড়া বেঁধেছেন আরেক সেলেব্রিটি দম্পতি। ভারতের ক্রিকেট টিমের অধিনায়ক বিরাট কোহলি আর অভিনেত্রী অনুষ্কা শর্মা। দেশবাসী আদর করে তাদের বিরুষ্কা ডাকে। আমরাও রনবীর দীপিকার আসন্ন মিলনের অপেক্ষায় রইলাম।

এবার একটু গল্পেও ফিরি, পদ্মাবতের রানি পদ্মিনীর প্রেমের পুরুষ মেবারের রানা রাওয়াল রতন সিং। সুদূর সিংহলে যিনি গিয়েছিলেন দুর্লভ মুক্তর সন্ধানে। সেখানে ঘায়েল হন রাজকুমারী পদ্মাবতীর তীরে। আর অপরূপা সেই রমণীর হরিণ নয়নে তীর-বিদ্ধ হয় রানার হৃদয়। রাজকুমারীকে বিয়ে করেন। পদ্মাবতীও রাজাকে ভালোবেসে তাঁর দ্বিতীয় পত্নী রূপে সিংহল সমুদ্রের শীতলতা উপেক্ষা করে চলে আসেন চিতোরের তপ্ত বালুকাময় রাজ্যে।

কিন্তু তাঁদের প্রেমে বাঁধ সাধে খিলজি বংশের দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে শক্তিশালী সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজি। রতন-পদ্মার সোনার সংসার ছারখার করার পেছনে আসল ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছিলেন রাঘব চেতন নামে চিতোরের এক নির্বাসিত ব্রাহ্মণ। অন্তত এমনটাই দেখানো হয়েছে বনসালীর সিনেমায়। ইতিহাসবিদদের একাংশের অবশ্য দাবী এই রাঘব নাকি ছিলেন নিছকই এক বাঁশিওয়ালা। যার শখ ছিল ন্যাক্রোম্যান্সি মানে কালা যাদু-চর্চা করা। রানির পরামর্শ-মত রতন সিং তাকে নির্বাসিত করেন। রাঘব ভুলতে পারেন না অপমানের জ্বালা। সোজা হাজির হন আলাউদ্দিনের ডেরায়। রানি পদ্মাবতীর রূপের বর্ণনা করে প্রলুব্ধ করেন আলাউদ্দিনকে। যৌনতায় চির তৃষিত সম্রাট আলাউদ্দিন খেপে ওঠেন পদ্মাবতীকে পাওয়ার লোভে। হাজার হাজার সেনা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন মেবারে। ভাঙতে পারেন না বীর রাজপুত রানার মনোবল। সন্ধি করার কৌশলে আটক করেন রতন সিং কে। ছাড়বার শর্ত একটাই, পদ্মাবতী। হার মানেননি রানির রাজপুতানি সম্ভ্রম। রাজনীতি জানা বীরাঙ্গনা পদ্মাবতী রাজাকে মুক্ত করতে সক্ষম হন। দুই রাজপুত বীরযোদ্ধা, গোড়া সিং আর বাদল সিং এবং তাদের বীর সৈন্য দল যুদ্ধে বাহুবল বুদ্ধিবল দুইই প্রয়োগ করেন। রণক্ষেত্রে বীরের মতো শহিদ হন গোড়া-বাদল। সিনেমায় দেখানো হয়েছে রাজাকে দিল্লীর কারাগার থেকে মুক্ত করতে সাহায্য করে আলাউদ্দিনের স্ত্রী মেহের উন নিসা। ইতিহাস যাই বলুক। বনশালী মহৎ করতে চেয়েছেন রানিকে। কম ঝক্কি পোয়াতে হয়নি। একটা সময় সিনেমা রিলিজ করাই অসম্ভব হয়ে পরেছিল। নিত্য প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন বনসালী এবং কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করা বলিউড কাঁপানো সুন্দরী নায়িকা দীপিকা পাডুকন। তবে এসবে খুব বেশি বিচলিত হননি দীপিকা। পাঁচশ কোটির ক্লাবে প্রবেশ করে ফেলেছেন এই কদিনেই। বলিউডের সবচেয়ে সফল নায়িকা। মাত্র বছর দশেক আগে শাহরুখের বিপরীতে ওম শান্তি ওম দিয়ে বলিউডের যাত্রা শুরু করেছিলেন। তাঁর অভিনয় ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও তাঁর সৌন্দর্য প্রশ্নাতীত। তরতর করে চরেছেন সাফল্যের সিঁড়ি। অনেক কাঁচি চালানোর পর সিনেমা রিলিজের ছাড়পত্র দিয়েছে সেন্সর বোর্ড।

রিপোর্ট বলছে একশ ত্রিশ কোটির লাভের অঙ্ক ইতিমধ্যেই টপকে গেছে বনসালীর "পদ্মাবত"। পুরো খুশি হতে পারছেন কি তিনি? না। সেখানেও বিধি বাম। কেন? সেই প্রসঙ্গে না হয় একটু পরেই আসি। আগে শেষ করি সেই রাজকাহিনী যা এতক্ষণ শোনাচ্ছিলাম আপনাদের। রতন সিংকে মুক্ত করতে পারলেও শেষরক্ষা হয়নি। না ইতিহাসে না সিনেমায়। আলাউদ্দিনের তীব্র কোপানলে ধ্বংস হয়ে যায় মেবার। অনৈতিক যুদ্ধে প্রাণ দেন রতন সিংহ এবং হাজারও রাজপুত সেনা। আর এদিকে আত্মমর্যাদা রক্ষার তাগিদে বিশাল জহরের চিতায় প্রাণ বিসর্জন দেন শয়ে শয়ে রাজপুত রমণী। তাঁদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বীরাঙ্গনা রানি পদ্মাবতী। অত্যাচারী আলাউদ্দিন রানির নাগাল পান না। ছলে বলে নানা কৌশলে অনেক যুদ্ধ জিতেছেন আলাউদ্দিন। জীবনের শ্রেষ্ঠ হার তাকে উপহার দেন এই নারী। আগুনে পার্থিব শরীর ঝলসে গেলেও ইতিহাসের পাতায় রানি পদ্মাবতী অমর হয়ে রয়েছেন তাই। কিছু ইতিহাসবিদের দাবি এ নিছকই গল্প-গাঁথা। এমন কোনও ঘটনাই নাকি ঘটেনি রাজপুতানার বীরভূমিতে।

সে যাই হোক, সেসব তর্কে নাহয় অন্য কোনওদিন আলোচনা হবে। আজ ফিরে আসি বনসালীর সাফল্য পরবর্তী অস্বস্তির কারণে। সিনেমার শেষ দৃশ্যে দেখানো হয়েছে শয়ে শয়ে রাজপুত নারী লাল বস্ত্র পরে ঝাঁপ দিচ্ছেন চিতার আগুনে। যদিও প্রথমেই ডিসক্লেমার দেওয়া হয়েছে সতী প্রথাকে সমর্থন করেন না পরিচালক। কিন্তু তথাপি জহর ব্রতকে মহিমান্বিত করার এক সূক্ষ্ম প্রচেষ্টা কি সত্যিই করেননি পরিচালক? প্রশ্ন তুলেছেন দর্শকরা। স্বভাবতই উঠেছে বিতর্কের ঝড়। 

বলিউডের আরেক অভিনেত্রী স্বরা প্রায় আড়াই হাজার শব্দের এক খোলা চিঠি দিয়েছেন বনসালীকে। ফিল্মটি দেখার পর স্বরার নাকি নিজেকে " যোনী-সম্বল একটি দেহ" ছাড়া কিছুই মনে হচ্ছে না। সেলেব্রিটি মহল, আমজনতা সোশ্যাল মিডিয়া তোলপাড় করে চলছে টুইট, রিটুইট,বহু কমেন্টসের প্রবাহ।