কলকাতার অলিগলি-পাকস্থলি ও মগজে পৌঁছবে #OneWeb

0
"There ain't no such thing as a free lunch" - Milton Friedman
“If not me, who? And if not now, when?”- Mikhail Gorbachev

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। ১৯৮০-র দশকের মাঝামাঝি একটি শব্দ দুনিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্যকে দুলিয়ে দিয়েছিল। একটি মাত্র শব্দ, হয়ে উঠেছিল পৃথিবীর অর্ধেক মানুষের প্রিয় দর্শনের প্রতিস্পর্ধা। দীর্ঘদিনের চাপান উতোর, শীতল থেকে আরও শীতল স্নায়ুযুদ্ধকে দুয়ো দিয়েছিল, একটি মাত্র রাশিয়ান শব্দ। যা পরে জন-জাগরণের ভিতর দিয়ে ভেঙে ফেলেছিল বার্লিনের পাঁচিল। টুকরো টুকরো করে তছনছ করে দিয়েছিল গোটা সোভিয়েত দেশকে। বদলে গিয়েছিল এশিয়া ইউরোপের মানচিত্র। মানুষের আবহমান রণরক্ত বৈপ্লবিক সাম্যবাদী সাফল্যের মূল ধরে নাড়িয়ে দিয়েছিল, একটি মাত্র শব্দ। বামপন্থী বিশ্বের দুচোখের বিষ সেই শব্দটি гла́сность (Glasnost, গ্লাসনস্ত)। এর অন্তরে মুক্ত হাওয়ার আবেদন ছিল। অ্যাডাম স্মিথের প্রবচন ছিল। মুক্ত বাজার ছিল। বাজারের হানা ছিল, চাহিদা যোগানের নির্দিষ্ট দর্শন ছিল। এবং সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ মানুষের তৃপ্তির অধিকার ছিল। আর যার কাছে পয়সা ছিল না, ক্রয়ক্ষমতা ছিল না, সেই অনধিকারীর জন্যে গলা ধাক্কাও ছিল।

তাই গোটা পৃথিবী জুড়ে চিন্তাশীল মানুষকে ভাবিয়েছে গ্লাসনস্ত। যারা কমিউনিজমের ধ্রুপদী আদর্শকে আঁকড়ে থাকতে চেয়েছেন তাদের দুশমন এই গ্লাসনস্তের সঙ্গে লড়াই করার হিম্মত রাখে আরেকটি শব্দ। কারণ এই শব্দটিও খুব শক্তিশালী। এই শব্দের ভিতর সামাজিক দায়ের একটি গূঢ় অনুষঙ্গ আছে। মুক্তির ইঙ্গিত আছে। সাম্যবাদের সুর আছে। গোটা দুনিয়ায় সে এখন তৈরি করেছে এমন একটি মেরু যার বিপরীতে তুমুল শক্তি নিয়ে দাঁড়িয়েও অস্থির অ্যাপল, মাইক্রোসফট, গুগলের মত অ্যাকিলিসরা। যে বাজার মিলটন ফ্রিডম্যানের দর্শনে চলে তার বিপরীত স্রোতে দাঁড় টেনে সমাজের বৈষম্যের মূলে পৌঁছতে চায় এই শব্দটি। মানুষকে ফিরিয়ে দিতে চায় মানুষের অধিকার। এক করতে চায় গোটা বিশ্বকে। সেই ১৯৮০র দশকের টানাপড়েনের সময় থেকেই সে মেলাতে চাইছে চকচকে দুনিয়ার সঙ্গে ক্লিষ্ট বিষণ্ণ সেই পৃথিবীকে যে পৃথিবী বাজারের নিয়মে গলা ধাক্কা খেয়েছে। মুখ নিচু করে দাসত্ব মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।

সাধারণের হাতে ক্ষমতা দেওয়ার অদম্য একটি সাম্যবাদী আবেদন নিয়ে সফ্টঅয়্যারকে মুক্ত করার প্রয়াস নিয়েছেন যে বিপ্লবীরা তাঁদের পছন্দের সেই শব্দটি FOSS(Free and Open Source Software)। কেউ কেউ বলেন FLOSS (Free/Libre Open Source Software) আপাত নিরীহ এই acronym এ যে মুক্তির ডাক আছে তা গোটা দুনিয়াকে সরাসরি দুটি শিবিরে ভাগ করে দিয়েছে। দুর্দান্ত লড়াইয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে বিশ্বের তাবড় ব্র্যান্ডকে।

কথা প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল বছর দশেক আগের একটি সেমিনারের কথা। ২০০৫ তিউনিসিয়া। ওয়ার্ল্ড সামিট ফর ইনফরমেশন সোসাইটির আয়োজনে বিশাল সেই সেমিনার। সেখানে আমি পৌঁছেছিলাম একটি জার্মান মিডিয়ার তরফে। সেসময় বেন আলির শাসন। হীরক রাজার দেশের মতো লেগেছিল ফরাসি প্রভাবিত তিউনিসিয়াকে। বেন আলি লোক ভালো নাকি খারাপ সেই প্রসঙ্গে যাব না। কিন্তু সেদিন তিনি অতি যত্নে একটি মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছিলেন গোটা বিশ্বের সমস্ত ফ্রি অ্যান্ড ওপেন সোর্স সফ্টঅয়্যার সংস্থার জন্যে। ওখানেই উবুন্টু, কুবুন্টু, এডুবুন্টুর সঙ্গে আমার আলাপ। যে স্টলেই যাচ্ছি সেখানেই একটি করে ফ্রি সফ্টঅয়্যার পেয়ে যাচ্ছি যেন আজব মুক্ত রহস্যময় দুনিয়া। শুধু কি তাই সেখানে একটি ফিনল্যান্ডের সংস্থা ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রোটোকলের মারফত আমার সঙ্গে আজকাল দফতরের সিদ্ধার্থ দার কথা বলিয়ে দিয়েছিল। একটি দিনারও খরচ করতে হয়নি।

কার্থেজ সভ্যতার ধ্বংসস্তূপের খুব কাছেই সাদা তাঁবুর সেই বিশাল সেমিনার হল আমার আজও মনে আছে। সেখানে এসেছেন নিকোলাস নেগ্রোপন্টে। মিশিগান ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির মিডিয়া ল্যাবের তিনিই প্রবক্তা এবং প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু তার থেকেও তাঁর বড় পরিচয় তিনি প্রতিটি শিশুকে একটি করে ল্যাপটপ দেওয়ার মহান উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আফ্রিকার নিরন্ন মানুষের কাছে তিনি নিয়ে যেতে চেয়েছেন প্রযুক্তি, ইন্টারনেট, কম্পিউটার। যেন সেই জানলা দিয়েই আসবে বেঁচে উঠবার আলো। সেদিন একদলের হাতে প্রযুক্তি আছে, আরেক দলের হাতে প্রযুক্তি নেই, এই পার্থক্যই অনতিক্রম্য ছিল। ১০০ ডলারে একটি ল্যাপটপ গরিব আফ্রিকার একটি শিশুর হাতে তুলে দেওয়ার কী অদম্য আগ্রহ ছিল নেগ্রোপন্টের, সেদিন সেটা টের পেয়েছিলাম। আমি এবং ভিয়েতনাম থেকে আসা এক মহিলা রিপোর্টার লওয়ান কোয়াং দুজনে নেগ্রোপন্টের সঙ্গে আলাদা করে দেখা করি। কথা হয়। আমাদের অতি আগ্রহে তিনি চালিয়ে দেখালেন তাঁর সেই স্বপ্নের ১০০ ডলারের ল্যাপটপ। পুরোটাই প্রোগ্রাম করা। অপরিচিত অপারেটিং সিস্টেম। জানলাম অপারেটিং সিস্টেমটি ফ্রি অ্যান্ড ওপেন সোর্স। কোফি আন্নানকে সঙ্গে নিয়ে ডিজিটাল ডিভাইড দূর করার প্রতিশ্রুতি নিচ্ছিলেন নেগ্রোপন্টে মানবতার শত্রু হিসেবে পরিচিত বেন আলির আতিথেয়তার মঞ্চে দাঁড়িয়ে। কি অনির্বচনীয় সমাপতন।

সেদিনের সেই উদ্যোগে আফ্রিকার শিশুরা কতটুকু উপকৃত হয়েছে তা নিয়ে তুমুল তর্ক চলতেই পারে। কিন্তু উদ্যোগের প্রশ্নে নেগ্রোপন্টের ইচ্ছেটা তর্কাতিত সুন্দর ছিল।

আর এই ফ্রি এন্ড ওপেন সোর্স আন্দোলনের প্রধান মুখ হিসেবে সেদিনও যেমন ছিল আজও তেমনি উজ্জ্বল ব্র্যান্ড Mozilla Firefox। শুধু ব্রাউজিং প্লাটফর্ম নয়। মোজিলা গোটা বিশ্ব জুড়ে তৈরি করেছে FOSS নিয়ে সচেতনতা। এই আন্দোলনে সামিল হতে Mozilla বিশ্বের তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করছে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশে, সব শহরেই ছড়িয়ে গিয়েছে Mozilla Community। ভারতেও রয়েছে স্বেচ্ছাসেবীর বিশাল নেটওয়ার্ক। বাদ নেই কলকাতাও। এই শহরের ইউনিট Mozilla Kolkata Community (MKC)-র নেতৃত্বে সম্প্রতি তিলজলা বস্তির একটি স্কুলে হয়ে গেল #OneWeb নামে তাদের ওয়ার্কশপ।

রণদীপ সাহা, শহিদ আলি ফারুকি, অয়ন চৌধুরিরা তিন মাসে এক লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছনোর ধনুক ভাঙা পণ করেছেন। এই শহরের অলি গলি ঘেঁটে বস্তির বাচ্চাদের এবং মহল্লার মহিলাদের শেখাবেন ইন্টারনেটের ক্ষমতা। ইন্টারনেটকে পৌঁছে দেবেন সেই সব ঘরে যেখানে সিইএসইর আলো হয়তো পৌঁছয় কিন্তু তার থেকেও বেশি জমাট বেঁধে থাকে অশিক্ষার অন্ধকার। আকাশ ভেঙে জল নামলে ঘরে চৌকির নীচে ত্রিনয়ন মাছ খেলা করে। তাঁদের ঘরে ইন্টারনেটের মুরোদ বোঝানোর কাজটা করবেন ওঁরা। এই কঠিন চ্যালেঞ্জটা নিয়ে ফেলেছে মোজিলা কলকাতা কমিউনিটি। ওদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছে কলকাতার বেশ কিছু স্টার্টআপ। যেমন, Tiljala Shed, Theorex, Connect India, Social Bong, Friends fm, Ip Mall, Campus Karma, The Anon Production, Izifiso, Calcuatta Instagrammers এবং Daily Mirage -এর মতো সংস্থা।

৩ জুলাই ছিল #OneWeb এর প্রথম ওয়ার্কশপ। তার আগের দিন রাত থেকে বৃষ্টি ছিল। সকাল থেকে আকাশের মুখ কালো ছিল। চলছিল ঘ্যানঘ্যানে বৃষ্টি। সেসব উপেক্ষা করেই তিলজলা শেডের স্কুল ঘর ভরে গিয়েছিল উৎসাহে উদ্দীপনায় আর সমাজ বদলের মহান ব্রতে। 

হাজির হয়েছিল স্থানীয় বস্তির এক দল বাচ্চা। সময়ের আগেই পৌঁছে গিয়েছিলেন স্বেচ্ছাসেবীর দল। স্টার্টআপ উদ্যোগপতিদের মধ্যে এসেছিলেন আর বি আর্টএফএক্সের প্রতিষ্ঠাতা রিয়া ব্যানার্জি, আই পি মলের প্রতিষ্ঠাতা অশ্রুজিত বসু, ডেইলি মিরাজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা অর্পিতা দেব, এসেছিলেন সোশ্যাল বং সংস্থার কর্ণধার ইন্দ্রজিত লাহিড়ী, ইনস্ট্যান্ট রাইডের প্রধান অরব খান, ছিলেন কানেক্ট ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা শুভাশিস চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। আর যারা ইন্টারনেট শিখতে এসেছিল সেই সব শিশুদের জন্যে পরিস্রুত পানীয় জল নিয়ে হাজির ছিলেন অগস্ত্য বয়েন্ট সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা প্রান্তিক সিনহা।

সংগঠনের প্রধান আহ্বায়ক রণদীপ সাহা আমায় আমন্ত্রণ জানান। আর বলেন ওঁদের উদ্দেশ্যের কথা। নেগ্রোপন্টের ছায়া দেখতে পেলাম রণদীপদের উদ্যোগে। বলছিলেন, খুব শিগগিরই গোটা কলকাতা ওয়াইফাই শহর হয়ে যাবে। বছর খানেকের মধ্যেই শহরের ৩৯ টি জায়গায় এবং ১৪ টি মেট্রো স্টেশনে একদম মুফতে ওয়াইফাই ব্যবহার করবে কলকাতা। অথচ কলকাতার বস্তির আবাল বৃদ্ধ বণিতা এখনও জানেনই না কীভাবে ব্যবহার করতে হয় দুনিয়ার এই শক্তিশালী অস্ত্রটিকে। গোটা দেশ যখন ডিজিটাল হওয়ার প্রচার করছে। ভোটের ময়দানে গলার শিরা ফোলাচ্ছেন রাজনীতিবিদরা। তখন দরিদ্র মানুষ ডিজিটাল ডিভাইডে পড়ে আছে। ইন্টারনেট ডিভাইডে মুখ লুকিয়ে আছে। এই ডিভাইডই দূর করতে রণদীপদের #OneWeb উদ্যোগ। রণদীপ বলছিলেন, গণতন্ত্রের প্রধান উপাদান মানুষ। কিন্তু মানুষ যদি শিক্ষিত না হয় তাহলে সেই দেশের গণতন্ত্রও অসফল থেকে যাবে। আমাদের দেশের পরিসংখ্যান বলছে ৭১ শতাংশ ভারতীয় নিজের নাম লিখতে এবং পড়তে পারেন। বাকিরা পারেন না। আর আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যাটা ৬৪ শতাংশের কিছু বেশি। তার মানে ১০০ জনের মধ্যে ৩৬ জন নিজের নাম লিখতে পড়তে পারেন না। তারা থাকেন মাথা নোয়ানো বস্তিতে। অসুস্থ একটি ইকোসিস্টেমে দিন আনেন দিন খান। গণতন্ত্র, পরিবর্তন, উন্নতি, নির্বাচন সবই তাঁদের কাছে মুচকি হেসে  গামছায় মুখ মুছে ফেলার মতো প্রহসন। রণদীপদের #OneWeb এই শ্রেণির মানুষের হাতে ইন্টারনেটের অস্ত্রটি তুল দিতে চায়।

ফলে টের পেলাম গণতান্ত্রিক ভাবে ক্ষমতায়নের প্রক্রিয়া প্রয়োগ করার কাজটা শুরু হয়ে গেছে কলকাতায়। এবার দ্রুতই তিনমাসে লক্ষ মানুষকে সত্যিকারের ক্ষমতা দেবে এই একঝাঁক তরুণ। এও একরকম গ্লাসনস্ত, এও একরকম মুক্ত করার লড়াই, স্বচ্ছতার মিশন। কিন্তু বাজারের প্রথা ভেঙে সামাজিক এ এক অন্য রাজনীতি।

Related Stories