আসছে বছর ফিল্ম রান্নায় মন দেবেন শেফ রণবীর

1

২০১৭ টা দারুণ গিয়েছে সেলেব্রিটি শেফ রণবীর ব্রারের। আসছে বছর সিনেমা রান্নাটা শিখবেন ব্রার। বলছিলেন মাথার ভিতর ফিল্ম মেকিং ঘুরছে। খুব অল্পবয়স থেকেই টিভির পর্দায় পরিচিত মুখ। হোটেল ম্যানেজমেন্ট পাশ করে বেরিয়েই চাকরি আর তার পাশাপাশি টিভি শো। রাতারাতি রণবীরকে সেলেব্রিটি বানিয়ে দিয়েছে। মাত্র পঁচিশ বছর বয়সেই তাজের একজিকিউটিভ শেফ হয়েছেন। কলকাতা সহ দেশের বিভিন্ন শহরে নিজের রেস্তোরাঁ আছে। আর কী চাই! এবার ফিল্ম মেকিং শিখবেন। নিউইয়র্কে ফিল্ম এডিটিং কোর্স করতে চান রণবীর। সিরিয়াসলি ফিল্ম বানানোর কথা ভাবছেন। নানা জায়গা থেকে শেখার চেষ্টা করছেন। কাজ চালানোর মত কাজটা শিখেই ফেলেছেন নিজের আগ্রহে। কিন্তু নিজের জীবন থেকে শিখেছেন যে শেখার কোনও বিকল্প হয় না।

এই রান্নাবান্নার কথাই ধরুন না কেন, ব্রার রান্না করতে ভালো বাসতেন নিজে ঘুরে ঘুরে নানান জায়গায় রান্না শিখেছেন, কিন্তু হোটেল ম্যানেজমেন্টের কোর্স করতে এসে শিখেছেন জীবনের মোক্ষম শিক্ষা। কিন্তু সেসব সহজ ছিল না। বাবা মাকে রাজি করাতেই কম লড়াই করেননি। বলছিলেন নিজের সেই ছোটবেলার গল্প।

লখনৌয়ের ছেলে। জন্ম আর শৈশব কেটেছে নবাবজাদাদের শহরে। বাড়িতেও নবাবজাদার মতোই ট্রিটমেন্ট পেতেন। সকলের আদরের রণবীর। রোববার করে রোজকার রুটিন ছিল দাদুর হাত ধরে গুরু-দোয়ারা যাওয়া। তখন বয়স কত হবে পাঁচ কি ছয়। সেই তখন থেকেই লঙ্গরখানার ভিতর যে বিশাল কর্মকাণ্ড চলত তাই ওকে বেশি টানত। হা করে রান্না দেখতেন। তারপর একটু একটু করে কড়াইশুঁটি ছুলে রান্নার সাহায্যও করতে শুরু করেন। ওর যখন বয়স বারো তেরো, একদিন লঙ্গরখানার দায়িত্বে থাকা প্রধান সেবক ওকে ডেকে বলেন আজ বরং তুমিই আমাদের মিঠে চাউল রেঁধে খাওয়াও।

চ্যালেঞ্জটা নিয়ে ফেলে ছেলেটা। ওর রান্না খেয়ে আঙুল চেটে কূল পান না গুরুদোয়ারার অতিথিরা। রান্নায় সেই হাতেখড়ি।

রণবীরকে এখন কে না চেনে। টিভির পর্দায় শেফ হিসেবে পরিচিত মুখ। পাঁচতারা হোটেলের তারকা শেফ। ৩৮ বছর বয়সে বেরিয়ে গেছে দু দুটি বই। সতেরো বছর বয়সেই রণবীর বুঝতে পারেন বাড়িতে এবং প্রতিবেশীদের বাড়িতে যা রান্না হয় তার থেকে আরও অনেক বেশি কিছু রোজ হতে পারে।

খেতে যে খুব ভালোবাসতেন তা নয়, কিন্তু সব রকমের খাবার চেখে দেখার ইচ্ছে হতো ছোটবেলা থেকেই। আর তার থেকেও বেশি ইচ্ছে করত মন মাতানো সব রান্না করার কৌশল শিখতে। লখনৌয়ের বিরিয়ানি, কাবাব থেকে শুরু করে তন্দুরির নানান পদ কীভাবে রান্না হয় তাই দেখতে খাবারের গলিতে ঘুর ঘুর করতেন। হরেক কিসিমের পদ রান্না করা শিখেও নিলেন শুধু দেখে দেখে। জানার আগ্রহের সুতো বেয়ে ইতিহাসের পাতায় পাতায় ও কম ঘোরেননি। গিয়েছেন বয়স্ক রাঁধুনিদের কাছে। জেনেছেন নানান পদের নানান কিসসা। এভাবেই খাবারের জগতে বাঁধা পরে যান জুনিয়ার ব্রার। বাবা—মাকে যখন ইচ্ছের কথাটা বলতে যান তাঁরা তখন রীতিমত তেলেবেগুনে। রান্নার প্রতি তার টান মার চোখে পড়ে ছিল আগেই কিন্তু সে যে ছেলের পেশা হতে পারে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না বাড়ির বড়রা।

মন কষাকষি করেই রণবীর জোর জবরদস্তি একটি কাবাব-ওয়ালার দোকানে রান্নার কাজে হেল্পর হিসেবে ঢুকে পড়েন। ইন্টার্নশিপও বলতে পারেন। তখন বয়স কত হবে সতের কি আঠারো। আট নয় মাস ধরে এসব চলে। বাবা মা ফাইনালি নতি স্বীকার করে ছেলেকে ভর্তি করিয়ে দেন লখনৌয়ের একটি হোটেল ম্যানেজমেন্ট ইন্সটিটিউটে।

লাইনে চলে আসে ব্রারের গাড়ি। পড়াশোনা শেষ করে চাকরি। আমেরিকা, সিঙ্গাপুর, কানাডার নানা হোটেল রেস্তোরাঁয় কাজ করেছেন। তাজ গ্রুপে তাঁর উত্থান চোখেপড়ার মত। অল্প দিনেই এক্সিকিউটিভ শেফ হন।

পাশাপাশি ডাক পান টিভি শোতে। সঞ্জীব কাপুরের পর আরও একজন পাঞ্জাবি শেফ টিভির পর্দায় বেশ মানিয়ে যায়। The Great Indian Rasoi, Ranveer's Café এর অ্যাঙ্কর MasterChef India সিজন ফোর এর বিচারক রণবীর ফারহান আখতারের শো I Can Do That-এও অংশ নেন। লিখে ফেলেছেন Come Into My Kitchen এবং সদ্য প্রকাশিত আরও একটি বই A Traditional Twist। কেরল, কলকাতা, রাজস্থান নানা জায়গার ট্র্যাডিশনাল রেসিপি পাওয়া যাবে এই বইতে।

ধীরে ধীরে নিজের রেস্তোরাঁ খোলার ইচ্ছে জমা হতে থাকে মনের কোণে। মুম্বাইয়ের কমলা মিলে নিজের নামে খুলে ফেলেছেন সম্পূর্ণ নিরামিষ রেস্তোরাঁ। কলকাতায় তাঁর রেস্তোরাঁ ‘আফরি তাফরি’ ইতিমধ্যে বেশ জনপ্রিয়। আরও একটা ছোট রেস্তোরাঁ খোলার ইচ্ছে আছে কলকাতায়। সেটা হবে বাঙালি খানার রেস্তোরাঁ। বাঙালিকে বাঙালি খানা খাওয়ানোর একটা চ্যালেঞ্জ নিতে চান এই পাঞ্জাবী শেফ।

তিরিশের কোঠাতেই সাফল্যের তুঙ্গে পৌঁছে ব্রার বলছেন, ওপর থেকে ঠাহর করা যায় না ঠিকই কিন্তু জানবেন সেলেব্রিটিই হন আর রোল সেন্টারের রাঁধুনি, রান্না মানে পেঁয়াজ কাটা থেকে রান্নাঘর পরিষ্কার করা, মসলা বাটা সবকিছু হাসি মুখে ভালোবাসার সঙ্গে করতে হয়। ভালোবাসা না থাকলে কোনও কাজই সম্ভব নয়। আর ভালোবাসা থাকলে যেকেউ যা কিছু বনে যেতে পারেন। এমন কি ফিল্মমেকারও।