মেটাল ডাস্টে জয়ন্তর সৃষ্টিসুখের আনন্দ

0

ক্যানভাসে হৃদয়ের অনেক কথাই বলা হয়েছে। টেরাকোটাতেও এসেছে ক্লান্তি। সৃজনশীল মন খুঁজছিল নতুন কিছু। সেই অচেনা পথে মেটাল ডাস্ট, ফ্লাই অ্যাশ, ডিমের খোসার গুঁড়ো বা সুড়কি হয়ে ওঠেছিল এগিয়ে চলার সঙ্গী। এসবের মেলবন্ধনে সৃষ্টি হতে থাকে অনিন্দ্যসুন্দর সব ভাস্কর্য। ছাঁচে ফেলে রেডিমেড নয়, নানারকম গুঁড়োকে বাগে এনে চাহিদামতো মূর্তি এবং শো পিস তৈরি করেন জয়ন্ত দাস। উত্তর ২৪ পরগনার নিমতার এই ভাস্কর নতুন পথে রীতিমতো সাড়া ফেলেছেন। পসার কোথাও নিয়ে গেলে কয়েক দিনেই সব বিক্রি। ভিন রাজ্য থেকে নিয়মিত ডাক আসছে।

রং, তুলি ছাড়া জীবন একসময় তাঁর কাছে অপূর্ণই ছিল। ছেলেবেলা থেকে যৌবনে এসে ছবি এঁকে আর তেমন মনের খোরাক পাচ্ছিলেন না জয়ন্ত দাস। ঝুঁকলেন টেরাকোটার কাজে। মাটির সৃষ্টি মন্দ না লাগলেও এর ভঙ্গুরতা ভাবিয়েছিল তাঁকে। এরপরই জীবন বদলের গল্প। স্বশিক্ষিত শিল্পী ভাবতে থাকেন এমন কিছু করতে হবে যা সহজে ভাঙবে না, আবার চিত্তাকর্ষক ‌হবে। সেই ভাবনা থাকেই নানারকম গুঁড়ো দিয়ে শুরু হয় শিল্পকর্ম। গুঁড়োর সঙ্গে কিছু রাসায়নিক এবং আঠা মেশানোর পর তাঁর চিন্তার মতোই জমাট হতে থাকে বিভিন্ন ভাস্কর্য। আঙুলের নিপুণ ছোঁয়ায় একে একে তৈরি হতে থাকে গণেশ, নানারকম প্রাণী থেকে শুরু করে কত ধরনের শো পিস।

রং অন্যরকম, দেখতেও আলাদা। জয়ন্ত দাসের এই শিল্পকর্ম দ্রুত সমঝদারদের মন জয় করে নেয়। এতটাই চাহিদা যে নিজে সব করে উঠতে পারেন না শিল্পী। সম্প্রিত কাঁকুরগাছির একটি প্রদর্শনীতে মাত্র চার দিনেই তাঁর লক্ষাধিক টাকার সামগ্রী বিক্রি হয়েছে। নিজেই সব দেখেন। সাধ্যমতো স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে সাহায্য করেন। মেলা, প্রদর্শনীতে রোজগারের বাড়তি পথ খুঁজে পেয়েছেন তিনি। আর এসবের সুবাদে বিভিন্ন জায়গা থেকে ডাক আসতে শুরু করেছে। অন্ধ্র প্রদেশ, দিল্লি, মুম্বই খোঁজ নেয় তাঁর শিল্পকর্ম। ওইসব এলাকার একাধিক সংস্থায় নিয়মিত নিজস্ব ভাবনার শিল্পকর্ম পৌঁছে দেন শিল্পী।

ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার পিছনে রয়েছে অনেক জেদ, ত্যাগের কথা। অভাবী পরিবারে বড় হয়ে ছোট থেকে জয়ন্তবাবু চ্যালেঞ্জটা নিতে শিখেছিলেন। ছেলেবেলায় টাকা দিতে না পারায় আঁকার শিক্ষক তাঁকে আঁকতে আসতে বারণ করেন। বাড়ি ফিরে ফেলা চোখের জলই কিছু করে দেখানোর ক্ষমতাটা নিঃশব্দে তৈরি করে দেয়। শিল্পীর কথা‌য়, ‘‘মাস্টারমশাইয়ের কাছে দাদা বারবার আঁকতে যাওয়ার কথা বললেও আমি যেতে চাইনি। ঠিক করেছিলাম মনের এই আগুন সৃষ্টির মাধ্যমে তুলে ধরতে হবে।’’ এরপর রং, তুলি হয়ে ওঠে হাতিয়ার। তারপর টেরাকোটার পথ ঘুরে গত ৯ বছর ধরে এই ‘ধুলো’ মাখা জীবনে। যে কোনও ধরনের মূর্তি তৈরি করতে বললে কয়েক মুহূর্তেই তা করে ফেলেন জয়ন্ত দাস। নিমতায় নিজের বাড়িরতে কাজ করতে করতে বলেন, ‘‘নতুন কাজ যেভাবে সবাই সাদরে গ্রহণ করেছে তাতে মনে হয় ভুল পথ ধরিনি। তবে আরও অনেক দূর যেতে হবে।’’ শিল্পী মনে করেন এধরনের কাজে প্রচুর ধৈর্য দরকার। প্রচুর আগ্রহ থাকলেও মান ধরে রাখতে বেশি তাড়াহুড়়ো করেন না। এই উদ্ভাবনী যে কাউকে ভাগ করার নয়!