চ্যালেঞ্জের নাম শোভনা কর্মকার

0

‘নিগ্রো’ বলে একসময় তাঁকে চরম নিগ্রহ সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু তাতে হেরে না গিয়ে জীবনটাকে অন্য খাতে চালিত করেছেন ২৫ বছরের এই মেয়ে। চ্যালেঞ্জের নাম শোভনা কর্মকার। স্কুলে যাঁকে ‘নিগ্রো’ বলে অপমানিত হতে হত, সেই শোভনা নিজের কাছে নিজেই যেন এক চ্যালেঞ্জ। শোভনা আজ মুম্বইয়ের একজন বিশিষ্ট ফটোগ্রাফার। প্রতিষ্ঠিত হলেও সংঘর্ষ তাঁর থামেনি।

শোভনার জন্মস্থান উত্তরপ্রদেশ। মা আফ্রিকাবাসী এবং বাবা বাঙালি।বাবার চাকরির জন্য কখনও মধ্যপ্রদেশ, কখনও উত্তরপ্রদেশে থাকতে হয়েছে তাঁদের। মাত্র দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করতে পেরেছিলেন শোভনা। তারপর নিজের পড়াশুনা ছাড়তে বাধ্য হন। গোলাপী ঠোঁট দুধে আলতা রঙের দুনিয়ায় তিনি ছিলেন বেমানান। বর্ণবৈষম্যের শিকার শোভনা লাঞ্ছনা আর সহ্য করতে পারছিলেন না। জীবনটাকে অন্য খাতে নিয়ে যেতে চাইছিলেন। সেদিনকার সিদ্ধান্ত ভুল নেননি শোভনা, আজ তিনি মুম্বইয়ের একজন সফল ফটোগ্রাফার। সেই শহর, যা ভারতের গ্ল্যামার দুনিয়ার কেন্দ্রস্থল।

কিন্তু বাবা মায়ের স্বপ্ন ছিল অন্য। বাবা চেয়েছিলেন, মেয়ে ডাক্তার হোক। মায়ের স্বপ্ন ছিল মেয়ে হবে ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু এর মধ্যে কোনওটিই শোভনাকে আকৃষ্ট করত না। সে তার নিজের ঘরের দেওয়ালে রঙের খেলা খেলত। বিভিন্ন অ্যানিমেশন তাঁকে আকৃষ্ট করত। ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ডিজাইন’-এ শোভনা ভর্তি হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তা কার্যকরী হয়নি। এর পর পুনের ডিজাইন কলেজ ‘এমআইটি’-তে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু সেখানেও নতুন কিছু শিখতে পারছিলেন না। তাই সেটিও ছেড়ে দেন। তারপর শান্তিনিকেতনের কলাভবন। এখানেই নিজের স্বপ্নকে সত্যি করে তোলায় মন দিলেন শোভনা।

এই পথ চলতে গিয়ে প্রথমেই যেটা দরকার পড়ল সেটি একটি ক্যামেরা। তখনও পর্যন্ত মেয়ের কার্যকলাপ ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না বাবা। ক্যামেরা কিনে দেন তিনি। শোভনার জীবনের প্রথম ক্যামেরা ক্যানন থাউসেন্ড ডি। সেই নিয়েই তিনি শুরু করলেন শান্তিনিকেতনের ছবি তোলার কাজ। সেই সঙ্গেই অনলাইনে বিভিন্ন মানুষের পোট্রেট দেখতে শুরু করেন। তার মধ্যে উদ্বুদ্ধ হন অ্যানা গে কে দেখে।যিনি নিজেরই পোট্রেট তুলেছেন ৩৬৫টি। 

শোভনা অবাক হন, কী ভাবে একজন মানুষ নিজেরই এতগুলো পোট্রেট তুলতে পারে! অ্যানা গে’র পদাঙ্ক অনুসরণ শুরু করে সে। প্রথমে বেশ ভয় পেয়েছিলেন । আবার যদি সেই কথাগুলি শুনতে হয়। আত্মবিশ্বাসই শোভনাকে মনের জোর দেয়। ইতিমধ্যে ওজন কমিয়ে ফেলেন ২০ কিলো। তিনমাস এভাবেই নিজের ছবি অনলাইনে পোস্ট করা শুরু করেন। এক সময় শোভনার যে পুরুষবন্ধুটিও শোভনার মুখশ্রী নিয়ে কটু কথা শুনিয়েছিলেন শোভনার অনলাইন পোট্রেট দেখে সেও অভিভূত হয়ে যান। অনলাইনে পোট্রেট পোস্ট করার সময় শোভনা বুঝেছিলেন ফটোগ্রাফিই তাঁর জীবনে সবচেয়ে বড় ‘বন্ধু’। যা তাকে রোজদিন নতুন কিছু করে দেখতে শেখায়।

তাঁর পোট্রেট দেখেই মুম্বইয়ের বিখ্যাত ফটোগ্রাফার রিতম ব্যানার্জি, শোভনাকে ডেকে পাঠান। তখন শোভনা দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশুনা করছেন। একমাস রিতম ব্যানার্জির কাছে ইন্টার্নশিপ করে ফিরে আসেন শোভনা। নিজের পড়াশুনা শেষ করে ২০১৩ সালে মুম্বইয়ে ফিরে যান। তারপর শুরু হয় নিজের কেরিয়ার তৈরির কঠিন লড়াই সাফল্যের পাহাড় চড়ার পালা। খাদ্য, পোশাক, গয়না, কর্পোরেট, থ্রি-ডি ফটোগ্রাফি, মোশন ফটোগ্রাফি সর্বত্রই নিজের কাজের ছাপ রাখতে পেরেছেন শোভনা। রিতম ব্যানার্জির সহায়তায় শোভনা নিজেকে আরও দক্ষ করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন ক্রমাগত। ইন্ডাস্ট্রিতে আরও বেশি করে জমিয়ে বসার পর তার ইচ্ছে তিনি একটি শিশুর দায়িত্ব নেবেন। তাঁকে মানুষের মতো মানুষ করে তুলবেন।