ডিজাইনের রাশিতে মন ভরাচ্ছে Speaking Walls

1

বাজারের বাজি চোখ ধাঁধানো ডিজাইন। যেখানেই যান, আপনার টোখ টানবে বাহারি রঙ আর হরেক ডিজাইন। গ্রাহকের চাহিদা বুঝে সেটাকেই পুঁজি করছেন ব্যবসায়ীরা। ডিজাইনই নতুন ট্রেন্ড। স্টাইল স্টেটমেন্ট। চড়া রঙের গ্রাফিক্যাল টি’স হোক অথবা গ্রাফিক নভেল বা বছর বছর কমিককনে দর্শনার্থীর বাড়তে থাকা ভিড় বুঝিয়ে দিচ্ছে ডিজাইন ক্রেজ কতটা বাড়ছে প্রতিদিন। হ্যাপিলি আনম্যারেড, পোস্টারগালি অথবা চুম্বক ক্রেতা টানে সেই চোখ ধাঁধানো ডিজাইন মন্ত্রে। যারা এই রং বাহারি ডিজাইন নিয়ে আসছে তেমনই একটি ছোট্ট স্টার্টআপ গ্রাফিক সংস্থা Speaking Walls।

এনআইটি শিলচরের ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ফোর্থ ইয়ারের তিন পড়ুয়া শ্রেয়া দালেলা, ইপ্সিতা বিশ্বাস আর অরূপ দত্ত। তাদের সঙ্গে জুটে গিয়েছিল এক প্রাক্তনী নীতিশ রাজপুরোহিত। সেই সময় ইপ্সিতারা দেখতেন দারুণ দারুণ ইউনিক ডিজাইনের সব পোস্টার নিজেদের শহর বা গ্রাম বা এলাকা থেকে নিয়ে হাজির হত তাদেরই বন্ধু বান্ধবরা। আর সেই পোস্টারগুলির ক্রেজ ছিল মারাত্মক। সেই দেখেই নতুন আইডিয়া চেপে যায় তিন পড়ুয়ার মাথায়। ঠিক করে ফেলেন কলেজেরই গ্রাফিক ডিজাইনারকে দিয়ে পোস্টার ডিজাইন করবেন নিজেরা। গ্রাফিক ডিজাইনে ততদিনে অল্প বিস্তর হাত পাকিয়ে ফেলেছেন কলেজেরই প্রাক্তনী নীতিশ। ইপ্সিতা, অরূপ আর শ্রেয়াদের দলে ভিড়ে যান। শিগগিরই দলের ভরসা হয়ে ওঠেন। ২০১৪র ফেব্রুয়ারিতে তাঁদের হাত ধরে জন্ম Speaking Walls।

‘প্রথমে কলেজের সহপাঠীদের জন্য ফেসবুক স্টোর হিসেবে Speaking Walls শুরু করি। ধীরে ধীরে বুঝতে পারি একটু হটকে পোস্টার ডিজাইনের ভালো কদর রয়েছে পড়ুয়াদের মধ্যে। অল্প সময়ের মধ্যে প্রচুর অর্ডার পেয়ে যাই। শুধু প্রথম দিনই ২০ টা অর্ডার পেয়েছিলাম। অনলাইন স্টোরটা পুরপুরি ফেসবুকের মাধ্যমে চলত। ডিজাইন ওয়ালে ছেড়ে দিতাম। আর মেসেজে অর্ডার আসত’, প্রথম অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছিলেন শ্রেয়া।

ফেসবুক পেজ খোলার একমাসের মধ্যে অর্ডারের বন্যা বয়ে যায়। কলেজ ছাড়িয়ে বাইরেও ডেলিভারি দিতে পারবেন কিনা তেমন মেসেজও আসতে থাকে। ‘সেই সময় আমাদের Amazon Store নিয়ে আসি। কীভাবে পণ্য গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে হবে, তার আটঘাঁট কিছুই জানা ছিল না। বন্ধুরাই প্যকেজিংয়ে সাহায্য করে দিত। যেহেতু নীতিশ ওই সময় কেলেজর প্রাক্তনী ছিল, তাই সব দৌড়ঝাঁপ ও একাই নিজের কাঁধে নিয়ে নিয়েছিল, যাতে আমরা সময়মতো ক্লাস করতে পারি’, যোগ করেন শ্রেয়া।

Amazon Store টা যখন শুরু করেন ৪ বন্ধুর কোনও ধারনাই ছিল না কতটা অর্ডার পেতে চলেছেন। কোনও কিছু না বুঝেই বেশ অনেকটা টাকা বেশি দিয়ে ৩৩ টাকা ভাড়ায় পণ্য নির্দিষ্ট জাগায় পাঠাবেন ঠিক করে নেন। প্রায় অর্ধেক দামেও যে কাজটা করা যায় কোনও ধারনাই ছিল না চার জনের কারও। ‘এখন সব শিখে নিয়েছি। আগের থেকে অনেক বেশি চটপট আর দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছি’, বলেন শ্রেয়া।

যেমন সহজে শ্রেয়া বলছেন, রাস্তাটা ততটা সহজ ছিল না। শ্রেয়া নিজেই জানান, ‘নেট থেকে ছবি নামিয়ে ডিজাইন করার ক্ষেত্রে কপিরাইট ইস্যু বোঝা বেশ মুশকিল। অনেক লাইসেন্স পড়ে বুঝতে হত শুধুমাত্র পাবলিক ডোমেনে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য ছেড়ে দেওয়া ছবিগুলিই নেওয়া সম্ভব। আমাদের ছোট্ট দলে আরও ডিজাইনার আসার পর এবার আমরা নিজেদের কিছু মৌলিক ডিজাইন করে ফেলি ঝটপট’।

আগেই যেমন বললাম, শুরু করার কয়েক মাসের মধ্যে অর্ডারের বন্যা বইতে লাগল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডিজাইন ব্যবহারের ক্ষেত্রও বাড়তে থাকল ধীরে ধীরে। পোস্টার থেকে ফটোবুক, গ্রিটিংসকার্ড এবং আর্টওয়ার্কের মেল সাবস্ক্রিপশানে ছড়িয়ে পড়ল। ‘আমাদের মনে হতে লাগল মানুষকে উৎসাহ দিতে ডিজাইনের জুড়ি মেলা ভার। তাই কাজের মধ্যে আরও নানা দিক নিয়ে আসার চেষ্টা করলাম। ডিসেম্বরে নিজেদের ওয়েবসাইট নিয়ে আসি। তখনই মোহিত আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। ওয়েব ডেভেলপমেন্টটা দিকটা ওইই দেখে দিচ্ছিল’, বলেন শ্রেয়া।

‘২০১৫র জানুযারিতে Speaking Walls এর ওয়েবসাইট লঞ্চ হয়। একমাসের মধ্যে গড়ে ৪০টি করে অর্ডার পড়ে। যখন Amazon Store পুরনো হয়ে গেল, গড়ে প্রতিদিন সখান থেকে ৩ হাজারের ওপর অর্ডার পাচিছলাম’, জানান শ্রেয়া।

এবার বাড়ি এবং অফিস সজ্জার দিকে নজর দেওয়ার কথা ভাবছেন শ্রেয়ারা। ‘টি’স দিয়ে শুরু করেছিলাম, বেশ ভালো চলছে। আমরা ইনস্টাগ্রামের মতোও অনলাইন স্পেসও ব্যবহার করেছি আমাদের প্রোডাক্টের মার্কেটিং এর জন্য। সেখানেও প্রচুর গ্রাহক পাই যারা আমাদের ওয়েবসাইটে ক্লিক করেছেন’, জানান শ্রেয়া।

‘যে কোনও জায়গায় নিজেদের করা ডিজাইন নিয়ে হাজির হওয়ার চষ্টা করছেন শিলচর এনাইটির তিন পড়ুয়া। তাঁদের যোগ্য সঙ্গত দিচ্ছেন প্রক্তনী নীতিশ। ‘এপ্রিলে বেঙ্গালুরুর কমিকনে একটা জায়গা পাই। সেখানেই ইন্টিরিয়র ডিজাইনের কনসেপ্টও নিয়ে আসি। পুনে এবং বেঙ্গালুরুর গিফটশপগুলির সঙ্গে টাই-আপ করে নিয়েছি। এবার একটা ডেকোরেশন হাব করার ইচ্ছে রয়েছে। সেখানে প্রকৃতির সাজে নানা সজ্জার ব্যবস্থা রাখব। আমরা ডেকোরেশন প্ল্যান দেবো, যে যে সামগ্রী দরকার হবে আমরাই জোগাড় করে দেব এবং তারপর যেখানে যেখানে পৌঁছাতে হবে যেমন ক্যাফে, স্টার্টআপ অফিস এবং কোনও ঘরের বিশেষ কোনও দেওয়াল আমাদের হাতেই অনন্য রূপ পাবে’, শেষ করলেন শিলচর এনআইটির মেধাবী ছাত্রী এবং স্টার্টআপ উদ্যোক্তা শ্রেয়া।