গ্রামীণ মহিলাদের জন্য কম মূল্যের ১০০ শতাংশ পরিবেশ বান্ধব সাথী প্যাড

0

ঋতুস্রাব, এই স্বাভাবিক শারীরবৃত্তিয় প্রক্রিয়াটি নিয়ে ছুতমার্গের শেষ নেই আমাদের দেশে। মাসিকের দিনগুলিতেও যে অন্যান্য পাঁচটা দিনের মতোই স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব সেই ধারণাই তৈরি হয়নি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের। এরই পাশাপাশি রয়েছে আর্থিক অসচ্ছলতা। পরিসংখ্যান বলছে, ভারতে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেন মাত্র ১২ শতাংশ মহিলা, বাকিদের ভরসা কাপড়ের মতো অস্বাস্থ্যকর উপায়ে। রিপোর্ট অনুযায়ী গ্রামীণ ভারতে ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী মেয়েদের অনেকেই বছরে প্রায় ৫০ দিন স্কুল যেতে পারেনা মাসিকের সময় স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার না করায়, ২৩ শতাংশ মেয়ে ঋতুস্রাব শুরুর পরই স্কুল-ছুট হয়। এছাড়াও কাপড়ের ব্যবহারের ফলে নানা ধরণের রোগের শিকার হন মহিলারা।

এদিকে বাজারে চলতি স্যানিটারি ন্যাপকিন যে বর্জ্য তৈরি করে, তা পরিবেশ বান্ধব নয়। আরও বেশি সংখ্যক মহিলা স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার শুরু করলে বাড়বে বর্জ্য, পরিবেশবিদদের একাংশ আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন এই নিয়ে।

এই সব সমস্যাগুলিকে মাথায় রেখেই কলা গাছের তন্তু থেকে সস্তা ও পরিবেশ-বান্ধব স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সাথী। ক্রিস্টিন কাগেতসু, অমৃতা সায়গল, গ্রেস কেন, আশুতোষ কুমার ও জাকারি রোস এই পাঁচজনের উদ্যোগেই শুরু সাথী।

ক্রিস্টিনের পড়াশোনা এমআইটিতে। প্রথম ভারতে আসেন একটি ফিল্ড-ওয়ার্ক প্রজেক্টের কাজে। প্রাকৃতিক ক্রেয়ন তৈরিই ছিল প্রজেক্টের উদ্দেশ্য। বরাবরই নতুন পণ্য তৈরিতে উত্সাহী ক্রিস্টিন। আগ্রহের জায়গা ইঞ্জিনিয়ারিং ও সামাজিক উদ্যোগ। “এমআইটি এই দুটোকে মেলাতে শিখিয়েছে”, বললেন ক্রিস্টিন। দ্বিতীয়বারের জন্য ভারতে আসেন উত্তরাখণ্ডের অবন্তী নামের এক এনজিওতে কয়েক সপ্তাহের জন্য কাজ করতে। সেই অভিজ্ঞতা সামাজিক উদ্যোগের জন্য কাজের আগ্রহকে উস্কে দেয়। এরপর আমেরিকায় নিজের অরাক্যালের চাকরিতে ফিরে গেলেও খাপ খাওয়াতে পারেন না। মানুষের সরাসরি কাজে লাগে এরকম কিছু একটা করার ইচ্ছে ক্রমশই জোরালো হয়।


ক্রিস্টিন কাগেতসু
ক্রিস্টিন কাগেতসু

অমৃতা সায়গল ছিলেন এমআইটিতে ক্রিস্টিনের সহপাঠী। কম মূল্যের স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরির ভাবনা অনেকদিন ধরেই মাথায় ঘুরছিল অমৃতার, সাথীর পরিকল্পনাও হয়ে গিয়েছিল, প্রয়োজন ছিল কিছু লোকের যাদের সঙ্গে প্রকল্পটা এগোনো যায়।

“নারীদের স্বাধীনতা ও ক্ষমতা-বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে আমি বরাবরই উত্সাহী. একজন মহিলা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবেও লিঙ্গ রাজনীতির স্বীকার হতে হয় বারবার”,বললেন ক্রিস্টিন।

২০১৪ সালে হাভার্ডে প্রাক্তনীদের ( হাভার্ডে এমবিএ পড়েছেন অমৃতা) জন্য আয়োজিত এক প্রতিযোগিতায় সামাজিক উদ্যোগ বিভাগে সাথীর জন্য ৫০, ০০০ ইউএস ডলার পুরস্কার পান অমৃতা ও ক্রিস্টিন।

“প্রথমে গ্রামের মহিলাদের জন্য সস্তার প্যাড বানানোই ছিল উদ্দেশ্য, কিন্তু পরে পরিকল্পনাতে পরিবর্তন আনা হয়। আগাগোড়া না ভেবে কোনও পণ্য বানানো উচিত নয়। ভাবতে হয় পণ্যের পুরো জীবনচক্রটি নিয়ে। ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া পণ্যের বর্জ্যর দিকটি খেয়াল রাখা খুবই জরুরি। নাহলে অন্যান্য প্যাড প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে আমাদের পার্থক্যই বা কী! মাত্র ১২ শতাংশ মহিলার স্যানিটারি ন্যাপকিন থেকে উত্পন্ন হয় ৯০০০ টন বর্জ্য। বাজারে যেসব প্যাড পাওয়া যায় সেগুলি তৈরি হয়ে শোষণ ক্ষমতাযুক্ত একটি উপাদান এবং কিছু রাসায়নিক দিয়ে, এবং তা পরিবেশের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকারক, এরপর যদি আরও মহিলা তা ব্যবহার শুরু করে তাহলে অবস্থাটা কী দাঁড়াবে ভাবুন তো!” বললেন ক্রিস্টিন।

কম দামের স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরি গ্রামীণ মহিলাদের প্যাড ব্যবহারের মতো সামাজিক ইস্যুটিকে সমাধান করবে, কিন্তু পরিবেশের ইস্যুটিকেও মাথায় রাখতে চাইছিলেন ক্রিস্টিনরা। তাই নতুন উপাদান খুঁজে বের করাটা জরুরি হয়ে পড়েছিল। যাতে প্যাড গ্রামের গরীব মহিলাদের কাছে পৌঁছয়, কিন্তু পরিবেশের কোনও ক্ষতি না হয়।

সাথী তাই গ্রাম এবং শহরাঞ্চল থেকে কলা গাছের তন্তু থেকে প্যাড তৈরি আরম্ভ করে, এটিই প্রথম ১০০ শতাংশ পরিবেশ বান্ধব স্যানিটারি ন্যাপকিন। ক্রিস্টিন জানালেন, “শহরে আমরা বাকি প্যাড যে দামে বিক্রি হয় সেইরকম দামেই বিক্রি করব সাথী প্যাড, এরফলে আমরা ভর্তুকি দিতে পারব গ্রামের বিক্রিতে। ফলে আরও বহু সংখ্যক মহিলা স্বাস্থ্যকর উপায় বেছে নিতে পারবেন মাসিকের দিনগুলিতে”।

শুধু তাই নয়, কলা গাছের এই তন্তু সাধারণত ফেলে দেন কৃষকরা. আহমেদাবাদের কলা উৎপাদনকারী এলাকা থেকে কৃষকদের থেকে তা কিনে নেয় সাথী, ফলে কৃষকদেরও কিছু আয় হয়।


পরিকল্পনা রয়েছে গ্রাম ও শহরের গরীব পরিবারে মহিলাদের ট্রেনিং দিয়ে প্যাড উৎপাদনের কাজে যুক্ত করবে সাথী। ক্রিস্টিন বললেন “সাথীর স্বপ্ন হল, গ্রামীণ মহিলাদের কাছে কম মূল্যে পরিবেশ বান্ধব স্যানিটারি ন্যাপকিন পৌঁছে দেওয়া। যেসব মেয়েরা শুধুমাত্র এই কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় তাদের স্কুলে ফিরিয়ে আনা”।

এই মুহূর্তে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ একটি বড় উৎপাদন ইউনিট এবং একটি সুগঠিত সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ক্রিস্টিনের কথায়, “চ্যালেঞ্জ রয়েছে, কিন্তু আমরা তা অতিক্রম করবই। শুধু সময়ের প্রয়োজন। মূল লক্ষ্য সমস্ত গ্রামীণ মহিলার কাছে স্যানিটারি প্যাড পৌঁছনো কিন্তু তার আগে রয়েছে আরও কয়েকটি পদক্ষেপ”।