সেদিন সাহস দেখিয়ে ঠকেননি মৃন্ময় আর অভীক

0

মৃন্ময় চন্দ্র আর অভীক মজুমদারের গল্পটা অনেকটা গুপীগাইন বাঘাবাইন টাইপ। খাচ্ছিল তাঁতি তাত বুনে কাল হল এঁড়ে গরু কিনে গোছের। যেমন মৃন্ময়ের উদাহরণই দেখুন। বটানি গ্র্যাজুয়েট। একরকম বন্ধুদের সঙ্গে হুজুগে পড়ে মাস কমিউনিকেশন পড়েছেন। সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ডের ইতি টেনে হয়ে গেলেন সাংবাদিক। 

খানিকটা পরিস্থিতির চাপে, খানিকটা নিজের ইচ্ছেয় সাংবাদিকতার চাকরি বেশিদিন করা হল না। কিছু একটা করবেন বলে অনেক দিন ভাবছিলেন। সেখানেও দোনোমোনো ছিলই। মণি কাঞ্চন যোগ হল মৃন্ময়ের সঙ্গে অভীকের আলাপ হওয়ার পর। সেও এক গল্প।

২০০৬ সালে মাস কমিউনিকেশনের রেজান্ট বেরনোর আগেই ঢুকে পড়েন উত্তরবঙ্গের একটি সংবাদ পত্রে। কপি এডিটর। ২০০৭ এ ইন্টার্নশিপের সুযোগ পান একটি বাংলা নামি টেলিভিশন চ্যানেলে। তার পর চাকরি। রোজগার বাড়ানোর চক্করে চ্যানেল টেন। টাইটানিক ডুবুডুবু। চাকরি ছেড়ে ব্যবসার ইচ্ছেটা এবার রীতিমত তাগিদ মৃন্ময়ের। এই টাইটানিকেই অভীকের সঙ্গে দেখা। অভীক ছিলেন ওই চ্যানেলের গ্রাফিক্স ডিজাইনার। পোশাকী নাম অ্যাডভান্সড অ্যানিমেশন ইঞ্জিনিয়র। কথায় বলে না রতনে রতন চেনে। তেমনি মাণিকজোর। চাকরি করতে করতে দুজনেই নিজেরা একটা কিছু শুরু করার প্ল্যান করেন। কিন্তু বেশি ভাবার সময় দেয়নি চ্যানেল টেন। মৃন্ময়-অভীককে দুরুদুরু বুকে ব্যবসার আটলান্টিকে ঝাঁপটা দিয়েই দিলেন। 

শুরু করলেন নিজেদের ব্যবসা। তৈরি হল ম্যাকস ওমনিমিডিয়া। বিভিন্ন ব্যনার, ভিনাইল, ফ্লেক্স, ইন্টিরিয়র ডিজাইনিং, গ্রাফিক্স প্রেজেনটেশন সব ধরনের কাজ করে এই সংস্থা।

২০১৩র জুলাই ম্যাকস ওমনিমিডিয়ার নামে লাইসেন্স বেরয়মৃন্ময় জানান, ‘পুঁজি বলতে ছিল সাকুল্যে ২০ হাজার টাকা, অভীকের দশ, আমার দশ। আর দুজনের দুটো ব্যক্তিগত কম্পিউটার। বিভিন্ন ডিজাইনিংয়ের কাজ করব বলে স্থির করলেও, কীভাবে অর্ডার আসবে, কার কাছে যাব, কারও কোনও অভিজ্ঞতা ছিল না’। ‌যাকে বলে একেবারে শূন্য থেকে শুরু। পূর্ব পরিচিতির সূত্রে প্রথম কাজ দেন এক সরকারি কর্তা। হাওড়া সদর অফিসে নেতাজি, গান্ধিজি এবং রবীন্দ্রনাথ-এই ৩টি ছবি বাঁধাইয়ের কাজ। ২০ বাই ২৫ ইঞ্চির তিনটে ছবি বাঁধিয়ে দিয়ে ম্যাকস ওমনিমিডিয়ার পকেটে ছিল ৭৩০টাকা। সামান্য হলেও প্রথম কাজের মজাই আলাদা। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। পরিচিতি বাড়তে থাকে। চৌধুরী ডেকর ইন্টরিয়র ডিজাইনিং নামে একটি সংস্থার নানা অর্ডার পেতে থাকেন মৃন্ময়রা। সরকারি কাজের অর্ডারে প্রথম ব্রেকথ্রু বলতে হাওড়ার শরৎসদনে রাজ্যের মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প দপ্তরের সেমিনারের ভিডিওগ্রাফি, ইনভিটেশন কার্ডের বরাত। এরপর ২০১৪র জুলাইয়ে সর্বশিক্ষা মিশন হাওড়ায় শিক্ষাসপ্তাহ নামে একটি ক্যাম্পেন করে। জেলার সব প্রাইমারি স্কুলে কাঠের ফ্রেম করে ১৪০ টি ফ্লেক্স লাগানোর বরাত পান মৃন্ময়রা। ধীরে ধীরে তথ্য সংস্কৃতি দপ্তরের জেলা ভিত্তিক বিভিন্ন কাজ যেমন, কার্ড, ব্যানার, ফ্লেক্সের বরাত পেতে থাকে ম্যাকস ওমনিমিডিয়া। বিশেষ করে হাওড়া এবং উত্তর ২৪ পরগনার জেলা এবং মহকুমার সরকারি দপ্তরের অনেকগুলি ব্যানার, ফ্লেক্স তৈরির কাজ করেছেন অভীক-মৃন্ময়। ভোটের সময় ডায়মন্ড হারবারে কাউন্টিং স্টেশনে থ্রি-ডি ইমেজ তৈরি করে দেয় ম্যাকস। তাছাড়া, ডায়মন্ড হারবার প্রশাসনিক ভবনের চার তলা বিল্ডিংয়ে বিভিন্ন বিভাগের নামকরণের সাইনবোর্ড তৈরির কাজও পান এই দুই তরুন উদ্যোক্তা।

মৃন্ময় জানান, ‘জিনি অ্যান্ড জনি, রত্ন বিক্রেতা সংস্থা গীতাঞ্জলি গ্রুপ-এরা এখন আমাদের ক্লায়েন্ট। এই সংস্থাগুলির বিভিন্ন স্টোরে ফ্ল্যাক্স, ভিনাইল তৈরির কাজ করি আমরা। ২০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে দেড় বছরে টার্নওভার প্রায় ১২ লক্ষ টাকা’। বলতে গেলে ম্যাকসের এখনও সেভাবে কোনও অফিস নেই। অভীকের বারাসতের বাড়িতে চিলতে একটা ঘরে চলে ‌‌যাবতীয় কাজ। মৃন্ময়রা বলেন, ‘ঠান্ডা ঘরে বসে ব্যবসা হয় না। মাঠে নেমে বাজার যাচাই করে কাজ করতে হয়’। তবে ব্যবসা বাড়ছে। এবার একটা আরও বড় অফিস, কিছু লোক নেওয়ার কথা ভাবছেন দুই তরুণ উদ্যোক্তা। তরুণ প্রজন্ম যারা স্টার্টআপের কথা ভাবছেন তাঁদের জন্য মৃন্ময়-অভীকের বার্তা, যতটা সামর্থ্য তার বাইরে পা বাড়াতে নেই। যতটা কাজ করা যাবে ক্লায়েন্টকে ততটাই প্রতিশ্রুতি দেওয়া ভালো। তার বেশি নয়। আর ঠিক সময়ে ক্লায়েন্টের কাজ বুঝিয়ে দিতে হবে। গুন, মান, সময়জ্ঞান-এই তিন থাকলে আর পেছন ফিরে তাকাতে হবে না।