দেনা পাওনা আরও সহজ করছে সৌরভের Paydeck

কলকাতার প্রথম ফিনটেক সংস্থা Paydeck খুলে রীতিমত স্রোতের উল্টোদিকে সাঁতার কাটার চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন সৌরভ সুমন।

9
ফিনটেক সংস্থা বলতেই অধিকাংশ সময় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ই-ওয়ালেটের কথাই বলা হয়। কিন্তু আজ আপনাদের এমন একটি ফিনটেক সংস্থার কথা বলব যেটা ই-ওয়ালেট নয় বরং তার থেকে অনেক কার্যকরী একটি পরিষেবা। ছোটো মাঝারি যেকোনও ব্যবসায়ী যার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আছে এবং একটি মোবাইল ফোন কিংবা ইমেল অ্যাড্রেস আছে সে ই এই পরিষেবা পেতে পারবেন।

আর ক্রেতার জীবনও আরও সরল আরও স্মুদ হয়ে যাবে নিমেষে। সংস্থার নাম Paydeck, কর্ণধার সৌরভ সুমন। মাতৃ ভাষা মৈথিলী। কলকাতায় এসেছিলেন ২০০৩ সালে। এই তের চোদ্দ বছরে সৌরভ পুরোদস্তুর বাঙালি। IIIT তে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে আসেন কলকাতায়। বিহারের মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে ফলে টাকার মর্ম বোঝেন। কলকাতায় পড়তে পড়তেই ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ করতে থাকেন। বিভিন্ন সংস্থার জন্যে ওয়েবসাইট বানিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে এই শহরে রীতিমত টিকে থাকার জন্যে লড়াই করেন সৌরভ। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে রোজগারের সেই লড়াই করতে করতেই বিদ্যাপতির দেশ থেকে আসা এই যুবক বাংলার প্রেমে পড়ে যান। বুদ্ধিমান পরিশ্রমী মানুষের লড়াই যে সাফল্য আনে তা নিজেকে দিয়ে বারংবার দেখেছেন সৌরভ। জীবনে অনেক চোরাবালি দেখেছেন, খাদ দেখেছেন আবার মনের জোরে মাথা তুলে এগোনোর সাহসও পেয়েছেন। ২০১৬-য় তৈরি করেছেন Paydeck কলকাতার প্রথম ফিনটেক সংস্থা। ভবিষ্যতে ইউনিকর্ন হওয়ার স্বপ্ন দেখা সৌরভ বলছিলেন, কলকাতায় ব্যবসা করার অনেক বাধা, অনেক সমস্যা, কখনও কারণগুলো দেখতে পাওয়া যায় আবার কখনও কখনও সেগুলো অদৃশ্য। তবু সৌরভ কলকাতাতেই দাঁতে দাঁত চিপে লড়ে যাচ্ছেন। এবং সাফল্যও উঁকি মারছে লজ্জাবতী নববধূর মত, ঘোমটার আড়াল দিয়ে।

শুরুর একটা গল্প আছে। কীভাবে শুরু করলেন Paydeck সেকথাই বলছিলেন সৌরভ। একটা সময় ওর টাকা পয়সার টানাটানি চলছিল। বিয়ে করেছেন, নতুন ফ্ল্যাট, বোঝেনই তো কত রকমের আনুষঙ্গিক খরচ। সব মিলিয়ে একবার বাড়িভাড়ার টাকা দেওয়ার সময় টের পান ক্যাশে টাকা দেওয়াটা একটু চাপের। ফলে ক্রেডিট কার্ডে ভাড়া এবং সিএএম চার্জ মেটাতে চান। ভাবেন ক্রেডিট কার্ডে টাকাটা দিতে পারলে সুবিধে হয়। ৪৫ দিনে দুটো স্যালারি ঢুকে যাবে। ফলে আর চিন্তা নেই। কিন্তু দেখেন ক্রেডিট কার্ডে বাড়ি ভাড়া চোকানোর কোনও অপশন নেই। নেই মানে কোথাও নেই কোনও রিয়েল এস্টেট এজেন্টের কাছে নেই। কোনও হাউজিং কমপ্লেক্সেই নেই। তখন painpoint টা নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে টের পান। পকেটে লক্ষ লক্ষ টাকার ক্রেডিট ভ্যালু ওয়ালা কার্ড থাকা সত্ত্বেও কতটা অসহায় পরিস্থিতি হতে পারে সেদিন বুঝেছিলেন সুমন। খোঁজ খবর নেওয়া শুরু করেন। অধিকাংশ দোকানে সোয়াইপ করার যন্ত্র থাকে না। অসংগঠিত ক্ষেত্রে যারা কাজ করেন যেমন রঙের মিস্ত্রি, ইন্টেরিওর ডিজাইনার, কিংবা ছোটো ভেন্ডর কেউই ক্রেডিট কার্ডে টাকা নিতে পারেন না কারণ ক্রেডিট কার্ডে টাকা নেওয়ার কোনও সরল প্রক্রিয়া নেই। এই শূন্যতাই দূর করার তাগিদ অনুভব করেন সৌরভ। নিজে যখন ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ করেছেন তখনও দেখেছেন, ক্লায়েন্টের পকেটে যদি ক্যাশ টাকা না থাকে তাহলে টাকা আদায় করতে কী ভীষণ ঘুরতে হয়। সেইসব সমস্যা দূর করতেই PayDeck এর শুরু।

এর ফলে দ্রুত টাকা চোকানো যায়, সে যে কোনও প্রয়োজনেই আপনি চাইলে Paydeck এর মারফত টাকা চোকাতে পারেন। যেমন ধরুন বাড়ি বা অফিস স্পেস ভাড়া। কখনও কোনও বাড়ি নেওয়ার সময় আপনাকে সিকিউরিটির টাকা জমা দিতে হতে পারে। জমানো ক্যাশে হাত না দিয়েই আপনি সেটা জমা করাতে পারবেন। এছাড়া ছেলে মেয়ের স্কুলের মাইনে, রিয়েল এস্টেটের এজেন্টের টাকা, কোচিংয়ের টিউশন ফি, আইনজীবীর ফি, রেস্তরাঁয় সোয়াইপিং মেশিন না থাকলেও রেস্তোরাঁয় ঢুকে আপনি PayDeck দিয়ে টাকা চোকাতে পারবেন। যেসব করার কথা আগে আপনি কখনও ভাবেননি সেগুলোই করতে পারবেন অনায়াসে। যদি ক্রেডিট কার্ড না থাকে তাহলেও কুচ পরোয়া নেহি। আপনার ডেবিট কার্ডের মারফতও সব কাজ সম্ভব। হাতে হাতে টাকা দেওয়া নেওয়ার অভ্যাসটাই চলে যাবে, দেখবেন। কারণ আপনি এখন PayDeck এর সাহায্যে টাকা নিতেও পারবেন এবং দিতেও পারবেন। ধরুন আপনি কারও কাছে টাকা পান, এখন PayDeck দিয়ে তার কাছে একটা এসএমএস পাঠান। সে ওই এসএমএসের লিঙ্ক ধরেই আপনার পেমেন্টটা করে দিতে পারবে স্মুদলি। তার জন্যে আপনাকে কী করতে হবে, জেনে নিন আপনাকে শুধু সাইন ইন করতে হবে। প্যান কার্ড দিয়ে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের প্রয়োজনীয় ডিটেল দিয়ে। একবার আপনার অ্যাকাউন্ট খুলে গেলে PayDeck হয়ে যাবে আপনার সমস্ত ট্র্যান্জাকশানের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট কাম ট্রেজারর।

ধরুন আপনি ব্যবসা করেন, আপনার ক্লায়েন্টকে একটা ইনভয়েস পাঠাবেন, রিসিপ্ট দেবেন, কিংবা আপনাকে টাকা দেওয়ার জন্যে একটা লিঙ্ক পাঠাবেন, সবই আপনি পারবেন Paydeck এর সাহায্যে। এক সঙ্গে অনেককে বিল পাঠাতে চান, তাও পারবেন। নিয়মিত পেমেন্ট করতে হয় এমন কোনও লায়াবিলিটি থাকলে সেটাও ম্যানেজ করা যায় Paydeck এর সাহায্যে। অন্যান্য পেমেন্ট গেটওয়ের তুলনায় কম সার্ভিস চার্জ কাটে Paydeck পাশাপাশি তুলনায় দ্রুত টাকা ব্যাঙ্কে ঢোকে। ফলে যেকোনও ব্যবসার ক্রেতা এবং বিক্রেতা দুজনের জন্যেই এই স্টার্টআপ নিয়ে এসেছে দুর্দান্ত সলিউশন।

সাড়াও পাচ্ছেন সৌরভ। বলছেন, প্রচার ছাড়াই দারুণ সাড়া। মাসে এককোটি টাকার ট্র্যানজাকশন করাটাই সামনের লক্ষ্য। কারণ তাহলে ব্যাঙ্কের তরফ থেকে সার্ভিস চার্জে সামান্য ছাড় পাবেন সৌরভ। এভাবে চলতে থাকলে, ফান্ডিং পেলে সৌরভ কলকাতার বাইরেও হাত পা মেলবেন। খুব শিগগিরই ইউনিকর্ন হওয়ারও স্বপ্ন দেখেন এই যুবক। যদিও কলকাতায় ব্যবসা করার একটা হার্ডলের কথা উল্লেখ করলেন তিনি। সেটা একটি ব্যাঙ্কের তরফে তাঁকে বলা হয়েছে কলকাতা না হয়ে যদি অন্য কোনও স্টার্টআপ সিটি থেকে এই ব্যবসা করেন সৌরভ তাহলে ওই ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ সার্ভিস চার্জের ওপর একটা ভালো পার্সেন্টেজ ছাড় দিতে পারে। এই বৈষম্যের কারণ যদিও খোলসা করে কখনওই বলেননি ওই ব্যাঙ্ক কর্তা। ফলে ব্যবসা স্কেল আপ করতে, ব্যবসার বাড়াতে, লাভের মুখ আরও স্পষ্ট করে দেখতে কলকাতা যে দুয়োরানী সেকথা টের পেয়েছেন সৌরভ। কিন্তু তবুও কোনও মতেই বাংলা ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন না। তিনি বরং বলছেন, হলে এখানেই হবে নেওয়াই যাক না চ্যালেঞ্জ।

তিনি বিশ্বাস করেন, বাংলা মানে প্রায় হেরে যাওয়া ম্যাচ শেষ ওভারে ঘুরিয়ে দেওয়া। বাংলা মানে ১৯১১ সালের এগারোটি যুবকের মনের জোড়। বাংলা মানে ঘুরে দাঁড়ানো। কলকাতার স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমেও ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এটা। যেন ঘুরে দাঁড়ালেই বদলে দিতে পারবে প্রতিপক্ষের চাল। উল্টে যাবে পাশা। আর সেই মনের জোর দেখিয়ে যাচ্ছেন বিহারের মজফফরপুরের এই ছেলে কলকাতার অন্ধ সাপোর্টার।