মহিলা উদ্যোক্তাদের ‘সহেলি’ সাহা ফান্ড

0

২০১৫ জেন্ডার গেডি ফিমেল এন্টারপ্রেনারশিপ ইনডেক্সে ৭৭ এর মধ্যে ভারতের স্থান হয় ৭০ এ। স্কোর ছিল ২৫.৩ শতাংশ। এখান থেকেই পরিষ্কার বোঝা যায় দেশে মহিলা উদ্যোক্তার গ্রাফটা কোন মুখী। লেবার ফোর্স প্যারিটিতেও সবচেয়ে কম স্কোর ভারতের।

২০১৫র প্রথম ৬ মাসে ভারতের স্টার্টআপগুলি ৩.৫ বিলিয়ন ডলার ফান্ড তুলে নিয়েছে। ইওরস্টোরির সূত্র অনুযায়ী, ২০১৫র প্রথম ৩ মাসে স্টার্টআপগুলি ১.৭ বিলিয়ন ফান্ড সংগ্রহ করে। দ্বিতীয় কোয়ার্টারে ডিলের সংখ্যা ৫০ শতাংশ বাড়ে। যাইহোক, আমরা যখন ব্যবসার ক্ষেত্রে মহিলাদের কী অবস্থান বিচার করতে যাই, তখন দেখি সম্পূর্ণ মহিলা পরিচালিত বা মহিলার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্টার্টআপের সংখ্যা হাতেগোনা। আর যদি বাজার থেকে ফান্ড তোলার কথা বলি তাহলে দেখা যায়, পরিমানটা এক সংখ্যার গন্ডিও পেরোয় না।

এই সামঞ্জস্যহীনতা কথা ভেবেই অঙ্কিতা বৈশিষ্ঠ সাহা ফান্ড লঞ্চ করেন। উদ্দেশ্য হল, মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত মহিলা কেন্দ্রীক সংস্থাগুলিকে ফান্ডের যোগান দেওয়া। ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ার অঙ্কিত ফিন্যান্সে স্নাতকোত্তর হন ইউকে-এর ক্র্যানফিল্ড স্কুল অব ম্যানেজমেন্ট থেকে। অরিওজ ক্যাপিটাল, আবরাজ গ্রুপ, থোলনস ক্যাপিটাল এবং থোলনস কনসালটিংয়ে কাজ করেছেন। থোলনস ক্যাপিটালে ম্যানেজিং পার্টনার হিসেবেও ছিলেন তিনি। স্টার্টআপ এবং বিনিয়োগের ইকোসিস্টেমকে আরও ভালো করে বুঝতে ইন্ডিয়া এঞ্জেল ইনভেস্টরে যোগ দেন। ভারত, ব্রিটেন, আমেরিকা, সিঙ্গাপুর এবং ফিলিপিন্স সব মিলিয়ে গত আট বছর ধরে বিনিয়োগের এই ক্ষেত্রেই কাজ করে চলেছেন অঙ্কিতা। প্রথমের দিকে তিনি একটা প্রবণতা লক্ষ্য করতেন। কোনও সংস্থায় যদি মহিলা সহ প্রতিষ্ঠাতা থাকেন অথবা ম্যানেজমেন্টের শীর্ষ পদে থাকেন অথবা নিজে প্রতিষ্ঠাতা হোন, প্রয়োজনের সময়ে খুব একটা গলা চড়াতে দেখা যায় না।

অঙ্কিত বলেন, ‘যদি বিনিয়োগের দিক থেকে দেখা হয় তাহলে বলতে হয় মহিলা বিনিয়োগকারী তেমন নেই। আবার মহিলাদের দায়িত্ব দিতেও সংস্থাগুলি সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে। মহিলা কেন্দ্রীক সংস্থায় বিনিয়োগেও হাজারবার ভাবেন বিনিয়োগকারীরা। বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলতেও অস্বস্তিতে ভোগেন মহিলারা। আর এর মূল কারণ হচ্ছে, বিনিয়োগকারীরা বেশিরভাগ সময় এমন সব প্রশ্ন করেন যা করা উচিত নয়’। উদাহরণ দিয়ে অঙ্কিতা বলেন, এমন প্রশ্ন হতে পারে যেমন, যদি আপনার বিয়ে হয়ে যায় তাহলে কাজে কি তার প্রভাব পড়বে? লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেন তো? অঙ্কিতা বিশ্বাস করেন, মহিলাদের আন্দাজ করে নেওয়ার একটা প্রবণতা আছে এবং নানা আইডিয়া দিতে পারেন, যেটা পুরুষদের পক্ষে সম্ভব নয়। ‘বাঁধা ধরা গতে না গিয়ে যদি একটু অন্যভাবে ভাবি তাহলে শুধু ইকোসিস্টেমই পালটায় না, বরং নতুন ধারার অর্থনৈতিক উন্নয়নে সাহায্য করে’, বলেন অঙ্কিতা। তিনি চান এমন একটা মঞ্চ তৈরি করতে যেখানে মহিলারা উঠে আসতে পারবেন এবং কথা বলতে পারবেন। SAHA থেকে ফান্ড পেতে গেলে শর্ত একটাই, কোনও মহিলাকে ম্যানেজমেন্টের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকতে হবে।

SAHA ফান্ডে মোহনদাস পাই এবং কিরণ মজুমদার শ-র বিনিয়োগ রয়েছে। কীভাবে SAHA এর জন্ম সেই প্রসঙ্গে অঙ্কিতা দারুন এক কাহিনি বললেন। মোহনদাস পাইকে অঙ্কিতা আগে থেকেই চিনতেন। দুজনে চিনে কোনও এক প্রতিনিধি দলে একসঙ্গে ছিলেন। পাই প্রস্তাব দেন যদি অঙ্কিতা প্রান্তিক কোনও সেক্টরে কাজ করতে চান তাহলে তিনি বিনিয়োগে প্রস্তুত। ‘তখনই ঠিক করলাম মহিলা উদ্যোক্তাদের জন্য কাজ করব। মোহনদাস পাই আমাদের অ্যাঙ্কর ইনভেস্টর’, বলেন অঙ্কিতা। পাইয়ের মাধ্যমে অঙ্কিতার সঙ্গে তাঁর সহ উদ্যোক্তা উষা অবিনাশ বৈশিষ্ঠর পরিচয় হয়। বৈশিষ্ঠ অ্যাকসেনচুরের ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং অ্যামিরেটাস, থোলনসের চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি বলেন, ‘বহুমুখীতা মানুষকে ক্রিয়েটিভ করে তোলে,কর্মী এবং জ্ঞানের মধ্যে তফাৎ ঘোচায়। মহিলা উদ্যোক্তাদের জন্য সাহা ফান্ড দারুন সুযোগ’। নির্ভর করার মতো বড় বড় নাম সঙ্গে ছিল অঙ্কিতার। বিনিয়োগকারীদের জন্য এটাই সবচেয়ে জরুরি। তিনি চান বিনিয়োগকারীরা স্টার্টআপগুলির জন্য মেন্টরের মতো কাজ করুক। মোহনদাস পাই মনে করেন, ‘ইন্ডাস্ট্রির মেধাবী এবং উচ্চাকাঙ্খীদের আরও উৎসাহিত করতে এবং কাজে আরও গতি আনতে ভেঞ্চার ফান্ডং গুরুত্বপূর্ণ বূমিকা পালন করে। ভলো উদ্যোক্তাদের মধ্যে একটা বড় অংশে মহিলার তেমন উপস্থিতি নেই। উদ্যোক্তা হিসেবেই নয়, ভেঞ্চার ক্যাপিটেলেও নেই। সাহা ফান্ড এই মহিলা উদ্যোক্তাদেরই সাহায্য করবে মহিলাদের থেকে সেরাটা বের করে আনতে’। কিরণ মজুমদার শ মতে, নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে মহিলাদের ব্যবসা গড়ার দিকে নজর দেওয়া উচিত। ‘আমি মনে করি, সাহা ফান্ড মহিদের জন্য এমন একটা মঞ্চ তৈরি করে দেয়, যেখানে কীভাবে চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করা যায়, কীভাবে অঘটন সামলে নিতে হবে এবং ব্যবসা লাভজনক করে তুলতে হবে এই সব বিষয়ে আলোচনার সুযোগ মেলে’, বলেন তিনি।

নানা সেক্টরের মহিলা পরিচালিত সংস্থায় বিনিয়োগ করে সাহা ফান্ড। একই সঙ্গে যে সংস্থাগুলি প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজেদের এগিয়ে নিতে আগ্রহী সেখানেও বিনিয়োগ করে সাহা ফান্ড। যেসব সংস্থায় এখনও পর্যন্ত সাহা ফান্ড বিনিয়োগ করেছে সেগুলি হল, Fitternity, Kaaryah, Stelae Technologies এবং Joulestowatts। নেহা মোতওয়ানির ফিটারনিটি মূলত ফিটনেস নিয়ে যারা ভাবিত তাদের জন্যই। বিশ্বস্ত ফিটনেস কনটেন্ট, কমিউনিটি প্ল্যাটফর্ম এবং একটি ই স্টোর রয়েছে ফিটারনিটির। অরুণা শোরজের স্টিলে টেকনোলজি হল সফওয়ার ভেন্ডার। নেহা বলেন, অঙ্কিতা নিজেও উদ্যোক্তা হওয়ায় তিনি জানেন মহিলারা উদ্যোক্তাদের কোন কোন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। ‘সবসময় ফিডব্যাক নিচ্ছেন।তাঁর মাধ্যমেই মোহনদাস পাইয়ের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ। তাদের আদর্শ হল, আমরা তোমাদের ফান্ড দিয়েছি, দীর্ঘ পথের সঙ্গী হব’, বলেন নেহা।

সাহা ফান্ডের একটা মেন্টর সার্কেল রয়েছে। এই সার্কেলে ইন্ডাস্ট্রির তাবড় তাবড় সব ব্যক্তিত্ব রয়েছেন যারা মহিলা উদ্যোক্তাদের পরামর্শ দেবেন। অঙ্কিতা বলেন, অনেক গোঁড়ামি রয়েছে, যেগুলি বন্ধ করতে হবে। তখনই পরিবর্তন আসবে যখন উদ্যোগ এবং ম্যানেজমেন্ট রুলে লিঙ্গ বৈষম্য থাকবে না আর।

লেখক-সিন্ধু কাশ্যপ

অনুবাদ-তিয়াসা বিশ্বাস