‘ব্রা কুইন’ এর স্বপ্ন আপনার আরাম

বাটারকাপসের নাম শুনেছেন? ভারতের অন্যতম সেরা সৃজনশীল লঁজরি বুটিক। যার অফলাইনের সঙ্গে সঙ্গে অনলাইনস্টোরও সমানভাবে জনপ্রিয়। গ্রাহকদের জন্য বাটারকাপসের সম্ভারই তাকে পৃথিবীর অন্যান্য লঁজরি ব্র্যান্ডের থেকে আলাদা করেছে। গ্রাহকের ব্যক্তিগত চাহিদা অনুযায়ী ডিজাইন, ফিটিং বাটারকাপসের ইউএসপি। এখানেই শেষ নয়, মহিলারা যাতে সঠিক এবং উন্নতমানের আরামদায়ক অন্তর্বাস পান সেটা নিশ্চিত করার মিশন নিয়েছেন বাটারকাপসের মালকিন।

0
অর্পিতা গণেশ
অর্পিতা গণেশ

অর্পিতা গণেশ,উদ্দেশ্যের প্রতি সজাগ একজন উদ্যোগী নারী। তাঁর চলার পথ মোটেই মসৃণ ছিল না। চড়াইয়ের থেকে উতরাইটাই জীবনে বেশি দেখেছেন অর্পিতা। তবে হাল ছাড়েননি। হাল ছাড়বেনই বা কেন? যখন কেউ কারও আবেগ নিয়ে কাজ করেন তখন হাল ছাড়েন না। নারী তাঁর ব্যক্তিত্বকে, নিজের শরীরকে কিভাবে আবিস্কার করবেন সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে বদ্ধপরিকর অর্পিতা। তিনি তো পরিবর্তনের গুরুদায়িত্ব নিয়েছেন তিনি কেন হাল ছাড়বেন।

অর্পিতা এই কাজের পুরোদস্তুর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন চাঁতেলি থেকে। আর তারপর থেকেই লেগে পরেছেন তাঁর মিশনে। ভারতীয় মহিলাদের অন্তর্বাস নিয়ে বিভিন্ন সংস্কার উপড়ে ফেলতে সচেষ্ট অর্পিতা। ওঁর কথা শোনার পর আপনি যদি কিছু মাত্র অনুপ্রেরণা পান, যেমন আমরা পেয়েছি, তাহলে আপনার প্রতি আবেদন, অর্পিতার পাশে দাঁড়ান। তিনি সত্যিই চান ভারতীয় মহিলারা সস্তায় পান বিশ্বমানের ব্রা-এর অভিজ্ঞতা ।

ওয়াই এস - বাটারকাপসের শুরুর দিন থেকে অর্পিতা আমি আপনাকে চিনি। আপনার শুরু থেকে শেষ পুরো গল্পটি বলুন।

অর্পিতা - অনেক বড় এবং কঠিন পথচলা ছিল আমার সামনে। এমন একটা আবেগের পিছনে ছুটেছি যেটা ভারতে এখনও ট্যাবু, এখনও ছুতমার্গের বিষয়।এটা যেন মিথের সঙ্গে লড়াই, ভাবনার বদল ঘটানো, এমনকি উচ্চশিক্ষিত মহিলাদেরও এমন একটা বিষয়ে শিক্ষিত করে তোলার লড়াই চালাতে হয়েছে, যেটা নিয়ে ওঁরা কখনও ভাবেনইনি। কারণ ভারতীয় মহিলাদের অধিকাংশই অন্তর্বাস নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করতে চান না। বিনিয়োগকারীদের বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম, যাঁদের অনেকেই আবার পুরুষ। বুঝতেই পারছেন, লঁজররির বিষয়টি পুরুষদের বোঝানো কতটা শক্ত ব্যাপার। এছাড়াও ব্যবসার ফোকাস ছিল সাধারণ জনতার কাছে পৌছানো, প্রথম সারিতে যাওয়া এবং খুব দ্রুত ব্যবসা বাড়ানোর মতো বিষয়। এবং এগুলিকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছিল যে লাভদায়ক হওয়া বা বাছাই করা গ্রাহকদের কাছে আনকোরা সামগ্রী নিয়ে পৌঁছনোর থেকেও প্রাথমিক অবস্থায় এই বিষয়গুলিই বেশিই প্রাধান্য পাচ্ছিল।

আমার যাত্রা পথের ভালো সময়গুলোই আজ আমাকে এখানে এনেছে। সাধারণ মানুষ আমাকে গ্রহণ করেছেন। আমার অনেক গ্রাহক আছেন যাঁরা মনে করেন বাটারকাপস সফল হোক। বাটারকাপস যা করতে চায় তা করে দেখাক। ওদের এই বিশ্বাস এবং সহায়তাই প্রমাণ করেছে যে আমার মধ্যে সেই জিনিষটা আছে যা দিয়ে আমি ওদের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারি। যে সব মহিলারা বাটারকাপস একবার ব্যবহার করেছেন,তাঁরা প্রত্যেকেই বাটারকাপসকে আরও বেশি করে ব্যবহার করতে চেয়েছেন এবং নিজের মধ্যে পরিবর্তনকে আরও বেশি করে অনুভব করতে চেয়েছেন। আজ আমি সারা বিশ্ব লঁজররি সার্কেলে ‘ইন্ডিয়ান ব্রা লেডি’। এবং আমি এই নামটি খুবই পচ্ছন্দ করি। ভারতীয় মহিলারা যাতে সঠিক মাপের ব্র্যান্ডেড অন্তর্বাস পেতে পারেন তার জন্য (ABTF অ্যাপল এবং অ্যান্ড্রয়েড) অ্যাপ চালু করাও আমার সাফল্যের মুকুটের আরেকটি বড় পালক বলে মনে করি। আমার প্যাশন দেখেই এই অ্যাপ তৈরি করতে এগিয়ে এসেছিলেন একদল উদ্যোগপতি। তাঁরা আমাকে সাহায্যই করতে চেয়েছিলেন।

অন্তর্বাস বিষয়ে আমার ব্লগ www.abrathatfits.com সারা পৃথিবীতে তিন হাজার মহিলা পড়েন,যার জন্য আমি অভিভূত। এই ব্লগটি এখন আমি নিজেই দেখভাল করি। কীভাবে করতে হয় সেটা অবশ্য আমায় শিখিয়েছিলেন আরও এক সুহৃদ উদ্যোপতি। ব্লগ তৈরিতে তিনি আমাকে অনেক সাহায্য করেছিলেন। গত ছয় বছর ধরে আমি বিখ্যাত লঁজররি সংস্থাগুলির সঙ্গে কাজ করে অনেক কিছু শিখেছি। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে অনেক কিছু জানতে পেরেছি। যেমন M&S, Fredericks। আমি একজন ভারতীয় মহিলা হয়েও লঁজররি বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা করছি এটা তাঁদের ভালো লেগেছিল। কিন্তু এতটা পথ পেরিয়ে আসা খুব একটা সহজ ছিল না। বিশেষ করে খুচরো ব্যবসার দিক দিয়ে। কিন্তু দুটি জিনিষ আমাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। এক আমার চারপাশের মানুষের আমার প্রতি বিশ্বাস, আর দুই আমার নিজের প্রতি বিশ্বাস, যে এটা আমি পারবই। এই চলার পথে দারুণ সব মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে, গ্রাহক, ক্রেতা,সঙ্গী ব্যবসায়ী, কিছু বিনিয়োগকারী, কিছু উপদেষ্টা যারা যথাসাধ্য আমায় সাহায্য করেছেন। তাঁদের জন্যই আজ আমি এই জায়গায় পৌঁছতে পেরেছি।

ওয়াই এস - আপনার কাজের কোন দিকটা আপনাকে এতটা ইতিবাচক,এতটা চনমনে করে রাখে?

অর্পিতা - আমি আমার কাজকে ভালোবাসি। প্রতিটি ব্রা এর ঠিকঠাক ফিটিংসই আমাকে তৃপ্তি দেয়। এটা অনেকটা অসাধারণ রান্নার জন্য রাঁধুনিকে দেওয়া প্রশংসার মতো। কারণ সঠিক ফিটিংসের ব্রা জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনে (আমার গ্রাহকদের জিজ্ঞেস করুন)। আমি চাই প্রত্যেক ভারতীয় মহিলা সঠিক মাপের ব্রা পরুন, ব্রা এর প্রতি তাঁদের চাহিদার মাত্রাটা এমন এক উচ্চতায় পৌঁছক যেখানে তারা আরও আরাম আরও স্বাধীনতা দাবি করতে পারেন। সেই জন্যই তো আমি রয়েছি। এত লড়াই করছি। ফেসবুকের পেজ,অ্যাপ্লিকেশনস,ব্লগ এ সবের মাধ্যমে মহিলাদের কাছে আমি এই আবেদনটুকু নিয়েই পৌছতে চাই। প্রযুক্তি আমার দ্বিতীয প্রেম। ব্রায়ের ফিটিংসের জন্যে প্রযুক্তিই সহায়ক। আমি সব সময পড়াশোনা করি জানার চেষ্টা করি কীভাবে প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে আরও উন্নতমানের ব্রা তৈরি করা যায়। এবং সেই সূত্রে আরও বেশি মহিলার কাছে পৌঁছানো যায়।

ওয়াই এস - কীভাবে আপনি আপনার বাজারকে দেখেন, এগোচ্ছে, বাড়ছে নাকি এখনও একই জায়গায় পড়ে আছে?

অর্পিতা - এই ছয় বছরে মার্কেটে অবিশ্বাস্য রকমের বদলে গেছে। এর জন্যে অনলাইন কেনাকাটার অভ্যেসটা অনেকটাই দায়ী। একই সঙ্গে বদলে গেছেন ভারতীয় নারীরাও। মহিলারা এখন নিজেদের প্রতি অনেক বেশি সচেতন। অনেক বেশি যত্নশীল। তাঁরা এখন ভালো জিনিষটা পতে বাইরে বেরোচ্ছেন, এবং সেটা সংগ্রহ করছেন। ভালো থাকার জন্য এবং ভালোভাবে নিজেকে প্রেজেন্ট করার জন্য যতটা সম্ভব করা যায় ওঁরা করছেন। সাধারণ সস্তার পণ্যের সঙ্গে সমঝোতা করা বন্ধ করেছেন। তাঁরা জানেন যে সেরা জিনিষটাই তাঁদের প্রাপ্য। সে জন্যেই বাটারকাপসের জন্য এটা সঠিক সময়।

ওয়াই এস- এই ব্যবসায় আপনার প্রবল প্রতিপক্ষদের সঙ্গে লড়ছেন কিভাবে? প্রতিযোগিতায় আপনাকে কী এগিয়ে রাখছে?

অর্পিতা - পুঁজির দিক থেকে অনেকগুলি বড় সংস্থা আছে, বড় বিপণন ওয়েবসাইটও আছে। কিন্তু এটা প্রতিযোগিতা নয়। বরং ভবিষ্যতে আমাদের পণ্য বিক্রির মাধ্যমও হবে। আর অন্য যেসব ব্র্যান্ড গুলি রয়েছে তারা সেক্সি,ফাঙ্কি,কম দামী মডেলদের দিকে ফোকাস করে ব্যবসা করে। বাটারকাপসের ফোকাস পরিস্কার। সেটা হল পণ্যের মান এবং পণ্য ব্যবহারের অভিজ্ঞতা। তাছাড়া একটি বিশেষ বয়সের এবং আর্থিক ক্রয় ক্ষমতা সম্পন্ন একটি নির্দিষ্ট শ্রেণিকে মাথায় রেখে আমাদের ব্যবসা। সঠিক জিনিসটা তাঁদের হাতে তুলে দেওয়াই আমাদের ইউএসপি। বলতে পারেন আমিই আমার সব থেকে বড় সম্পদ। আমার অভিজ্ঞতা, আমার জ্ঞান। যা অন্য সব বড় পুঁজির সংস্থাকেই অনেক পিছনে ফেলে দেবে। আমি ভারতের একমাত্র ব্রা ফিটার। যে ৩ হাজারেরও বেশি মহিলার ব্রা ফিট করেছি। এটাই আমার অ্যাডভ্যান্টেজ যে আমি কোনটা বেশি ভালো আমি জানি, এবং সবথেকে ভালো জিনিসটাই অফার করি। যেটা বাকিরা পারে না।

ওয়াই এস - আপনার সাম্প্রতিক ক্যাম্পেনের বিষয়ে বলুন।

অর্পিতা - ভারতের বাজারে ভাল ব্রা আনার জন্য আমি শেষমেশ আমার যা দরকার ছিল সেরকম ভালো ডিজাইনার পেয়েছি। তিনি সঠিক মাপ এবং ব্রা এর ফিট ব্যাপারটা বোঝেন। ভালো ফিটিংস দিতে পারবেন ভারতে এমন একজন ডিজাইনারকে খুঁজতে আমার বছর ঘুরে গিয়েছে। আরও একজন ডিজাইনারকে আমি পেয়েছি যিনি জার্মানির হ্যামবুর্গে থাকেন। উনি আমার ভাবনা কী সেটা ভালই বোঝেন এবং কাঁচামাল সরবরাহের পাশাপাশি সৃজনশীল ভাবনা দিয়েও আমাকে সাহায্য করেন। এছাড়াও যেরকম মানের প্রোডাক্ট আমি চাই ঠিক সেই মানের প্রোডাক্ট আমাকে পাঠান হংকং-এর একজন ম্যানুফ্যাকচারার। আমার দুটো জিনিস এখন প্রয়োজন। প্রথমত দরকার অর্থের যাতে আমি বাটারকাপসকে ব্র্যান্ড হিসেবে আরও জনপ্রিয় করে তুলতে পারি এবং দ্বিতীয়ত গ্রাহক, যারা আমার সামগ্রীর ওপর ভরসা দেখাবেন। এই ক্যাম্পেন সেই সবেরই অংশ। এবং প্রাথমিকভাবে যে সাড়া আমরা পেয়েছি,তাতে আমি ভীষণ ভীষণ খুশি। সাহায্য পেতে হলে আগে তোমার নিজেকে সাহায্য করতে হবে। যার জন্যই এই ক্রাউড সোর্সিং।

এমন একজন যে ভারতের বাজারে ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করে নতুন ব্যবসা করবে তাকে একটা নতুন ইকো সিস্টেম তৈরি করতেই হবে, যাতে নিজেই নিজের বিনিয়োগের ফান্ড তৈরি করতে সক্ষম হয়। বড় বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের বিষয়ে প্রকল্পের সম্ভাব্য সাফল্যের প্রমাণ চান। তাই অনেক ব্যবসায়ীই সাধারণের কাছ থেকে বিনিয়োগের আহ্বান করে ব্যবসা শুরু করাটাকেই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করেন। তাতে বেশিরভাগ সময় দেখা যায় যখন বড় বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আগ্রহ দেখান ততদিনে আপনি শুরু করে দিয়েছেন। আপনার কাছে বরাত আছে এবং সেটাই প্রমাণ করবে বাজারে আপনার চাহিদা আছে।

ওয়াই এস- আমাদের বলুন তো অর্পিতা কে?

অর্পিতা- আমি অ্যান রান্দ-এর অ্যাটলাস স্রাগড উপনাস্যের চরিত্র ড্যাগনি ট্যার্গাট। আমি তাঁর দর্শন গভীর ভাবে বিশ্বাস করি। কীভাবে সাধারণ থেকে অসাধারণের উত্থান হয় সেটাই শিখেছি। হতাশার সঙ্গে লড়াই করার রশদ পেয়েছি ওঁর লেখা পড়ে। আমি হয়ত খুবই দৃঢ়চেতা এবং আবেগপ্রবণ। আমি হাল ছেড়ে দিই না। এইরকম অনেক সময় গিয়েছে যখন মনে হয়েছে এবার আর পারলাম না। এবার হাল ছেড়ে দেব, কিন্তু পরের মুহূর্তে আমি ঘুরে দাঁড়িয়েছি। আসলে জানিনই না কীভাবে হারতে হয়। সেটা হতে পারে বাটারকাপস, বা যেকোনও সম্পর্ক কিংবা অ্যাংগরি বার্ডস গেম,আমি সহজে হার মানার পাত্রী নই। এটাই আমার সব থেকে সেরা এবং সব থেকে খারাপ গুণ। আমি আমার মেয়ের জন্য একটা সুন্দর পৃথিবী রেখে যাওয়ার স্বপ্ন দেখি। এবং আমি আশা করি হতাশা যেন অতীতের বিষয় হয়ে যায়। আমি অদক্ষ্যতাকে একটুও সহ্য করি না। এবংই মনে করি বয়স এবং অভিজ্ঞতা দুটোই খুবই স্বতন্ত্র। সম্মান করতে হয় বলে সম্মান করি না। আমি সম্মান করতে চাই বলেই সম্মান করি। যত্নশীল হওয়াটা উচিত বলে নয় আমার কাছে গুরুত্ব আছে বলেই আমি যত্নশীল হই। ঠিক যেমন আমাকে বাঁচতে হবে বলে আমি বেঁচে নেই আমি বাঁচতে চাই বলে আমি বেঁচে আছি। আমি এমন একটা দিনের স্বপ্ন দেখি যেদিন এই দারুণ পৃথিবীতে আমি ঘুরে বেড়াতে পারব। আরও নতুন নতুন সুন্দর অভিজ্ঞতা, আরও দারুন দারুন মানুষের সঙ্গে সাক্ষাত করার ইচ্ছে নিয়ে বেঁচে আছি।

অর্পিতার উদ্দেশ্যর প্রতি সম্মান জানাতে www.fundbuttercups.in এর ক্যাম্পেনে অংশগ্রহণ করুন।

Related Stories