যুব সমাজকে সংস্কারে ব্রতী করাই লক্ষ্য ‘যুব মোর্চা’-র

পথ চলতে চলতে প্রতিনিয়ত কত সামাজিক অবক্ষয়ের ছবি আমাদের চোখে ধরা পড়ে। সেগুলোকে কি কখনই আমরা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করি ? আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটেই হোক, আর নিছক কুসঙ্গ অথবা স্বভাবের দোষেই হোক, নিজের গ্রাম, নিজের শহর তো দূরের কথা, পাশের বাড়ির ছেলেটা বা মেয়েটা বিপথগামী হলেও আমরা নিজেদের অবস্থানে সন্তুষ্ট থেকে বাঁকা কথায় ব্যঙ্গ, বিদ্রুপেই দায় সারি। কখনও কারণ সন্ধান করে সামাজের এই ব্যাধিগুলিকে সারিয়ে তোলার কথা ভাবি কি? সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা এতটাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছি যে, রাস্তার দু’পাশে হতদরিদ্র মানুষগুলোর দুটো পয়সা, একমুঠো খাবারের জন্য আর্ত আকুতিও এখন আর আমাদের কানে পৌঁছয় না। হতে পারে সামাজিক এই অসঙ্গতি, এই দারিদ্র, এত অবক্ষয় দূর করার সামর্থ্য আমাদের নেই। কিন্তু সহানুভূতির সঙ্গে ছোট্ট একটা পদক্ষেপে পিছিয়ে পড়াদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসার মানসিকতাটাও আমরা কদাচিতই দেখিয়ে থাকি। বাকিরা মুখ ফিরিয়ে থাকলেও প্রখর ভারতীয় কখনই পারেননি এই বৈষম্যটা মন থেকে মেনে নিতে। সামর্থ্য নেই রাতারাতি সমাজের ছবিটা বদলে দেওয়ার, কিন্তু তাই বলে মুখ ফিরিয়ে থাকায় সায় দেয়নি তার বিবেক। এগিয়ে এসেছেন গুটি গুটি পায়ে। অনুধাবনের চেষ্টা করেছেন সমস্যার মূলটাকে। পরে বাকিদের সাহায্য নিয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর দিকে।

0

প্রখর বুঝতে পেরেছিলেন যে কাজে তিনি ব্রতী হয়েছেন, তার একার পক্ষে বেশিদূর এগোনো সম্ভব নয়। তাই একত্রিত করতে শুরু করেছিলেন যুব সমাজকে। সমাজের মূল স্রোতের একটা পরিচ্ছন্ন ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তরুণদের কাছে, যাতে অসঙ্গতিটা তাঁরাও টের পান। সমাজ সংস্কারের কর্মযজ্ঞে তারাও যাতে হাত লাগানোর তাগিদটা খুঁজে পায়। এই লক্ষেই প্রখর গড়ে তোলেন তার স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘যুব মোর্চা’।


‘যুব মোর্চা’র প্রতিষ্ঠাতা প্রখর ভারতীয়
‘যুব মোর্চা’র প্রতিষ্ঠাতা প্রখর ভারতীয়

ছেলেবেলা থেকেই প্রখর ভারতীয় এমনই সংবেদনশীল। তাঁর স্কুল জীবনের অনুভূতিটা ছিল এইরকম —‘আমাদের স্কুলের পাশে একটা বস্তি ছিল। আমি বস্তির পাশের রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় কখনই আইসক্রিম খেতাম না। শুধু আমার খারাপ লাগত বলে নয়, আসলে বস্তির বাচ্চাদের আইসক্রিম কিনে দেওয়ার মতো পয়সা আমার ছিল না বলে।’ প্রখর ‘যুব মোর্চা’র প্রতিষ্ঠা করেন কলেজের তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময়। সেই সময়ে এটা ছিল একটা ছোট্ট পদক্ষেপ। যেটা জোয়ার পায় ২০০৯ সালে ‘জাগো রে’ প্রকল্পের প্রচারে অংশ নেওয়ার পর। এই প্রকল্পে নয়ডা ও গাজিয়াবাদ অঞ্চলে নতুন ভোটার নিবন্ধিকরণে সামিল হয়েছিল ‘যুব মোর্চা’। ওই অঞ্চলের ৬ হাজার কলেজ পড়ুয়াদের রেজিস্ট্রেশন করিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বড়সড় প্রভাব ফেলেছিল প্রখরের এই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাটি। পরে ‘ভারতের জন্য শিক্ষা’ প্রকল্পে অংশ নিয়ে প্রখর অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, একেবারে তৃণমূল স্তর থেকে কাজ করতে হলে ঠিক কী কী করা প্রয়োজন এবং এক্ষেত্রে সঠিক পরামর্শদানের গুরুত্ব কতটা। এই প্রকল্পের অংশীদারিত্বই ‘যুব মোর্চা’র জন্য প্রখরকে সহযোগী বন্ধু জুটিয়ে দিয়েছিল। একা প্রখর থেকে শুরু করে ক্রমে ‘যুব মোর্চা’র দল বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচ জনে। এই মুহূর্তে ‘যুব মোর্চা’ শহর ও গ্রামাঞ্চলে একাধিক কর্মশালার মাধ্যমে যুব সম্প্রদায়কে সক্রিয় করে তোলার কাজ করে থাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে।

প্রাথমিকভাবে শহরাঞ্চলে ‘সংস্কারের অগ্রদূত’ প্রকল্পের মাধ্যমে যুব সম্প্রদায়কে বদলানোর প্রক্রিয়া শুরু করে ‘যুব মোর্চা’। ৮ সপ্তাহের এই কর্মশালায় দিল্লির ২০-৩০ জন উৎসাহী যুবক-যুবতীকে আলোচনাচক্রে পরামর্শ দিয়ে সঠিক পথ বাতলে দেন ‘যুব মোর্চা’-র একাধিক সহযোগী স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্ণধাররা। ‘গুঞ্জন’-এর প্রতিষ্ঠাতা অংশু গুপ্ত, ‘টিচ ফর ইন্ডিয়া’-র চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার শাহিন মিস্ত্রি, ‘মঞ্জিল’-এর প্রতিষ্ঠাতা রবি গুলাটির মতো সংস্কারে অগ্রণী ব্যক্তিবর্গ সরাসরি সমাজসেবার মন্ত্রে দীক্ষিত করেন এই সব তরুণদের। গ্রামাঞ্চলের অবনমিত সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ও পরিশীলিত নেতৃত্বের উন্নয়নে ‘গ্রাম্য মন্থন’ নামে অপর এক কর্মশালার আয়োজন করে ‘যুব মোর্চা’, যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ৫০ জন যুবাকে গ্রাম্য জীবনের বিশ্লেষণ ও আনুধাবনের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের উপায় সম্পর্কে অবহিত করেন প্রখররা।


‘সংস্কারের অগ্রদূত’ কর্মশালায় ‘গুঞ্জন’এর প্রতিষ্ঠাতা অংশু গুপ্ত
‘সংস্কারের অগ্রদূত’ কর্মশালায় ‘গুঞ্জন’এর প্রতিষ্ঠাতা অংশু গুপ্ত

‘যুব মোর্চা’র এই আন্তরিক প্রয়াস যে বিফলে যায়নি তা বোঝা যায় উভয় কর্মশালায় অংশ নেওয়া যুব সম্প্রদায়ের মানবিক উন্মেষ লক্ষ করলেই। এখনও পর্যন্ত প্রায় ২০০ তরুণ-তরুণী যারা ‘সংস্কারের অগ্রদূত’ প্রকল্পে অংশ নিয়েছেন, তাদের মধ্যে ১১ জন বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় পূর্ণ সময়ের কর্মী হিসাবে নিয়োগ হয়েছেন। ২৫ জন আমন্ত্রিত এবং ১৪ জন আংশিক সময়ের ভিত্তিতে বিভিন্ন সামাজিক সংস্থায় কাজ করছেন। ৪০ জন সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছেন নিজেদের। সংখ্যার নিরিখে এটা নেহাত অপ্রতুল হলেও, যুব সমাজ যে সামাজিক পরিবর্তনে সচেতন হয়ে সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করেছে সংস্কারে, এটাই কি ‘যুব মোর্চা’র বড় সাফল্য নয়?

এখন প্রশ্ন হল, ‘যুব মোর্চা’ কি এখানেই থেমে থাকবে? নিজেদেরকে গুটিয়ে রাখবে গুটিকয়েক কর্মশালা’র আয়োজনেই? নাকি ভবিষ্যতে নতুন কোনও উদ্যোগে সামিল হবে? ‘যুব মোর্চা’র ভবিষ্যৎ, কাজকর্ম প্রসঙ্গে প্রখর জানান যে, তিনি কলেজগুলির মধ্যে একটি সংযোগ সূত্র স্থাপন করতে চান, যেখানে তারা যুব সম্প্রদায়ের মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তনে ব্রতী হতে পারবেন। সেই উদ্দেশ্যেই প্রখর ‘দায়িত্ববোধ—সামাজিক পরিবর্তন গবেষণাগার’ নামে একটি এক বছরের পরীক্ষামূলক কর্মশালার আয়োজন করতে চান, যেখানে বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যক্তিগত রুপান্তর থেকে উদ্ভাবনী চিন্তা-ভাবনার বাস্তবায়ন ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সমস্যা সমাধানের উপায় খোঁজা হবে। প্রাথমিকভাবে একটা কলেজে শুরু করে তার ফলাফলের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে প্রকল্পটি ছড়িয়ে দেওয়া হবে বিভিন্ন কলেজে। প্রখর জানিয়েছেন যে, ‘যুব মোর্চা’র এই যাত্রাপথে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি তিনি শিখেছেন তা হল, কখনও লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে নেই। নজরটা স্থির রাখলে ও দলের সদস্যদের স্বতন্ত্র দায়িত্ব তুলে দিলে তবেই ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়।

Related Stories