আর্টিফিশিয়াল মেধার আদর্শ জেল্লা

0

সালটা ২০১২। IIM ব্যাঙ্গালোরের গ্র্যাজুয়েট আদর্শ নটরাজন এবং NIT জলন্ধরের গ্র্যাজুয়েট অভিষেক মিশ্র মিলে শুরু করেন এইন্দ্রা সিস্টেমস (Aindra Systems). সদ্য তৈরি হওয়া এই সংস্থার কাজ হল বৃহৎ শিল্পসংস্থাগুলিকে আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্স (AI) দিয়ে সাহায্য করা। এইন্দ্রার কাজ শুরু হয় মিড ডে মিল প্রকল্পে ভর্তুকিকে ঘিরে। কর্নাটকে সরকার অনুদানপ্রাপ্ত স্কুলগুলিতে দেখা যায় মিড ডি মিলের ভর্তুকি যাদের জন্য তারা অনেকক্ষেত্রেই বঞ্চিত হচ্ছেন। এমনকি এই প্রকল্পে ভর্তুকির টাকা নয়ছয়ের ব্যাপারও ঘটছে। সোজা কথায়, সমস্যা বেশ জটিল। এব্যাপারে এইন্দ্রার পরামর্শ চায় কর্নাটক সরকার। নটরাজন বলেন, "ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে ওই সমস্যার সমাধান সম্ভব ছিল না। আমরা তাই সুপারিশ করলাম ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি বুঝতে মুখের ছবি চিহ্নিতকরণ করা হোক। তার ভিত্তিতেই আমরা তৈরি করলাম স্মার্ট অ্যাটেনডেন্স প্রোডাক্ট। বলতে পারেন সেটাই আমাদের শুরু।"

এইন্দ্রা সিস্টেমসের দুই প্রতিষ্ঠাতা, আদর্শ নটরাজন (বাঁদিকে) ও অভিষেক মিশ্রা
এইন্দ্রা সিস্টেমসের দুই প্রতিষ্ঠাতা, আদর্শ নটরাজন (বাঁদিকে) ও অভিষেক মিশ্রা

তবে শিক্ষাক্ষেত্র দিয়ে শুরুটা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আসলে ভারতে সদ্য তৈরি হওয়া সংস্থাগুলিকে কিছু জেনেরিক সমস্যার মুখোমুখি হতেই হয়। এইন্দ্রার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সরকারি ক্ষেত্রে তাল মিলিয়ে কাজ করাটা জটিল আকার নিলে সম্পর্ক ছেদ করারই সিদ্ধান্ত নেন নটরাজনরা। এবার তারা কাজ শুরু করেন মাইক্রো ফিনান্স সংস্থা, হেলথ্ কেয়ার ও বৃত্তিগত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলির সঙ্গে। সেখানেও কাজের ক্ষেত্রে শক্ত বাধার মুখে পড়তে হয়। নটরাজনের কথায়, "ভারতে একটা সমস্যা হল নতুন কোনও কিছুকেই সহজে কেউ গ্রহণ করতে চায় না। ই-কমার্স বাদ দিলে বাকি সব স্টার্ট আপকেই এই চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড়াতে হয়।" তবে নটরাজনের টিম এখনও মাধ্যমিক পর্যায়ের বেশ কিছু স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতির ব্যাপারটা দেখে দিয়ে থাকে। স্মার্ট অ্যাটেনডেন্স প্রযুক্তির মাধ্যমে, যা মূলত ভিস্যুয়াল মনিটরিং, খুব সহজেই ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতির রেকর্ড রাখা হচ্ছে।

বড় মাত্রায় ছাপ রাখার লক্ষ্যে যে বৃহৎ সংস্থাগুলি কাজ করে থাকে, সেইসব সংস্থার হয়ে কাজ করাকেই অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে এইন্দ্রা। "জটিল সব সমস্যার সহজ সমাধানেই আমরা আমাদের দক্ষতা যাচাই করে থাকি," বললেন নটরাজন। যেমন হেলথ্‌কেয়ার ইন্ডাস্ট্রির জন্য আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্স তৈরি করা। নিজের অভিজ্ঞতায় নটরাজন দেখেছেন, এই ক্ষেত্রটির দিকে সেভাবে কেউ নজর দেয়নি। তাঁর কথায়, "স্বাস্থ্যক্ষেত্রে প্রায় ৭০ শতাংশ যন্ত্রপাতিই আমরা বিদেশ থেকে আমদানি করে থাকি। যন্ত্রপাতির চাহিদা প্রচুর। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে আমাদের প্রথাগত ব্যবসা বা স্টার্ট আপ দিয়ে সেই চাহিদা পূরণ হচ্ছে না।" আসলে স্বাস্থ্য পরিষেবায় প্রয়োজনীয় জিনিস তৈরি করতে বিভিন্ন ক্ষেত্রের দক্ষতার একত্রীকরণ দরকার। এর মধ্যে বিজ্ঞান যেমন থাকবে, তেমনই থাকতে হবে হার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা চিকিৎসা বিদ্যা। সেজন্যই হেলথকেয়ার ক্ষেত্রে স্টার্ট আপদের তেমন একটা দেখা যায় না বলে মনে করেন নটরাজন। তবে যাঁরা পারেন, প্রাপ্তিটাও বিশাল।

এইন্দ্রার জন্য এমনই একটা সম্ভাবনার জায়গা হল,সার্ভিকাল ক্যান্সার নির্ণয়ের প্রযুক্তির ব্যবস্থা করা। ভারতে হাজার-হাজার মহিলা সার্ভিকাল ক্যান্সারের শিকার হন। কিন্তু শুরুতে তাঁরা তা বুঝতে পারেন না। যখন বোঝেন তখন রোগ গভীর আকার নিয়েছে। কিন্তু শুরুতে যদি তা নির্ণয় করা যায় চিকিৎসার কাজটাও সহজ হয়ে যায়। প্রযুক্তিকে ঠিক এই কাজেই লাগাতে চায় এইন্দ্রা। এমন এক প্রযুক্তি যা স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বড়মাত্রায় পরিবর্তন এনে দেবে। যার উপকার পাবেন সব মহিলাই।

নন-ব্যাঙ্কিং ফিনান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনগুলিকেও (NBFI) পরিষেবা দিয়ে থাকে এইন্দ্রা। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে এমন একটি জিনিস তৈরি করেছে এইন্দ্রা, যার মাধ্যমে স্মার্টফোনকে কাজে লাগিয়েই ফিল্ড কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারবে নন-ব্যাঙ্কিং সংস্থাগুলি। পাশাপাশি এইসব সংস্থা যে হাজার হাজার ট্রেনিকে নেয়, তাদের বিষয়টি দহেেখার জন্যও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে থাকে এইন্দ্রা। তবে স্টার্ট আপদের নিয়ে সরকারি ভূমিকায় খুশি নন নটরাজনরা। তাঁদের কথায়, ব্যবসাগত সহায়তা পেতে গেলে কতরকম শর্তের মুখে পড়তে হয়। কত বছরের ব্যবসা, লাভজনক কিনা ইত্যাদি। কিন্তু পরিষেবার পরিবর্তে সময়ে টাকা মেলে না। মাথাচাড়া দেয় বিভিন্ন আমলাতান্ত্রিক সমস্যা। সরকারকে স্টার্ট আপদের বিষয়টি একটু অন্যভাবে দেখা উচিত বলেই মনে করেন তাঁরা।

টেলি-মেডিসিন ও টেক্সটাইল ক্ষেত্রেও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে থাকে এইন্দ্রা। গ্রামীণ ও পিছিয়ে পড়া এলাকার মানুষের জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক টেলিফোনে রোগীর সঙ্গে কথা বলবেন। সেইমতো চিকিৎসা করবেন। এখানে একটা প্রশ্ন ওঠে। ফোনের অপরপ্রান্তে সেই একই চিকিৎসক রয়েছেন কিনা, রোগী তা বুঝবেন কী করে। সেই সমস্যারও সমাধান করেছে এইন্দ্রা। ভিশন টেকনোলজির মাধ্যমে চিকিৎসকের মুখের ছবি তুলে ধরা হয় রোগীর সামনে। ফলে রোগী নিশ্চিন্ত হন। টেক্সটাইলস ক্ষেত্রে অ্যাডাপটিভ রোবোটিকসকে কীভাবে আরও উন্নত করা যায় সে ব্যাপারে কাজ চালাচ্ছে এইন্দ্রা।

তবে এইন্দ্রার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল, আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্স এখনও ভারতের সব জায়গায় একইভাবে ছড়িয়ে পড়েনি বা গুরুত্ব পায়নি। AI-র জন্য খরচ করে লাভ হবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বাণিজ্যমহলের। তবে নটরাজন বললেন, "AI হয়তো এখনও সাধারণ মানুষের জন্য তেমন কিছু করে উঠতে পারেনি। তবে কম হোক বা ছোট হোক, আমরা কিছু অন্তত করছি। আমাদের কাজ হয়তো খুব বড় কিছু নয়, তবে সেটাও একটা মৌলিক পরিবর্তন তো ঘটাচ্ছে।"