উদ্যোগপতি হিসেবে আমার সবচেয়ে বড় ভুল...

0

আমার গুরু আমাকে শিখিয়েছিলেন কোনও সমস্যার সঙ্গে কঠোর হতে এবং মানুষের সঙ্গে সবসময় নম্রভাবে কথা বলতে। কিন্তু ১৫ বছর পরেও আমি সেই কাজটা করতে শিখছি। আসলে বলা সহজ, কিন্তু কাজে করে দেখানো কঠিন। ২০০১ সালে আমি প্রথমবার এই পরামর্শর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলাম। আমার প্রথম সংস্থা, যা আমি কলেজ পাশ করার পরই প্রতিষ্ঠা করি, সেটি লাভের মুখ দেখতে পারেনি। অন্য একটি সংস্থা আমার কোম্পানি অধিগ্রহণ করায় সেই যাত্রায় খানিকটা মুখরক্ষা হয়েছিল। সেই সময় আমি সংস্থার সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্বব্যবহার করতাম। সেই মানুষগুলো, যারা তাদের জীবনের কতগুলো বছর শুধুমাত্র আমার মুখের দিকে তাকিয়ে, আমার শুরুয়াতি ব্যবসায় নিয়োগ করেছিলেন তাঁদেরকেও অকথা-কুকথা বলতে ছাড়িনি। আমার পুরো টিমের সঙ্গে আমার সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়। কেউ আমার সংস্থার উপর ভরসা করতে রাজি ছিলেন না। এই দুটি জায়গাই ফিরে পেতে আমার প্রায় এক দশক সময় লেগে যায়। সেই প্রথম আমি কোনও ভুল করেছিলাম, কিন্তু সেই শেষ নয়। আমি বিভিন্নভাবে সেই একই ভুল আরও কয়েকবার করেছি, এবং হয়তো ভবিষ্যতেও আবার করে বসব। যদিও প্রত্যেকটি ঘটনাই আমাকে মানুষ হিসেবে আরও এগিয়ে যেতে সাহায্য করে, তবু মনে হয়, আমার এখনও অনেকখানি পথ চলা বাকি রয়েছে। মানুষের সঙ্গে কঠোর হওয়াই একজন উদ্যোগপতি হিসেবে আমার সবচেয়ে বড় ভুল।

আসলে স্টার্ট আপের ক্ষেত্রে পরিবর্তনই একমাত্র সত্যি। The Lean Startup এর লেখক এরিক রাইজ শুরুয়াতি ব্যবসা সম্পর্কে বলেছেন, "এটি এমন এক প্রতিষ্ঠান যা চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার মধ্যেও কোনও প্রোডাক্ট বা পরিষেবা প্রদানের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।" যেকোনও পরিবর্তনকেই প্রতিরোধ করতে চাওয়া মানুষের সহজাত প্রবণতা। অনিশ্চিত সময়ে, যখন আমি জানি না এরপর কী হতে চলেছে, তখন সবসময় মনে হতে থাকে, হয়তো সবচেয়ে খারাপ পরিণতিই অপেক্ষা করে রয়েছে। আর এই মনে হওয়াটা কিন্তু আমার একার নয়। আমার নিজের মধ্যেই এই ভয়টা কাটিয়ে সেটাকে নতুন কিছু করার রোমহর্ষক অনুভূতিতে পরিবর্তিত করতে আমার অনেক সময় লেগেছে। এখন আর আমার কাছে নতুন কিছু করাটা ভয়ের নয়, বরং খানিকটা অ্যাডভেঞ্চার - আরও বড় কিছু করতে পারার উপায়। তবে একেবারে গভীরে কোথাও যেন খানিকটা ভয় থেকে গিয়েছে। প্রতিকূল সময়ে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বললে সেই ভয়টাই চাগাড় দিয়ে ওঠে। কোনও ঘটনায় আমাদের মনে যত না প্রভাব পড়ে তার চেয়ে অনেক বেশি প্রভাব ফেলে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন মানুষের প্রতিক্রিয়া। বিশেষ করে আমরা যাদের উপর নির্ভর করি, অথবা যাঁরা আমাদের উপর নির্ভশীল তাঁদের প্রতিক্রিয়ার প্রভাব আমাদের মনে সবচেয়ে জোরালো।

১৯৯৯ সালে আমরা প্রচুর আশা এবং স্বপ্ন নিয়ে আমাদের ব্যবসা শুরু করেছিলাম। আমাদের তখন মনে হতো আমরা 'দাপিয়ে বেড়াবো,' এই সংস্থাই হবে 'পরিবর্তনের প্রতীক' এবং 'এই জগতে আমরা নিজেদের চিহ্ন রেখে যাব।' সেইসময় ইন্টারনেটের রমরমা আমাদের এভাবে ভাবতে শিখিয়েছিল। সংবাদমাধ্যম এবং বিনিয়োগকারীরা আমাদের প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ডট কম-এর ফানুস ফাটতেই ইন্টারনেট সংস্থাগুলি চরম ক্ষতির মুখে পড়ল। শুরুয়াতি সংস্থাগুলিও তাদের প্রতিদ্বন্দীদের সঙ্গে হাত মেলাতে বাধ্য হল, কর্মী ছাঁটাই করে নতুন করে লাভের দিকে মননিবেশ করল। বিনিয়োগের পরিমাণ কমতে শুরু করল। সেই সময় যাঁদের স্টার্ট আপ ছিল তাঁদের ক্ষেত্রে ব্যবসার পাশাপাশি ব্যক্তিগত ক্ষেত্রেও এইসব বিষয়গুলি প্রভাব ফেলছিল। বাস্তবটাকে মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমার টিমের সদস্যদেরকেও পাওয়াই থেকে বেঙ্গালুরুতে সরে যেতে হয়েছিল। সংস্থার সহ-প্রতিষ্ঠাতারা তখন অধিগ্রহণ নিশ্চিত করতে দিনরাত সিলিকন ভ্যালিতে যাতায়াত করছেন। তার উপর অধিগ্রহণকারী সংস্থাটি নিজেও সেই সময় ব্যবসা এবং ম্যানেজমেন্ট উভয় ক্ষেত্রেই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তাতে সমস্যা বেড়েছে বই কমেনি।

একজন তরুণ এবং বুদ্ধিহীন উদ্যোগপতি হিসেবে আমি আমার টিমের সদস্যদের কথা না ভেবে, তাদের দৃষ্টিভঙ্গীতে কোনও বিষয় উপলব্ধি না করে আশা করছিলাম ঠিক যেভাবে আমি সেই মুহূর্তে সমস্ত বিষয় নিয়ে ভাবনাচিন্তা, পরিকল্পনা করছি তারাও সেটাই করবে। আমি যে উদ্যম নিয়ে, ভরসা দিয়ে তাদেরকে আমার সংস্থায় যোগ দেওয়ার কথা বলেছিলাম সেই একইভাবে কিন্তু এই অস্থির সময়ে তাদের সঙ্গে সময় কাটানো বা কথা বলার কোনও চেষ্টাই করিনি। একসময় তাদের মধ্যে থেকে একজন অভিযোগ করেছিল, সংস্থার প্রতিষ্ঠাতারা কর্মচারীদের কথা না ভেবে সিলিকন ভ্যালিতে পালিয়ে গিয়েছে। তিনি ভেবেছিলেন আমরা সংস্থার কথা, তাদের কথা না ভেবে ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির হিসেবনিকেশে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। আমার এতে অত্যন্ত তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। এবিষয়ে কোনও কথা না বলে, আমি ইয়াহু মেসেঞ্জারে (ডেটা কল কাজ করছিল না, আন্তর্জাতিক কল করা ছিল সাধ্যের বাইরে) কর্মীদের শুধুমাত্র অর্ডার দিতে থাকি। ফলে সকলেই ভাবতে শুরু করেন যে আমরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির কথা ভাবছি এবং তাঁদের কথা ভাবার আর কেউ নেই।

ভারতীয় স্টার্টআপ ইকিসিস্টেম একটি অনিশ্চিত পরিবর্তনের মদ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০০০ সালে খুব অল্প কয়োকজন ডট কম বাব্‌ল বার্স্ট-এর ফলাফল বুঝতে পেরেছিলেন। ২০০৮ সালে টেক স্টার্টআপের ক্ষেত্রে আরও অনেক বেশী সংখ্যক মানুষ ক্ষতির ,সম্মুখীন হয়েছেন। বর্তমান সময়ের এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আরও অনেক বেশী সংখ্যক স্টার্ট আপ, অন্ত্রপ্রেনিওর, কর্মী, কন্ট্রাক্টর, সাপ্লায়ার - সকলেই যাচ্ছেন। সামগ্রিকভাবে ভারতের টেক স্টার্ট আপের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল মনে হলেও আলাদা আলাদা করে প্রত্যেকটি সংস্থার ভবিষ্যৎ কিন্তু অনিশ্চিত। গত ১৮-২৪ মাসে আমরা বেশ কয়েকটি টালমাটাল দিনের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। উদ্যোগপতিদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কথোপকথনের জায়গা থেকেই আমার বিশ্বাস আমরা ফের একটা গোলকধাঁধায় প্রবেশ করতে চলেছি। এটা অনেকটা উদ্দাম, উশৃঙ্খল নিশিযাপনের পরের সকালের মতো। হঠাৎ হ্যাংওভার কাটিয়ে উঠে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে মায়ের অসংখ্য মিসড কল দেখতে পাওয়ার মতো। শুরুয়াতি ব্যবসার সঙ্গে যাঁরা জড়িত তাঁদের ভয় পাওয়ার কারণ নিশ্চয় আছে, তার কারণ খারাপ দিন আসবেই। কার ভুলে এই পরিণতি তা ভেবে, তর্ক করে লাভ নেই। পরিবর্তন যখন আসছে, তখন কীভাবে তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং তার মোকাবিলা করা যায় তার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। সব শক্তি সঞ্চয় করে সমস্যার কঠিন হাতে মোকাবিলা করতে পারলে লাভ হতে পারে।যদি তা হয়, তাহলে সকলকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ উদযাপন করবেন। আর যদি সমস্যার মোকাবিলা না করতে পারেন, তা হলেও যেন কয়েক বছর পর সকলে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বলতে পারেন যে, বিপদের মুখে আপনারা ভেঙে পড়েননি। একে অপরের সঙ্গে থেকে আরও এতগুলো বছর পেরিয়ে এসেছেন। মনে রাখবেন, সমস্যার সঙ্গে কঠোর হবেন, মানুষের সঙ্গে নয়।

লেখা - কাশ্যপ দেওরা

অনুবাদ - বিদিশা ব্যানার্জী