রমরমিয়ে নীল কলারবাজি, হিপ হিপ হুররে...

0

ভগবান এখন সারা বছর কাজ পান। প্রথমে দেওয়ালে পোস্টার আঁকতেন। একটা মরশুমে খুব কাজ থাকত। তারপর যে কে সেই। দিনের পর দিন দরিদ্র ভগবানকে বসেই থাকতে হত। ভগবান সিং ভায়া, বাড়ি রাজস্থানের ঝালওয়াড়ে।

ক্লাস টেনের পর পড়াশোনা ছেড়ে পোস্টার আঁকার কাজ শুরু করেন। কিন্তু সারা বছর পাওয়া যায় না সেই কাজ। তাই বছরের একটি বড় সময় কাটত রোজগার ছাড়াই। ঠিক করেন শহরে এসে রাজমিস্ত্রির কাজ করবেন। যোগ দেন ডায়মন্ড বিল্ডিং কেয়ারে (ডিবিসি), সেখানে শেখেন প্লাস্টারিং, জল নিরোধন আর বাড়ি তৈরির অন্যান্য কাজ। ভগবানের কপাল খুলে যায়।

“আমাদের নতুন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হত, নতুন জিনিস শিখতাম, বাজারে কি চলছে সে সম্পর্কেও জানতে পারি, এখন তাই, সারাবছরই কাজ পাই,” বলছিলেন ভগবান। 

একজন পোস্টার আঁকিয়ে থেকে ভগবান আজ নানা বিষয় দক্ষ এক মিস্ত্রি, আয়ও বেড়েছে অনেকটাই। ছেলে মেয়েকে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন দেখছেন ইদানিং।

ভগবান সিং ভায়া
ভগবান সিং ভায়া

ডিবিসি-র শুরু

ডিবিসি তৈরি করেন ইতিশা চৌহান ও আরশাদ খান। আইআইএম ব্যাঙ্গালোর থেকে পাশ করা ইতিশা বায়ু-সেনার প্রাক্তন আধিকারিক। আরশাদ ম্যানেজমেন্টে স্নাতক, বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ শিল্প সম্পর্কে ওয়াকিবহাল আরশাদ।

মুম্বই এর এক নামী আর্কিটেক্টের অফিসে গিয়েছিলেন ইতিশা ও আরশাদ। পাম্পের মিস্ত্রি, রঙের মিস্ত্রি, কনট্রাক্টররা কীভাবে কথার খেলাপ করেছেন তাই নিয়ে অভিযোগ জানাচ্ছিলেন সুপারভাইজাররা, কন্ট্রাক্টর আর ভেন্ডরদের সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল আর্কিটেক্টকে। সেই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দেখেই ইতিশাদের মনে হয় এমন একটি কোম্পানি প্রয়োজন, যারা বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত যাবতীয় পরিষেবা দেবে।

এইধরনের কোম্পানি শুরু করা মানে তৃতীয় কোনও কোম্পানি বা ব্যাক্তির সঙ্গে কাজ করতে হবে, নিজেদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ইতিশা ও আরশাদ ঠিক করেন, ডিবিসি-র নিজের কর্মী, পরিষেবা ও প্রয়োজনীয় উপাদান থাকবে। সেইজন্য তাঁরা তৃতীয় কোনও ব্যাক্তির ওপর নির্ভর করবেন না।

বিল্ডিং এন্ড কনস্ট্রাকশন শিল্পে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি মনযোগী ও বিশ্বাসযোগ্য টিম। ইতিশারা জানতেন তাঁদের একটি স্থায়ী টিম দরকার, যারা নিজেদের কাজ নিয়ে খুশি থাকবেন। তাই টিম তৈরির বিষয়টিকেই প্রাথমিক গুরুত্ব দেন আরশাদরা, বারবার কথা বলেন ব্লু কলার কর্মীদের সঙ্গে। বুঝতে চেষ্টা করেন তাঁদের আকাঙ্ক্ষা, তাঁদের সমস্যা।


কর্মীদের সঙ্গে ইতিশা চৌহান
কর্মীদের সঙ্গে ইতিশা চৌহান

ব্লু কলার কর্মীদের কথা মাথায় রেখে তৈরি ব্যবসার মডেল

“৭০ শতাংশের বেশি রং-মিস্ত্রী বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় ছাড়া কাজ পান না। বাকি সময়টা মজুরের কাজ করে কাটাতে হয় তাঁদের। বিল্ডিং এন্ড কনস্ট্রাকশন ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার, এরজন্য প্রয়োজন দক্ষ কর্মী। কিন্তু এই কর্মীদের এতরকম সমস্যার মধ্যে কাজ করতে হয় যে বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায় অন্যান্য পেশায় চলে যাচ্ছেন তাঁরা,” জানালেন ইতিশা।

ডিবিসি, রঙের কর্মীদের নিয়োগ করে তাঁদের ওয়াটার প্রুফিং, থার্মাল ইনস্যুলেশন, ভার্টিক্যাল গার্ডেনিং, পেস্ট কন্ট্রোল এরকম নানা বিষয় ট্রেনিং দেয়। এরফলে নানা বিষয় দক্ষতা বৃদ্ধি পায় তাঁদের। রঙ কর্মীরা যেহেতু ব্রাশের কাজে স্বচ্ছন্দ, তাই প্রথমে ব্রাশের কাজের ট্রেনিংই দেওয়া হয়। প্রথম সুবিধা হল সর্বক্ষণের চাকরি। “এটা সমাজে ওদের একটা পরিচিতি তৈরি করে, সম্মান বাড়ে। আমরা ওদের ইউনিফর্ম দিই, এবং তাঁরা নানা নতুন জায়গায় গিয়ে নতুন নতুন জিনিস শিখতে পারেন,” বললেন ইতিশা।

নিয়োগ করার আগে কড়া পরীক্ষার মধ্যে যেতে হয় কর্মীকে। প্রথমেই হয় ইন্টারভিয়্যু, ব্যবহার, কথা বলার দক্ষতা, পড়াশোনা ও কাজের দক্ষতা পরীক্ষা হয় এই পর্যায়। এরপর দেখা হয় তাঁর পরিচয় পত্র, ঠিকানা, অপরাধের রেকর্ড ও পুলিস ভেরিফিকেশন। এই সবকিছু সন্তোষজনক হলে কাজ দেওয়া হয় আবেদনকারীকে, প্রথম দুটি কাজের সময় কড়া নজর রাখা হয় তাঁর ওপর, নেওয়া হয় গ্রাহকের মতামত, গ্রাহক ও ডিবিসি কর্তৃপক্ষ খুশি হলেই চাকরি পান আবেদনকারী।

কর্মীদের আটকে রাখেনা ডিবিসি, তাঁরা চাইলে অন্য কোম্পানিতে যোগ দিতে পারেন। “আগে বর্ষার সময় রঙকর্মীদের কাজ থাকত না, কিন্তু ওয়াটার প্রুফিংএর কাজ শেখাতে সেই সমস্যা দূর হয়েছে। কারণ বর্ষার আগেই ওয়াটার প্রুফিং বেশি করানো হয়। আমাদের বিশ্বাস এখন বিভিন্ন বিষয় দক্ষতা তৈরি হওয়ায় বছরের প্রতিটি দিনই ওরা কাজ পাবেন”, বললেন ইতিশা।

ডিবিসি তার লক্ষ্যে পৌঁছতে সফল। ভগবান সিং গত পাঁচ বছর ধরে ডিবিসির সঙ্গে কাজ করছেন। তিনি জানালেন, “এই কোম্পানি আমাকে নিয়মিত কাজ দেয়,নতুন নতুন কাজ শিখিয়েছে, এদের হয়ে পাঁচ বছর হল আমি কাজ করছি ও আগামী দিনেও করব”। বর্তমানে ডিবিসি এর কাছে মোট ২৭৭ জন্য বিভিন্ন বিষয় দক্ষ কর্মী রয়েছেন এবং সারা বছরই কাজ পাচ্ছেন তাঁরা।