অনুপ্রেরণা ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে ব্র্যান্ড ‘প্রয়োগ’-এর বিশ্বায়ন

0

ম্যানহাটনের ব্রড অ্যাভিনিউ। নাইকি, রিবক, কোকা-কোলা, পেপসি, বিএমডব্লিউ, ভলভো-র মত আমেরিকা ও ইউরোপের নামি ব্র্যান্ডের বিলবোর্ডে ভরা। সেই সঙ্গে নিকন, ক্যানন, হোন্ডা, সনি, টয়োটার মত জাপানি ব্র্যান্ডের পাশাপাশি এলজি, স্যামসঙ, হুন্ডাইয়ের মত কোরিয়ান ব্র্যান্ডও রয়েছে। ২০০১ সালে এই পথে হাঁটতে হাঁটতেই নামি ব্র্যান্ডের ভিড়ে দেবের নজরে পড়ে পানীয় জলের বোতলের অনামি এক ব্র্যান্ড- ফিজি ওয়াটার। সামান্য পানীয় জলের অনামি এই ব্র্যান্ড সেদিন চমকে দিয়েছিল। বার বার ভাবতে বাধ্য করেছিল দেব ব্যানার্জিকে। আর সেই ভাবনার ফসল-প্রয়োগ ।

দেবের যাবতীয় কর্মকাণ্ড,গবেষনা সবই বিজ্ঞাপন নিয়ে। আট বছর ভারতে বিজ্ঞাপণ নিয়ে কাজ করার পর নিউইয়র্কে গিয়ে প্রথমে একটি অ্যাড এজেন্সি খোলেন দেব। পরে আরও একটি অ্যাড এজেন্সি খোলেন। আর মার্কিন মুলুকে ম্যানহাটনে ব্র্যান্ড ফিজি ওয়াটার খুলে দিল নতুন দিগন্ত। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের বিন্দুসম দ্বীপরাষ্ট্রের এক ব্যান্ড নামি ব্র্যান্ডের ভিড়ে জায়গা করে নেয়। ভারতের কোনও ব্র্যান্ড পারে না কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই জেদ চেপে বসে দেবের। বিশ্বায়নের বাজারে ভারতীয় কনজিউমার ব্র্যান্ড জায়গা করে নেবে। নামি দামি ব্র্যান্ডের ভিড়ে ভারতীয় ব্র্যান্ডের উজ্জ্বল উপস্থিতি তখন দেবের শয়নে স্বপনে।

দেব ব্যানার্জি
দেব ব্যানার্জি

দেব সঙ্গে পেলেন মালিকা বড়ুয়াকে। লিভাইস ইন্ডিয়ার হেড ডিজাইনার এই মালিকা। ফ্যাশন আর রিটেলিংয়ে বিশ বছরের বেশি অভিজ্ঞতা। ২০০১ সালে যোগার প্রেমে পড়ে যান মালিকা। তখন থেকেই অনুশীলনও চলে নিয়ম করে। কিন্তু একটা বিষয়ে বড় খুঁতখুঁতে ছিলেন মালিকা। সেটা হল মহিলাদের যোগার পোশাক – হয় সোয়েটপ্যান্ট, কিংবা স্পোর্টস ওয়্যার বা ট্র্যাক শুট এই পোশাকেই যোগার অনুশীলন চলে। কিন্তু শারীরিক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক এই তিনের মিশেল যোগার জন্য আরও ভাল কোনও পোষাকের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন মালিকা। যোগার জন্য সেরা পোষাক তৈরি করবেন এই মনস্থির করেই সামনের দিকে এগিয়ে চলেন তিনি। বলেন, যোগা নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। পোষাক হবে এমন যেখানে থাকবে না পলিস্টার, নাইলনের লেশ মাত্র।

মালিকা বড়ুয়া
মালিকা বড়ুয়া

যেমন ভাবনা তেমন কাজ। ভারত আর যোগা। যেন নাড়ির যোগ। বৈদিক যুগের আগে থেকেই যোগার সঙ্গে যোগ ভারতীয় ভূখণ্ডের। কেউ কেউ বলে থাকেন খ্রীষ্টের জন্মের পূ্র্বেই যোগার আবির্ভাব। তবে জনপ্রিয়তা ঊনবিংশ থেকে বিংশ শতকে। ১৯৮০ র পর পাশ্চাত্য দেশে শরীরচর্চা যোগা হিসেবে বেশ চল দেখা দেয়। কিন্তু ভারতীয় যোগার সঙ্গে এর একটু ফারাক রয়েছে। শুধু শরীরচর্চা নয়, ভারতীয় যোগসাধনায় আধ্যাত্মিকতার অমোঘ ছায়া। আর সেই ছায়াতেই বেড়ে উঠল ভাবনা। যে ভাবনা জুড়ে গেল পোশাকে। তৈরি হল যোগার জন্য ভারতীয় ব্র্যান্ডের বিশেষ পোশাক। ইকা যোগাওয়্যার প্রাইভেট লিমিটেডকে কিনে নিল প্রয়োগ নামে এক সংস্থা। সাল ২০১৩। সেই বছরই ফেব্রুয়ারি থেকে পোশাক প্রস্তুত শুরু। ২০১৫ সালের ২১ জুন, বিশ্ব যোগা দিবসে আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ প্রয়োগ ব্র্যান্ডের যোগা পোশাক।

প্রয়োগ কর্মীরা
প্রয়োগ কর্মীরা

কি বিশেষত্ব এই নতুন পোশাকের ? অন্যতম সহ প্রতিষ্ঠাতা দেব ব্যানার্জির মতে, নতুন এই পোশাক বাজারের বাকি যোগা পোশাককে পাল্টা চ্যালেঞ্জ জানাবে, পলিস্টার আর নাইলনের বিরুদ্ধে। যোগার পোশাক হবে ফেবরিকসের। শ্বাস-প্রশ্বাসের বিশেষ সুবিধা যুক্ত এই পোশাক যোগা অনুশীলনকে উদ্বুদ্ধ করবে। প্রয়োগের পোশাকে রয়েছে এক বিশেষ ফেবরিকস, যার নাম হাইপারব্রেথ। যা তুলো সহ বিভিন্ন জৈব বস্তু থেকে তৈরি। হাইপারব্রেথের সঙ্গে দশ শতাংশ লাইক্রা কাপড়ের স্থিতিশীলতা বাড়ায়। তুলোর সঙ্গে ত্বকের যোগ..সেখান থেকেই যোগা। ব্র্যান্ড প্রয়োগের পরিধিসীমা নারী। মহিলাদের যোগার পোশাকই তৈরি করে থাকে এই সংস্থা। ধুতির মতো খাটো প্যান্ট সঙ্গে টপ, কেপ্রি তো রয়েছেই। আর তা দিব্যি বিকোচ্ছে।

কেমন বাজার যোগা পোশাকের? সেভাবে বিশেষত্ব নেই। তবু ওরই মধ্যে ভাঙ্কুবারের লুলু লেমন, ওপরের সারির ব্র্যান্ড। সেই সঙ্গে প্রাণা,যোগা-সমোগা,নাইকি রিবক রয়েছে। এই বাজারে থাবা বসানোর প্রয়াস প্রয়োগের। মার্কেটিং হেড দেবের নজর ভারতের বাজারে আটকে নয়। সীমানা ছাড়ায়ে সাগর পাড়ে। মার্কিন মুলুকে। ই কমার্সের মাধ্যমেই ঘরোয়া বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে প্রয়োগের যোগা পোশাক। আমেরিকা, কানাডায় ব্যবসার পসার বেশ ভাল। ক্যালিফোর্নিয়া, নিউইয়র্কের পাশাপাশি দিল্লি এবং বেঙ্গালুরুতে সবচেয়ে বেশি বিক্রি। দেব আর সঞ্জয় তাঁদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে চাইছে বিশ্বের কোনায় কোনায়। ইতিমধ্যেই ডিজিট্যাল লঞ্চের জন্য তৈরি হয়েছে ওয়েব ফিল্ম। যোগার জন্মভূমি থেকে .... যেখানে সুর দিয়েছেন গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডজয়ী রিকি কেজ।

দেব ব্যানার্জি, মলিকা বড়ুয়ার সঙ্গে ভারতীয় ব্র্যান্ডের এই বিশ্বায়নের সংগ্রামে সঙ্গী ছিলেন সঞ্জয় নায়েক। আইআইটি খড়গপুর ও এবং আইএমএম কলকাতায় পড়াশোনা করা সঞ্জয় বর্তমানে সংস্থার সিইও। প্রয়োগে যোগ দেওয়ার আগে ভারতে ম্যাককন ওয়ার্ল্ড গ্রুপের সভাপতি ছিলেন ন বছর। ছিলেন প্রিয়াঙ্কথা আয়াঙ্গারও, প্রয়োগের ডিজাইন হেড।এনআইএফটি থেকে পাশ করা প্রিয়াঙ্কথা এর আগে লিভাইস স্ট্রস ইন্ডিয়ার ওয়েমনস সেকশনের প্রধান ছিলেন। সকলের সম্মিলিত প্রয়াসেই এ যেন প্রয়োগ প্রাপ্তি । বিশ্ব ব্র্যান্ডের বাজারে ভারতীয় ব্র্যান্ডের উজ্জ্বল উপস্থিতি। ম্যানহাটনের ব্রড অ্যাভিনিউ থেকে যে স্বপ্নের জাল বুনোট শুরু করেছিলেন... দেব।