কাজে সরস্বতী, ব্যবসায় লক্ষ্মী সরকার বাড়ির বউ বৃন্দা

2

দুর্গা পুজো মানেই দশটা হাতের একটা দেবী। অন্ধকার একটা অসুর। প্রতিমার মুখে অনেক আলো। ঢাল তলোয়ারের ফাঁক ফোকর গলে ঝলমল করে উঠছে সরস্বতীর বীণা, ময়ূরের পেখম, লক্ষ্মীর ঝাঁপি। আলতা পায়ে একটু একটু করে মা এগিয়ে আসছেন স্বর্ণালঙ্কার ভূষিতা শস্য শ্যামলা বাংলার লক্ষ্মী প্রতিমা। এ পুজো মানেই বাজারে গিজ গিজ করছেন ক্রেতা, অফার চলছে চুটিয়ে। এটা কিনলে ওটা ফ্রি। গয়নার দোকানেও ভিড় বাড়তে শুরু করছে। একটু একটু করে দেওয়ালির দিকে এগোচ্ছে উৎসব। এবার পুজোয় আপনাদের সামনে আসুক অন্যরকম দুর্গা। একা হাতে সামলাচ্ছেন পরিবার, পারিবারিক দায় দায়িত্ব আর ব্যবসা। দশভুজা যেন। সন্তানের মা। সুযোগ্য স্ত্রী, সকলের মন জুগিয়ে চলা ছেলের বউমা আর অসম্ভব দক্ষ এক উদ্যোগপতি। যার শক্ত হাতের মুঠোয় ধুলো বদলে গেছে সোনার রেণুতে। নাম বৃন্দা সরকার। এ সরকার জুয়েলার্সের কর্ণধার। চলুন সেই প্রতিমা দর্শন করে আসি।

বিয়ে করে যেদিন স্বামীর ঘরে পা রেখেছিলেন বৃন্দা তখন ভাবতেও পারেননি তাঁকে সাম্রাজ্য সামলাতে হবে। কত আর বয়স হবে তখন একুশ কি বাইশ বছর। পড়তেন গোখেলে৷ তারপর লোরেটো থেকে ইংলিশ অনার্স৷ ছোট থেকেই আঁকতে ভালোবাসতেন৷ লেখা পড়া আর ছবি আঁকার খাতায় জড়িয়ে থাকা সৃজনশীলতা অন্যভাবে পল্লবিত হল। শশুরমশাই চাইতেন বউমা তাঁর ব্যবসায় যোগদিন। গয়না বানানোর নকশা করতে বলতেন। পারিবারিক গয়নার দোকান। ১৯৫৫ সালে মাত্র সাড়ে তিনশ স্কোয়ারফুটের একটা ঘুপচি দিয়ে সেই দোকানের শুরু। রাজেশ্বর সরকার যখন দোকানটা চালু করেন সম্বল বলতে ছিল একটা সোনার আংটি। একটা সোনার বোতাম। আর কয়েকটা চেয়ার। স্ত্রীর বিয়ের সমস্ত গয়না বিক্রি করে শুরু করেছিলেন সোনার দোকান। পিতা পিতৃব্যের সোনার ব্যবসা। ডাক সাইটে এমবি জুয়েলার্স অ্যান্ড সন্স জুয়েলারস পরিবারের ছেলে। যখন নিজের ব্যবসা শুরু করলেন তখন সেটা শূন্য থেকেই। রাজেশ্বর সরকারের অনলস প্রয়াসে এ সরকার অ্যান্ড সন্স একের পর এক মাইল স্টোন পেরিয়েছে। চড়াই উৎরাই দেখেছে এই পরিবার। তারপর এখন হাল ধরেছেন পরিবারের পুত্রবধূ বৃন্দা। ব্যবসার জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সবটাই প্রায় একাই সামলান। নিজের হাতে ডিজাইন করেন। আর সেই ডিজাইনের সুবাদেই এ সরকার ব্র্যান্ড পৌঁছেছে অনতিক্রম্য উচ্চতায়। ঝর্ণা, বিদ্রি, আর্টওয়্যার, লিবার্টি বা গুলবাহার হাঁসুলি-নামগুলি বৃন্দার দেওয়া। নিজেই ডিজাইন করেছেন গয়নাগুলির। কোনওটা কানের দুল, কোনওটা গলার হার। প্রত্যেকটা আলাদা আলাদা। এক্সক্লুসিভ। ইউনিক। একটার সঙ্গে আরেকটার মিল নেই। গত ১৬ বছর ধরে এটাই সাধনা বৃন্দার।

২২ বছর বয়সে যখন বিয়ে হয় তখন থেকেই বাড়ির বউ হিসেবে সকলের খুব ভালোবাসা পান। সংসারের দায়িত্ব নিতে নিতে গোটা পরিবারে কাছে পরিচয় দিয়ে ফেলেন যে তিনি খুবই দায়িত্বশীল বুদ্ধিমতী এবং সৃজনশীল মানুষ। বছর তিনেকের মধ্যে ব্যবসার নাড়ি নক্ষত্র ধরে ফেলেন। তখন বয়স ২৫ কি ২৬৷ শ্বশুরমশাই বেশ আধুনিক মানুষ ছিলেন৷ তাঁকে হাতে ধরে কাজ শিখিয়েছেন, ব্যবসায় এনেছেন। প্রথম দিকে দোকানের গয়নাগুলোর ডিজাইন করতেন৷ তারপর আস্তে আস্তে ব্যবসার অন্য কাজেও জড়িয়ে গেলেন৷ এখন ওঁকেই সবটা দেখতে হয়। স্বামীও ভীষণই সাপোর্ট করেন। প্রথাগত ডিজাইনের বাইরে গিয়ে গয়নাকে কতভাবে রূপ দেওয়া যায় দেখিয়েছেন তিনি। বিভিন্ন শিল্পীদের পেইন্টিং করা সেগুন কাঠের ওপর সোনার কাজ করে জুয়েলারি বানিয়েছেন৷ এটাকে আর্টওয়্যার বলেন৷ এছাড়াও ব্ল্যাক জিঙ্কের ওপর সোনার কাজ করা একটা জুয়েলারি ডিজাইন করেছেন, নাম বিদ্রি৷ দোকানের কাস্টমর সামলানো শিখেছেন স্বামীর কাছ থেকে। আর এখন স্বামীকেই টেক্কা দেন। বলেন ওর নাকি কাস্টমর হ্যান্ডল করতে ভালো লাগে৷ ওরা কী চাইছে সেটা বুঝলে কাজের সুবিধা হয়, নতুন ডিজাইন মাথায় খেলতে থাকে।

হাসি মেখে বৃন্দা বললেন, ‘ছোটবেলা থেকে সাজগোজের সেন্সটা ছিল৷ নিজে সাজতে ভালোবাসি৷ বিয়ের পর নিজের জন্য যে গয়নাগুলো ডিজাইন করতাম সেগুলোই দেখতাম কাস্টমররা অর্ডার দিচ্ছেন৷ সেখান থেকেই ধীরে ধীরে কনফিডেন্স তৈরি হয়’।

এরই মধ্যে টলিউডে পা রেখেছেন সরকার বাড়ির গৃহিণী। ‘কাদম্বরী’র গয়না ডিজাইনিংয়ের দায়িত্ব টালিউডে বৃন্দার বড় ব্রেক। ‘পুরোটাই ছিল রিসার্চ ওয়ার্ক৷ গয়নাগুলো ডিজাইন করতে প্রায় এক মাস লেগেছিল৷ বই পড়ে, সিনেমা দেখে ঠাকুরবাড়ির অনেকের সঙ্গে কথা বলে ঠাহর করতে পেরেছেন কাদম্বরী দেবীদের সাজগোজের গতি প্রকৃতি। একটা ওয়েস্টার্ন ইনফ্লুয়েন্স ছিল৷ খুব শৌখিন ছিলেন৷ প্লিট করে শাড়ি পরে ব্রোচ লাগাতেন৷ সিনেমার জন্য ডিজাইনিংয়ের সময় এই বিষয়গুলোই মাথায় রেখেছিলেন তিনি।

এবার ব্যবসা বাড়ানোয় মন দিয়েছেন সরকার বাড়ির পুত্রবধূ। টালিউডের ব্রেকটা যদি একটা মাইলস্টোন হয়ে থাকে বৃন্দা জানেন আরও অনেকটা পথ পেরোতে হবে তাঁকে। কারণ তিনি থেমে থাকতে চান না। শ্বশুরমশাই যে ভরসা করে পুত্রবধূকে ব্যবসায় এনেছিলেন সেই ভরসা রেখেছেন বৃন্দা। এখান থেকে এ সরকারকে সাফল্যের আরও শিখরে পৌঁছে দেওয়াই লক্ষ্য তাঁর। দুই সন্তানের মা, ঘর-ব্যবসা, দুটোই সামলান সমান তালে। সকালে দোকানে থাকলে বিকেলটা বাচ্চাদের সঙ্গে থাকেন৷ নিজের সংস্থারও পরিবারের মতোই যত্ন নেন। প্রত্যেকটা কর্মীর সুবিধা অসুবিধার খোঁজ নেন। মহিলা কর্মীদের সবসময় বলেন, নিজের পায়ে ঠিকমতো দাঁড়ানোর কথা। কারণ মহিলাদের স্বনির্ভর হওয়ায় বিশ্বাস করেন বৃন্দা।