প্রজ্ঞা আর সুর দিয়ে ব্যথায় প্রলেপ দেন সাঁই কৌস্তুভ

3

শরীরের চৌহদ্দির ভিতর এক অশরীর বাস করে। ধর্ম একথার একরকম সুবোধ্য অথচ জটিল ব্যাখ্যা হয়ত করে, কিন্তু দার্শনিক সেই ব্যাখ্যার অধিক জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছেন শিলিগুড়ির ছেলে কৌস্তুভ। কৌস্তুভের শরীরের সঙ্গে সেই অশরীরের নিত্য সংঘাত। ইংরেজিতে যাকে বলে tug of war, কখনও শরীর জিতছে আবার কখনও জিতছে তাঁর একান্ত অশরীর। সেই অক্ষর পুরুষের দৃঢ় কঠিন শক্তি নব্বই শতাংশ শারীরিক ভাবে প্রতিবন্ধী কৌস্তুভকে চূড়ান্ত সফল, অত্যন্ত জনপ্রিয় সাঁই কৌস্তুভে উন্নীত করেছে। আজ শোনাবো ছাব্বিশ সাতাশ বছরের এই তরুণের হাড়ভাঙা প্রসন্নতার কাহিনি।

কৌস্তুভ দাশগুপ্ত। শিলিগুড়ির দেশবন্ধু পাড়ার এই ছেলেটি ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন বড় হয়ে নৃত্যশিল্পী হবেন। জন্মগত প্রতিভা ছিল। টিভির পর্দায় নৃত্যের কোনও মুদ্রাই ওর চোখ এড়িয়ে যেত না। দুধের শিশু কৌস্তুভ যে নাচ দেখতেন তা আয়ত্ত করে ফেলতেন। অনেক অনুষ্ঠানেও নৃত্য করেছেন কৌস্তুভ। যে বা যারা তাঁর নৃত্যের ভঙ্গিমা দেখেছেন সকলেই ধন্য ধন্য করেছেন। বাড়িতে সাংস্কৃতিক পরিবেশ ছিল। বাবা কৌশিক সাংবাদিক। ঠাকুমা অপূর্ব গাইতেন। মা শিলা দাশগুপ্ত এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সঙ্গীতে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই নাচ গানের আবহ পেয়েছিলেন। কিন্তু ডাক্তারের বক্তব্য ছিল নাচ নয়। অন্য কিছু শেখান, কারণ খুব বেশিদিন ও আর হাঁটা চলা করতে পারবে না। কতই বা বয়স হবে তখন তিন সাড়ে তিন। ডাক্তার জানান ওর একটি বিরল ব্যাধি আছে। নাম অস্টিওজেনেসিস ইম্পারফেক্টা। অন্য নাম ব্রিটেল বোন ডিজিজ।

অনেকেই জানেন না, এই ব্যাধির কথা। মূলত জিনগত ব্যাধি এটি। পনের হাজারে একজনের এই রোগ হতে পারে। হাড়গুলো ভাঙতে থাকে। চোখের সাদা অংশটায় নীল ছোপ পড়ে। শ্রবণেন্দ্রিয় বিকল হয়ে যায়। দাঁতের কাঠামো বদলাতে থাকে। চলাচল করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন রোগাক্রান্ত। ফলে শরীরটা অথর্ব হয়ে পড়ে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের সামগ্রিক অগ্রগতির পরও এই বিরল ব্যাধির কোনও নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। যন্ত্রণা নিরাময়ের ব্যবস্থা সম্ভব। মূল হাড়গুলি যাতে না ভেঙে যায় তার জন্যে শল্য চিকিৎসা করে তাতে ধাতুর নল দিয়ে জোড়াতালি দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু আশ্চর্য কথা হল সম্পূর্ণ নিরাময়ের কোনও সমাধান সূত্র চিকিৎসা বিজ্ঞানের কাছে এখনও নেই।

ইতিমধ্যেই কৌস্তুভের শরীরের বিভিন্ন অস্থি-সন্ধি অকেজো হয়ে গিয়েছে। এখন স্বয়ংক্রিয় হুইলচেয়ারে বসেই দিনের অধিকাংশ সময় কাটান। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় পঞ্চাশটিরও বেশি হাড় ভেঙে গিয়েছে। ডান হাতের কব্জিটা বহুদিন হল দুমড়ে আছে। ডান হাতের হাড়টাই সবার আগে ভাঙে। সাড়ে তিন বছর বয়সে। বাঁ হাতের দুটো আঙুল ছাড়া আর কোনও অঙ্গ সঞ্চালন করতে পারেন না কৌস্তুভ।

তাই নিয়েই দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। বিষণ্ণ মানুষের কাছে তিনিই প্রেরণা। মেধাবী সুবক্তা এই মানুষটাই ভালোবাসার স্নিগ্ধ হাসি ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তাঁর সঙ্গীত দিয়ে জ্ঞানের গভীরতা থেকে উপলব্ধি করা বানী দিয়ে চাঙ্গা করে দিচ্ছেন আপামর জনতাকে। দুর্ভাবনায়, গ্লানিতে নুইয়ে পড়া মেরুদণ্ডে তার বানীই সঞ্জীবনী সুধার ইনজেকশন। আরও অনেক পরিচিতি বাকি আছে কৌস্তুভের। ইন্টারনেটে কথা হচ্ছিল। কীভাবে শরীরের সঙ্গে লড়ে স্পর্ধিত মাথাটা তুললেন, সেই সব কথাই বলছিলেন সাঁই কৌস্তুভ। এখন গোটা বিশ্ব তাঁকে এই নামেই চেনে। নিখুঁত মস্তিষ্কটা ক্রমাগত লড়ছে সমস্ত অপারগতার সঙ্গে। আর প্রতিটি বিজয়ে তিনি দেখতে পান তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন হিরণ্ময় পুরুষ। একের পর এক বাধা টপকে যাওয়ার সাহস দিচ্ছেন যেন। তখন তাঁর মন ছোটে হাওয়ার বেগে।

আমাদের আজকের কাহিনির নায়ক সাঁই কৌস্তুভ পুত্তাপার্তিতে থাকেন। সাঁই বাবার সান্নিধ্য ওকে সাধারণ রোগাক্রান্ত থেকে ইস্পাত কঠিন প্রতিভাধর মানুষে রূপান্তরিত করেছে। ফুলের পাপড়ি খোলার মতো করে তার প্রতিভার বিকাশ হয়েছে ক্রমান্বয়ে। নিজেকে প্রমাণ করেছেন এই যুবক। নৃত্যের প্রতিভা থাকলেও নৃত্য বন্ধ হয়ে গিয়েছে শৈশবে। শরীর ওঁকে প্রতারণা করেছে। কিন্তু কোনও যন্ত্রণাই ওর মুখের অমলিন হাসিটা কেড়ে নিতে পারেনি। শরীরের সঙ্গে লড়াইয়ে ওর বিবেক, হৃদয় আর মন সবসময় পরাক্রমের সঙ্গে জয় লাভ করে।

ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতের চর্চা শুরু করে দেন তিনি। প্রথমে ঠাকুমার কাছে। তারপর মায়ের কাছে। তারপর ভিণ্ডি বাজার ঘরানার প্রখ্যাত শিল্পী কুমুদিনী মুন্ডকরের কাছে। ছোটবেলা থেকেই আকাশবাণী, দূরদর্শনে নিয়মিত গান গেয়েছেন। পুরস্কারও পেয়েছেন অনেক। অনুপ জলোটা, অনুরাধা পোড়ওয়েল, মান্না দের মত শিল্পীদের সঙ্গে গান গাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। ক্যাসেটও প্রকাশিত হয়েছে বেশ কয়েকটি। শিলিগুড়িতে থাকা কালীন ১৯৯৭ সালে এবং ১৯৯৯ সালে দুটি ক্যাসেট প্রকাশিত হয়। একটির নাম মা, এবং অন্যটির নাম অর্ঘ্য। তারপর পুত্তাপার্তিতে চলে আসার পর থেকে সাঁই বাবার ঘনিষ্ঠতা পান। ১৯৯৬ সালে প্রথম দর্শন হয় সাঁই বাবার সঙ্গে। সেই থেকেই জীবনের দিশা খুঁজে পান তিনি। সাঁই বাবার স্নেহের পরশ মন্ত্রের মত কাজ করে। শরীরের সঙ্গে লড়াই করার শক্তি খুঁজে পান ছেলেটি। শরীরকে তাচ্ছিল্য করার স্পর্ধাও। পড়াশুনোর পাশাপাশি একটু একটু করে শিখে ফেলেন কম্পিউটার। সাঁই বাবার প্রেরণায় ইন্টারনেটের সঙ্গে পরিচয় হয়। অনলাইনেই ইউটিউব টিউটোরিয়াল দেখে শিখে ফেলেন গ্রাফিক্স ডিজাইনিং। ২০০৯ সাল থেকে ক্রমাগত বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ডেস্কটপ ডিজাইন করতে শুরু করেন। ২০১২ সালে তাঁর ডিজাইন করা ডেস্কটপ সাঁই বাবার নামে উৎসর্গ করেন। এবং রেডিও সাঁইকে দেওয়া হয়। তারপর থেকেই রেডিও সাঁইয়ের সোশ্যাল মিডিয়া টিমের ডিজাইনিং করার পাকাপাকি কাজ পান তিনি। পরিচিতি বাড়তে থাকে। ওর ক্লায়েন্টরা জানালেন সময়ের ব্যাপারে দারুণ নিষ্ঠাবান সাঁই কৌস্তুভ পাশাপাশি দারুণ সৃজনশীলও। ফলে তরতর করে এগিয়েছেন তিনি। পরিচিতি যত বেড়েছে পসারও বেড়েছে কৌস্তুভের। সব সময় বাবা মাকে পাশে পেয়েছেন তিনি। আর বিশ্বাস করেন অদৃশ্য-লোক থেকে সারাক্ষণ তাঁর সমস্ত কাজের খতিয়ান নিচ্ছেন স্বয়ং সাঁইবাবা। এই বিশ্বাসই তাঁর কাজের দক্ষতাকে শতগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সমস্ত কাজই তাঁর কাছে উপাসনার অংশ হয়ে উঠেছে।

প্রেরণাদায়ক সুবক্তা হিসেবে প্রচুর সম্মান পেয়েছেন সাঁই কৌস্তুভ। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবে। তাঁর অসুস্থতা তাঁকে দুর্বল করে দিতে পারেনি। বরং তিনি মনে মনে সুস্থ মানুষের চেয়ে অধিক সুস্থ। চিত্ত ভয় শূন্য। কারণ নিজের অহংকে, নিজের সমগ্র প্রতিভাকে ঈশ্বরের চরণে সমর্পণ করতে চেয়েছেন সাঁই কৌস্তুভ। তাঁর প্রসন্ন হাসির ভিতর দিয়ে সেই দিব্য সমর্পণের আনন্দই যেন ছড়িয়ে পড়ে আলোর মত।