রেস্তোরাঁয় ছাড় পেতে খাদ্যরসিকদের সাহায্য করছে ছাত্র উদ্যোগপতিরা

0

ফুড-টেক ইন্ডাস্ট্রি যে খুব একটা ভালো সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে না সেকথা কারও অজানা নয়। আপনারা হয়তো টাইনিআউল এবং জোম্যাটো-র কর্মী ছাঁটাইয়ের কথা শুনেছেন। কিন্তু এইসব বিষয় সত্ত্বেও ফুডটেক ইন্ডাস্ট্রির কিন্তু এদেশে পরিধি বিস্তারের যথেষ্ট ক্ষমতা এবং সম্ভাবনা রয়েছে। তার কারণ সকলেই সময় পেলে বাইরে খেতে, পার্টি করতে অথবা বাইরে থেকে খাবার অর্ডার করতে পছন্দ করি। আর সবকিছুর পাশাপাশি এটাও ঠিক যে, আমরা, অর্থাৎ ভারতীয়রা কিন্তু ছাড় বা বিশেষ ডিসকাউন্ট পেতে একটু বেশিই ভালোবাসি।

বিভিন্ন রেস্তোরাঁ এবং খাদ্যরসিকদের জন্য উদ্যোগপতিরা সবসময়ই নতুন নতুন পরিকল্পনা করে চলেছেন। জোম্যাটো অনলাইনে এই ক্ষেত্রে অনেক কাজ করেছে তবে এখনও আরও অনেক কিছুই বাকি রয়ে গেছে। নতুন সংস্থাগুলির জন্য এই বাজারে এখনও অনেক খালি জায়গা রয়েছে এবং এক্ষেত্রে নতুন ধরণের কাজ করারও সুযোগ রয়েছে।


আমাদের দেশে ডাইনিং আউট কালচার ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে। আজকের দিনে আমাদের দেশে গড়ে কোনও মানুষ মাসে তিন থেকে চারবার বাইরে খাবার খেতে যান, এবং প্রতিবার গড়ে ১,৫০০-২,৫০০ টাকা খরচ করেন। একথা ভুললে চলবে না যে বিলে VAT, সার্ভিস ট্যাক্স, সার্ভিস চার্জ-এর মতো বিষয়গুলি যুক্ত হয়ে বিলের পরিমাণ আরও অন্তত ৩০ শতাংশ বাড়িয়ে তোলে। ফলে, বাইরে খেতে গেলে ট্যাঁকের টান এড়াতে অনেকেই কিন্তু ডিসকাউন্টের দিকে তাকিয়ে থাকেন।

কিন্তু বিশেষ ডিল খোঁজা এবং চাহিদা অনুযায়ী কুপন খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত ঝক্কির বিষয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় কুপনের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে বা তা ব্যবহারের জন্য খুব অল্প সময় হাতে রয়েছে। কোনও কুপন পেলেই হল না, তার সত্যতা যাচাইও জরুরি। তা নাহলে খাওয়াদাওয়া হয়ে যাওয়ার পর আপনাকে রেস্তোরাঁয় সকলের সামনে অপ্রস্তুতে পড়তে হতে পারে। Eazydiner এবং Dineoutএর মতো ওয়েবসাইটগুলি তুলনামূলকভাবে ভালো কুপন দিলেও এখানে ডিসকাউন্টের পরিমাণ কিন্তু নির্দিষ্ট।

একের পর এক গজিয়ে উঠতে থাকা ফুড টেক সংস্থার এই ভিড়ের মধ্যেও কিন্তু Pocketin নামে ছোট্ট একটি সংস্থা ধীরে ধীরে সকলের নজরে পড়ছে। এটি একটি রিয়েল টাইম বার্গেনিং অ্যাপ, যা বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় ছাড় পেতে সাহায্য করে। এটি যেকোনও ব্যক্তিকে কোনও রেস্তোরাঁর সঙ্গে তাৎক্ষণিক দরদাম করতে সাহায্য করে এবং খুব অল্প সময়ে টেবিল বুক করতেও সুবিধা হয়।

কীভাবে Pocketin চালু হল? জানালেন অনিরুদ্ধ। "কলেজে পড়ার সময় আমরা মাঝেমাঝেই বাইরে খেতে যেতাম। ছাত্রাবস্থায় সকলেরই হাতখরচ বেশ কম থাকে। ফলে আমরা ভালো জায়গায় খেতে যাওয়ার আগে সবসময় বিশেষ অফার বা ডিসকাউন্টের খোঁজ করতাম। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অসুবিধা ছিল, আমাদের সময় এবং দিন অনুযায়ী কুপন পাওয়া। যদি বা তা পাওয়া যেত, রেস্তোরাঁর ম্যানেজাররা সেই কুপনকে সত্যি বলে মানতেই চাইতেন না।

অনেক ম্যানেজারের সঙ্গেই চেনা জানা হয়ে গিয়েছিল। আমরা অনেকসময় তাঁদের ফোন করে দরদাম করতাম। কিন্তু আপনাকে যদি পাঁচটি রেস্তোরাঁয় দরদাম করতে হয়, তাহলে আলাদা আলাদা পাঁচটি জায়গার ম্যানেজারকে ফোন করতে হবে। প্রতি ক্ষেত্রেই সেই একই আলোচনা প্রথম থেকে শুরু করতে হতো।" এই সমস্যার সমাধান করতেই তাঁরা এমন এক প্ল্যাটফর্ম প্রস্তুত করেন যা এই পুরো আলোচনায় সাহায্য করবে এবং ব্যবহারকারীর বাজেট এবং সময়ের উপর ভিত্তি করে তাকে সঠিক জায়গা বেছে দেবে। অনিরুদ্ধ বললেন, "এর ফলে বারবার বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় ফোন করার কোনও প্রয়োজন নেই। এই Pocketin অ্যাপ ব্যবহার করে আপনি একসঙ্গে কয়েকশো রেস্তোরাঁর সঙ্গে দরদাম করতে পারেন। "

Pocketin নানা ধরণের ছাড় দিয়ে থাকে। যেমন আপনি যদি নন-পিক আওয়ারে এই অ্যাপে কাজ করেন সেক্ষেত্রে পিক আওয়ারের চেয়ে অনেক বেশি ছাড় পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর কী পেতে পারেন? আপনি কোনও রেস্তোরাঁয় যে ছাড় পাচ্ছেন তার চেয়ে বেশি ছাড় চাইলে Pocketin টিম আপনাকে তা পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে। এঁরা কোনও ডিসকাউন্ট বা কুপনের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ নির্ভরযোগ্য। আপনি রেস্তোরাঁয় ঢুকলেই আপনার পৌঁছনোর খবর সার্ভারে ধরা পড়বে এবং আপনার টেবিল সংরক্ষণ হয়ে যাবে।

তিনজন ইঞ্জিনিয়ার, যাঁরা এবছরই স্নাতক হয়েছেন, তাঁদের হাত ধরেই Pocketin-এর সূচনা। তরুণ ছাত্র উদ্যোগপতিদের অংশগ্রহণে আরও মজবুত হয়েছে এদেশের স্টার্ট আপ ইকোসিস্টেমের ভিত। অনিরুদ্ধ থাপার ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক হয়েছেন। অন্যদিকে ক্ষীতিজ এবং রাহুল দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। কেউ কেউ অবশ্য সদ্য স্নাতক উদ্যোগপতিদের জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই পারেন, তবে এই সংস্থার প্রতিষ্ঠাতারা কিন্তু অন্যরকম ভাবেন। ক্ষীতিজ বলছেন, "আমাদের বয়সে যে উদ্যম আর ইচ্ছে থাকে তা অতুলনীয়। আমরা খুব বেশি ভাবনাচিন্তা না করেই অনেক ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত থাকি। আমরা যতটা সময় আর পরিশ্রম দিয়ে কাজ করি তা শুধু নতুন বলেই সম্ভব।"

কথায় আছে কোনও কাজ শুরু করার সঠিক সময় বলে কিছু হয় না। এই তিনমূর্তিও জানতেন তাঁরা এটাই করতে চান। সেই কারণেই বড় চাকরির প্রলোভন ছেড়ে তাঁরা নিজেদের উদ্যোগকে প্রতিষ্ঠিত করার কাজে নিয়োজিত হয়েছেন। রাহুল এর আগে অ্যামজনে কাজ করতেন। প্র্যাক্টোর মতো সংস্থার কাছ থেকে ডাক পাওয়া সত্ত্বেও সেখানে কাজ করেননি অনিরুদ্ধ।

প্রথম তিনমাস অক্লান্ত পরিশ্রমের পর অবশেষে ব্যবহারকারী এবং রেস্তোরাঁ - দুই তরফেই ভালো সাড়া মিলছে। ইতিমধ্যেই তাঁদের অ্যাপের ডাউনলোডের সংখ্যা ৫,০০০ ছাড়িয়েছে। এই প্ল্যাটফর্মে রেস্তোরাঁর সংখ্যাও এখন শতাধিক।

গত তিনমাসে অন্তত ৫৫০ জন ব্যবহারকারী এই অ্যাপ ব্যবহার করেছেন। মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে পৌঁছনই এই সংস্থার লক্ষ্য।

প্রাথমিকভাবে পরিবার এবং বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে সাহায্য নিয়েই কাজ শুরু করেছিলেন অনিরুদ্ধরা। নতুন বিনিয়োগ আসলে আগামী বছরের মধ্যে ২লক্ষ ট্রানজাকশন পূরণ করতে পারবে বলে আত্মবিশ্বাসী এই সংস্থা। এর ফলে সংস্থার ব্যবসার পরিমাণ ৪২কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

লেখা - পরদীপ গোয়েল

অনুবাদ - বিদিশা ব্যানার্জী