সারাদিন স্টিয়ারিং, সারারাত পেইন্টিং

গ্যালারিতে ক্যানভাসে অনেক রাস্তার ছবি দেখেছেন। ট্যাক্সির ছবি। পুরনো রঙচটা গাড়ির ছবিও। কিন্তু কখনও ভেবেছেন কোনও গাড়িচালক হাতে রঙতুলি নিয়ে ফুটিয়ে তুলছেন একের পর এক ছবি। সেগুলোয় ফুটে উঠছে অন্যরকম রাস্তা। কল্পনা মেশানো স্বপ্নচারীর মতো সেই রাস্তায় সে একাকী এবং নির্জন। এরকমই এক অনন্য শিল্পী অভিজিত দত্ত। কলকাতার বাসিন্দা।

0

লোকের গাড়ি চালিয়ে মাস ফুরোলে আয় বলবার মতো কিছু নয়। দিনে ১০ ঘণ্টা গাড়ি নিয়ে এ গলি সে গলি করেন। আর রাতে ঘরে ফিরে শিল্পের রাজপথে ছোটে তাঁর নিজস্ব ফিটন। ছবির জন্যে একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতি দিয়েছে আমেদাবাদের কোলাবর আর্ট গ্যালারি। তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে বেশ কিছুদিন ধরে প্রদর্শিত হচ্ছে অভিজিতের হাতে আঁকা সাতটি ‌পেইন্টিং। নয়াদিল্লির গ্যালারি কাত্যায়ণী, ললিতকলা একাডেমি, রাজধানীর ধোবিমল আর্ট গ্যালারিতে অভিজিতের ছবি বিভিন্ন সময়ে প্রশংসিত হয়েছে।

বছর চল্লিশের অভিজিতের রক্তে ছবি। ঠাকুরদা খগেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন বিশিষ্ট শিল্পী। কলকাতার সরকারি আর্ট কলেজ থেকে সে যুগে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে উত্তীর্ণ হন। পরে শিল্প ছেড়ে ড্রাফটসম্যান হিসাবে চাকরি করতে বাধ্য হন জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ায়। বাবা একসময় সেলাইয়ের কাজ করতেন। শারীরিক কারণে বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল সে কাজে অবসর নিয়েছেন। ফলে, সংসারের একমাত্র রোজগেরে সদস্য অভিজিত। ওর ওপর অনেকগুলি মানুষের দায়দায়িত্ব। বাবা-মা-স্ত্রী ও আট বছরের ছেলেকে নিয়ে পরিপূর্ণ সংসার। 

ঠিক কবে থেকে ছবির জগতে ঢুকে পড়ছেন, তা অভিজিতের মনে পড়ে না। তবে, শৈশব থেকেই বোধ হয়। কারণ ওর মনে আছে ছোটবেলায় খুব ছবি আঁকতেন। যত বড় হয়েছেন রংতুলি আর ক্যানভাস ওকে টানতে থাকল। কিন্তু, সব শিল্পীকে হতাশ করা প্রবাদ বাক্য 'শুধু শিল্প দিয়ে পেট চলে না' অক্ষরে অক্ষরে লেগে গেল ছেলেটার কপালে। গরিব বাবার সেলাই মেশিনের চাকাই এতদিন সংসারের চাকা ঘুরিয়েছে। এখন ওর হাতে সংসারের স্টিয়ারিং। কিন্তু মনের ক্যানভাসে রংতুলি অন্য ছবি আঁকে অভিজিতের। দিনটা তাই দুভাগে ভাগ হয়ে যায়। সারাদিন গাড়ি। আর বাড়ি ফিরে সারারাত চিত্রকর তার চিলে কোঠায় বসে ছবি আঁকেন।

অভিজিত বলছিলেন, "আঁকার জন্য মোটা টাকা খরচ হয়। গাড়ি চালিয়ে ঘর চালানোই দায় তার ওপর মনের খিদে মিটবে কী উপায়। তাই খুব টানাটানির মধ্যেই কোনও ক্রমে দিনগত পাপক্ষয় করতে হয়।" অভিজিতের পরিবারের মানুষজন, বিশেষ করে তাঁর স্ত্রী‌ নন্দিতা স্বামীকে ছবি আঁকার প্রেরণা জোগান। "আমি জানি, একদিন ও অনেক বড় শিল্পী হবে। তাই, কোনও কষ্টই আর গায়ে মাখি না।" শাড়ির আঁচলে মুখ মুছতে মুছতে বলছিলেন নন্দিতা। বলছিলেন, "জানেন ও শুধু টাকার অভাবে কত সুযোগ হারিয়েছে। মাধ্যমিক পাশ করার পর শান্তিনিকেতনের কলাভবনে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল অভিজিত। কিন্তু সেখানে পড়তে তো টাকা লাগে। অন্তত মাসে হাজার পাঁচেক টাকা তো বটেই। কে দেবে অত টাকা। কেউ এগিয়ে আসেনি। তাই শান্তিনিকেতন মাথায় থাকল।" গরিবের ছেঁড়া কাথায় শুয়ে নন্দলাল বোস হওয়া যায় না এই কথা মনে মনে বিশ্বাস করে নিজের প্রতিভার সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করতে বাধ্য হন অভিজিত। কিন্তু তাই বলে থেমে থাকেননি। আঁকা বন্ধ করে দেননি। 

পাপ, পারা আর প্রতিভা চাপা থাকে না। একলব্যের মত নিজে নিজেই পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে গেছেন আঁকার সঙ্গে। কখনও চারকোল কখনও জল রঙ। যেমন পেয়েছেন যেভাবে পেরেছেন একের পর এক সাবঅলটার্ন মাস্টারপিস এঁকে গেছেন এই শিল্পী। বেশিদূর লেখাপড়াও চালাতে পারেননি। মাধ্যমিক পাশ করার পরেই ড্রাইভিং শিখেছেন।  সতেরো বছর ধরে লোকের গাড়ি চালাচ্ছেন। বলছিলেন গাড়ি চালাতে চালাতেই মনে ছবি আসে। মনে মনেই আঁকি। এত কিছুর পরও গোটা দুনিয়াকে এখনও শিল্প বলে মনে করেন অভিজিত। ভ্যান গঘের কথা বলছিলেন, ওঁর কাজ ওঁকে অনুপ্রাণিত করে। বলছিলেন সেভাবে প্রথাগত শিক্ষা ছাড়াই তো গঘ পেরেছেন। আলতামিরার গুহা চিত্র যারা এঁকেছিলেন তাঁরা কি কোথাও আকা শিখতেন? আঁকা শেখার সব সময় প্রয়োজন পরে না। প্রকৃত শিল্পীকে প্রকৃতিই আঁকা শিখিয়ে দেয়।

চারপাশের মানুষই ওর ছবির মূল উপজীব্য। এছাড়া পুতুলনাচ আর ঘোড়া নিয়ে অভিজিত ধারাবাহিকভাবে আঁকছেন। নারীও আঁকছেন ক্রমাগত। সময় পেলেই ছবি দেখতে ছোটেন। সুযোগ পেলেই ওল্ড মাস্টার পেইন্টিং উল্টে পাল্টে দেখেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন কীভাবে আঁকা হয়েছে এসব। অভিজিত বলেন, আমার অনেক গুরু। অনেক শিল্পীই আমায় অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে‌ন। সম্প্রতি ছ‌বি বিক্রির টাকা জমিয়ে মাসিক কিস্তিতে একটি ল্যাপটপ কিনেছেন অভিজিত। মাউসে হাত রেখে দুটি চোখে কত আশা। ইন্টারনেটে ছবি দেখবেন। অভিজিত বললেন, যন্ত্রটার মাধ্যমে দেশবিদেশের বহু শিল্পী বা শিল্পমনস্ক মানুষের সঙ্গে নিমেষে যোগাযোগ করতে পারছি। বহুদিন ধরে একটা ল্যাপটপ কিনব-কিনব ভাবছিলাম। টাকায় কুলোচ্ছিল না বলে ওটা হয়ে উঠছিল না। এবার একটা দিশা পাচ্ছেন কলকাতার এই লড়াকু শিল্পী।