বেঙ্গালুরুর শিল্প-সংস্কৃতির জগতে খোলা আকাশে ওড়বার হাতছানি দিচ্ছে "ওপেন স্কাই"

0

আজকের দিনে বেঙ্গালুরুর মত মুক্তচিন্তার ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে সমৃদ্ধ শহরের টিনএজারদের মধ্যে অ্যাকাডেমিকস্‌ এর জগতের বাইরে বেড়িয়ে এসে অন্যরকম কিছু চিন্তা ভাবনা করার এক নতুন ট্রেন্ড চালু হয়েছে। হাইস্কুল হয়ে উঠেছে কঠিন এবং কলেজ কঠিনতর। ফলে ছাত্রছাত্রীদের প্রতীক্ষা থাকে যে উইকেন্ড কবে আসবে এবং তারা তাদের প্রাত্যহিক নিয়মের বেড়াজ্বাল ভেঙে বেড়িয়ে এসে নিজস্ব সৃজনশীলতার জগতে ডুব দিয়ে এক ঝলক মুক্ত বাতাসে বুক ভরে নেবে।

টিম ওএসএস ব্যাঙ্গালোর - শ্রুতি মোহন, দীপ্তেন সরকার, ঐশ্বর্য আয়ার
টিম ওএসএস ব্যাঙ্গালোর - শ্রুতি মোহন, দীপ্তেন সরকার, ঐশ্বর্য আয়ার

ওপেন স্কাই স্ল্যাম (ও.এস.এস) হল এমনই একটি কমিউনিটি ভিত্তিক উদ্যোগ যা এই ধরণের কিশোর কিশোরীদেরকে তাদের নিজস্ব সৃজনশীলতার জগতে ডুব দিতে উৎসাহিত ও সাহায্য করে। যদিও এই উদ্যোগের শুরুয়াদ মূলত ব্যাঙ্গালোরের শিল্পোৎসাহীদের জন্যই, তবে ইদানীং এই সংস্থার কর্মকাণ্ড ক্রমশ ছড়িয়ে পড়েছে মুম্বাই, হায়দ্রাবাদ, পুনে, চেন্নাই, কালিকট হয়ে সুদূর অস্ট্রেলিয়ার গোল্ড কোস্ট পর্যন্ত যেখানে এঁরা নাচ গান কবিতা ও ম্যাজিক শো ইত্যাদি নিয়ে একটি সামগ্রিক মঞ্চকে উপস্থাপিত করছেন। আর কেবল অস্ট্রেলিয়া নয়, আমাদের ঘরের পাশের প্রতিবেশী পাকিস্তান থেকে তরুণ শিল্পীদের আনা হচ্ছে এবং এখানকার শিল্পীদের ওদেশে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আর এই ভাবে সীমান্তের দুই পাড়ের নতুন জেনারেশানের আইডিয়া, হবি, রাজনৈতিক মতাদর্শ, চিন্তা-ভাবনা ইত্যাদির আদান প্রদান চলছে। আর আনন্দের কথা হল এই যে এর ফলে সীমান্তের দুই পাড়ের শিল্পীরা একে অপরের মধ্যে খুঁজে পাচ্ছেন নতুন বন্ধু।

আজ থেকে বছর খানেক আগের এক সুন্দর সকালের কথা। শন ডি’সুজা ও টিম লো সুরদো নামক দুই কুড়ি বছরের তাজা যুবক নিজেদের বাড়ির ছাদে কিছু বন্ধু বান্ধব জুটিয়ে একটি তাৎক্ষণিক কবিতা রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছেন। সঙ্গে ডেকে নিয়েছেন কিছু নাচ গান জানা বন্ধুদেরকেও যাতে তাদের এই নতুন অভিযানকে করে তোলা যায় আরেকটু জমকালো। আর অচিরেই এই ছোট্ট ঘরোয়া অনুষ্ঠান থেকেই জন্ম নিল এক সুদূরপ্রসারী স্বপ্নের, যে স্বপ্ন আজ যেন অনেকটাই বাস্তব। এ প্রসঙ্গে শন বলেন,

“সৃজনশীল মানুষের ক্ষমতার প্রতি আমার চিরকালই অগাধ বিশ্বাস, তাঁরাই পারেন এই পৃথিবীটাকে বদলে দিতে। ওপেনস্কাই এমন একটি উদ্যোগ হিসাবে উঠে আসতে পেরেছে যেখানে প্রত্যেক শিল্পী ভালো খারাপের গথে বাঁধা গণ্ডীর বাইরে গিয়ে শুধুমাত্র শিল্পমাধ্যমের প্রতি তাঁদের ভালোবাসার জন্যই পারফর্ম করতে পারেন”।

আর তাই বহুবিধ ধারণা ও জীবনযাত্রার রঙচঙে মিশেলে ওএসএস হয়ে উঠেছে মুক্তমনাদের একটি সর্বাঙ্গসুন্দর মঞ্চ। জনপ্রিয়তার নিরিখে এঁরা এখন বেঙ্গালুরুতে এক নম্বরে আছেন। যদিও সংস্থার কাজ পরিচালনার জন্য রয়েছেন শ্রুতি মোহান (২১), দীপ্তেন সরকার (১৯) ও ঐশ্বর্য আইয়ার (১৯)-দের মত তরুণ তরুণীরা, তবে এঁদের অধিকাংশ কাজই সমবায় পদ্ধতিতে সকলের যৌথ অংশগ্রহণের মাধ্যমে হয়ে থাকে।

ওপেন স্কাই স্ল্যাম - তরুণ শিল্পোৎসাহীদের নিয়ে গড়ে ওঠা একটি কমিউনিটি
ওপেন স্কাই স্ল্যাম - তরুণ শিল্পোৎসাহীদের নিয়ে গড়ে ওঠা একটি কমিউনিটি

ওএসএস এর প্রধান শক্তি এর কমিউনিটি। সংস্থাটির দর্শন খুব সাধাসিধে ও পরিস্কার – যে শিল্পীর প্রয়োজন হবে সেই ওএসএস এর মুক্ত মঞ্চকে ব্যবহার করে কাজ করতে পারবেন, এবং সেখানে তাঁর শিল্পের গুনাগুণ বিচার করা হবেনা। তা সে কোনও নামকরা গায়ক হতে পারে কিম্বা কোনও আনকোরা কবি, ওএসএস সব ধরণের শিল্পীকেই তাদের মঞ্চ ব্যবহার করতে দেয় এবং যার যেটা করতে ভালো লাগে তা নিয়ে আরও এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করে। স্পনসরশিপের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে দীপ্তেন জানালেন যে, ওএসএস এর একমাত্র উদ্দেশ্য আর্ট এবং যদিও তারা সমস্ত রকম আর্থিক সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত তবে এর থেকে অর্থ উপার্জন করা তাদের উদ্দেশ্য নয়। আর্টের বানিজ্যিকরণ তাদের উদ্দেশ্য নয়, বরং তাঁদের প্রাথমিক লক্ষ্য হল কমিউনিটি ও গোষ্ঠীভিত্তিক সহযোগিতা এবং তার মাধ্যমে শিল্পীর সক্ষমতা প্রদান (empowerment)।এ প্রসঙ্গে শ্রুতি আরও জানালেন,

“ওপেনস্কাই এর কনসেপ্টটি কে বিভিন্ন শিল্প মাধ্যমের মানুষরা যে অ্যাকসেপ্ট করে নিয়েছেন এটাই আমাদের কাছে এক বিশাল প্রাপ্তি। আমরা এখানে ৫ থেকে ৫৫ পর্যন্ত সকল বয়সের পারফর্মার পেয়েছি। আর এরকম একটা ওয়েলকামিং পরিবেশ পেলে কেই বা না এসে থাকতে পারে? আর এখানে অংশগ্রহনকারী প্রত্যেকে আরও ভালো করার সুযোগ খুঁজছে। ও যেমন সব সময় অন্যদের কাজকর্ম থেকে শেখবার ও পরীক্ষানিরীক্ষা করার চেষ্টা করে। তেমন আমি একজন ক্লাসিক্যাল ডান্সার হওয়া সত্ত্বেও এই কমিউনিটি আমার মধ্যে কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে”।

স্কুল ছাত্রদের নিয়ে কাজের ফাঁকে টিম ওএসএস
স্কুল ছাত্রদের নিয়ে কাজের ফাঁকে টিম ওএসএস

ওএসএস কমিউনিটি বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে তাদের অনুষ্ঠান পরিচালনা করে থাকে। কাফে কিম্বা রেস্তোরাঁ, টিরেস কিম্বা বাগান, অনাথাশ্রম, উদ্ধারকেন্দ্র কিম্বা সরকারী স্কুল, ওসএসএ সর্বত্রগামী। কোনও একটি বিশেষ সামাজিক কারণের জন্য বিভিন্ন অংশগ্রহণকারীদের একটি অবিচ্ছিন্ন কমিউনিটি হিসাবে কাজ করতে উৎসাহ দেওয়া হয়। যেমন কোন দুঃস্থ ছাত্রের জন্য বই ও খেলাধুলোর সরঞ্জাম সংগ্রহ করা। তরুণ কবি ও শিল্পপ্রেমীদের এই কমিউনিটি একাধিক সরকারী স্কুলকে তাদের গ্রন্থাগার ও খেলার মাঠ তৈরিতে সহযোগিতা করেছে। এ প্রসঙ্গে শ্রুতির মনে পড়ে যায়,

“আমরা যখন প্রথম এরকম একটি উদ্যোগের কথা ভেবেছিলাম তখন এর কার্যকারিতা নিয়ে আমাদের মধ্যে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। কিন্তু আমরা আমাদের সন্দেহ নিয়েই একটা সরকারি স্কুলে “গ্রন্থাগার নির্মাণ” প্রজেক্টে হাত দিলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম, খুব বেশী হলে ৫০ টা বই সংগ্রহ করা বা কেনা সম্ভব হবে। কিন্তু অবাক কাণ্ড, নানা দিক থেকে প্রায় ৪০০ টা বই যোগার হয়ে গেল! ব্যাস, আমাদের আর পায় কে! প্রথমেই এরকম আশাপ্রদ সাড়া পেলে আর কি চাই? আর এর ফলে আমাদের প্রত্যয়ও অনেকটাই বেড়ে গেল বৈকি”।

প্রতিযোগিতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করায় ঐশ্বর্য আমাদের আলোচনায় জুড়ে গেলেন এবং বললেন, “আমরা কখনই অন্য সংস্থাদের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করিনি। অন্য কারুর সঙ্গে রেসারেসি করা আমাদের উদ্দেশ্যও নয়, আর আমরা তা করিওনা। আমরা মনে করি আর্ট সকলের জন্য আর এই দুনিয়াটা তার মঞ্চ। ওপেনস্কাই মূলত কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রচেষ্টা এবং আমরা কেবল মাত্র বিভিন্ন ধরনের শিল্প মাধ্যমের কোলাবরেশানে বিশ্বাসী।”

ওএসএস এর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা খুব ইউনিক। তারা তাদের এই আইডিয়া ছড়িয়ে দিতে চায় এবং বাকিটা কমিউনিটি নিজেই করে নেবে। শ্রুতি বলছেন, “আমরা প্রত্যেক কোণে কোণে ছড়িয়ে পড়তে চাই এবং ওপেনস্কাই এর আইডিয়াটা ছড়িয়ে দিতে চাই যাতে বেশী বেশী করে মানুষ খোলসের মধ্যে থেকে বেড়িয়ে আসে এবং সমস্ত রকম মাধ্যমে আর্ট এর আনন্দে মজে ওঠে। আমরা এমন একটি পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি যেখানে কারুর প্রতিভা প্রকাশ করার জন্য কলেজ ফেস্ট বা পারিবারিক অনুষ্ঠানের অপেক্ষায় বসে থাকতে হবেনা, বরং নিজের পাড়ায় কোনো একটা স্ল্যাম দিয়েই হয়ত তার ঘুম ভাঙ্গবে। আমরা এরকমই একটা পৃথিবীতে বড় হয়ে উঠতে চাই।”

প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো বলেছিলেন, “প্রত্যেক শিশুই একজন শিল্পী। কিন্তু বড় হওয়ার পরেও কিভাবে সেই শিল্পীস্বত্ত্বা কে বাঁচিয়ে রাখা যায় সেটাই সমস্যার”। তবে বেঙ্গালুরুর মত শহরে ওপেনস্কাই এর মত সংস্থার আবির্ভাবের ফলে এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব শিশুই যে তাদের শিল্পীস্বত্বাটিকে হারিয়ে ফেলবে তা নয়, ওএসএস এর সাফল্যই তার প্রমাণ।


স্টোরি- সৌরভ রায়

অনুবাদ - শঙ্খ শুভ্র গাঙ্গুলি