দুধের স্বাদ ঘোলে মিটল না

1

চতুর্দিক বাজেট বিশ্লেষণে মুখর। শিল্প-মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। এক শ্রেণির স্টার্টআপ কর্তাদের বেজার মুখ। কর্মচারীরাও খুশি নন। শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণি মনে করছে গ্রামের মানুষের কথা ভেবে বাজেট করেছেন জেটলি। আর গ্রামের গরিব কৃষকও বলছে এতে লাভের গুড় খাবে বড় জোতদার আর ধনী কৃষক। দেশের দরিদ্র মানুষের জন্যে স্বাস্থ্য বীমা ঘোষণা হয়েছে ঠিকই কিন্তু তা কতটুকু কার্যকর হবে তা নিয়ে সংশয় দানা বাঁধছে। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনকে মাথায় রেখে এমনই বাজেট পেশ করেছেন জেটলি সাহেব যে, সাধারণ মানুষের মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে বাজেটের দিশা।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন হতাশা আর ঘাবড়ে গিয়ে বাজেট করেছে বিজেপি। বাম্বু মিশন আর গোবর্ধন ছাড়া নীতি নেই। বলছে বাম্বু মিশন করবে। মাথায় এলো কোথা থেকে? স্বাস্থ্য প্রকল্পের নামে পুরোটাই ভাঁওতা। ... আসলে ওরা বাজেট করতেই জানেন না।

মুখ্যমন্ত্রীর এই ঝাঁঝালো প্রতিক্রিয়ার মূল সুর রাজনৈতিক। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের মতে দেরিতে হলেও বোধোদয় হয়েছে বিজেপির। গ্রামের দিকে চোখ ফেরানোর ফুরসত পেয়েছেন মোদি। চেষ্টা করেছেন দেশের আপামর অসহায় দরিদ্র শ্রেণির মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর। গরিব মানুষের জন্যে যদি স্বাস্থ্য বীমা কার্যকর হয় তবে তাও অনেক।

বিরোধীরা বিশ্লেষণ করে বলছেন এসব স্টান্ট। বিজেপি শাসিত রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিসগঢ়ে ভোটের কথা মাথায় ছিল বিজেপির। কারণ এই রাজ্যগুলিতে ইতিমধ্যেই কৃষক আন্দোলন বিক্ষোভ শুরু হয়ে গিয়েছে। রাহুল গান্ধীর টিম সেই ক্ষোভে থেকে থেকেই হাওয়া দিচ্ছে। বাজেটের দিনই ফল বেরল রাজস্থানে দুটি লোকসভা কেন্দ্র এবং একটি বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনের তিনটেতেই হেরেছে বিজেপি। জিতেছে কংগ্রেস। ভাত সিদ্ধ হল কিনা দুটো চাল টিপেই বোঝা যায় ফলে বিজেপি শাসিত রাজ্যেই বিজেপির শিরে সংক্রান্তি। বিজেপি ক্ষমতা পেতে চায় এমন সব রাজ্যেও ভোট আসছে। কিন্তু সেখানে পালে এখনও হাওয়া ফেরাতে পারেননি টিম অমিত। ফলে সেদিকে নজর রেখেই বাজেট পেশ করলেন জেটলি সাহেব।

অর্থমন্ত্রী এবছরের বাজেটকে সামাজিক দর্শনের বাজেট হিসেবে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। দরিদ্র মানুষের জন্যে বিশ্বের সব থেকে বড় স্বাস্থ্য বীমার ঘোষণা করে ওবামাকেয়ারের আদলে মোদিকেয়ার চালু করতে চেয়েছে মোদি সরকার। গরিব মানুষের চিকিৎসায় পরিবার পিছু পাঁচ লাখ টাকার বীমা ঘোষণা করেছেন জেটলি এটাই সব থেকে বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রস্তাব।

কৃষকদের কথা মাথায় রেখে একগুচ্ছ প্রকল্পেরও ঘোষণা হয়েছে। মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস বা এম এস পি দেড়গুণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ফসল ফলানোর খরচের দেড়গুণ ন্যূনতম সহায়ক মূল্য দেবে কেন্দ্র। এই বৃদ্ধি কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতেই পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আখেরে লাভের গুড় খেয়ে যায় ধনী কৃষক। কারণ যার উৎপাদন যত বেশি তিনি তত বেশি ভর্তুকি পান। আর অভিজ্ঞতা বলছে এই ধরণের পদক্ষেপে ফসল নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ যখনই কৃষক জেনে যান কোনও ফসল বাজার চলতি দামের চেয়ে বেশি দামে সরকার কিনতে বাধ্য তখন সেই ফসল ফলানোর হিড়িক পড়ে যায়। উদ্বৃত্ত শস্যের পরিমাণ বাড়তে থাকে। ফলে এর সুফল কৃষককে কতটুকু খুশি করবে তা ভোট বাক্সে প্রতিফলিত হবে ঠিকই কিন্তু আখেরে দেশের অর্থনীতির কোনও উপকারে আসবে না। সম্প্রতি আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি সম্পাদকীয়তে এই নিয়ে আলোকপাত করেছেন অর্থনীতিবিদ মৈত্রীশ ঘটক।

আগামী লোকসভা নির্বাচনের আগে এই বাজেট থেকে অনেক কিছুই পাওয়ার আশা করেছিল দেশ। কিন্তু ইমেজ কারেক্ট করতে গিয়ে পেনি ওয়াইজ ডলার ফুলের মতো আচরণ করে ফেললেন নরেন্দ্র মোদি। একথা বলছে সঙ্ঘ পরিবারের সংগঠন ভারতীয় মজদুর সঙ্ঘ। শ্রমিকদের কথা ভাবাই হয়নি বলছেন তাঁরা।

শুধু কি তাই, মিড ডে মিলের মত প্রকল্পও বঞ্চিত হয়েছে। একটা পয়সা বরাদ্দ বাড়ায়নি সরকার। অথচ জিনিস পত্রের দাম বেড়েছে। স্কুল পড়ুয়ার সংখ্যা বেড়েছে। নিম্ন প্রাথমিকের পড়ুয়াদের মাথা পিছু বাজেট ৪টাকার একটু বেশি আর উচ্চ প্রাথমিকের পড়ুয়াদের মাথাপিছু বাজেট ৬ টাকার একটু বেশি। সুষম আহারের পরিকল্পনা এই চার টাকা ছ'টাকায় কীভাবে সম্ভব তা নিয়ে মাথাই ঘামাননি জেটলি।

মাথা ঘামাননি স্টার্টআপ দুনিয়ার চাহিদাতেও। মনে রাখতে হবে দেশের মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশের বয়স ২৫ বছরের কম। এবং ৬৫ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের কম। অর্থনীতির দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে গেলে এই সংখ্যাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেকথা মাথায় রাখতে পারতেন অর্থমন্ত্রী। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্টার্টআপ সংস্থা গুলি যে ভাবে গজিয়ে উঠছে এবং প্রযুক্তি ক্ষেত্রে উদ্ভাবনগুলি মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে যে ভাবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে শুরু করেছে সেখানে এই অংশের কথা ভাবাটা অরুণ জেটলির উচিত ছিল বলে মনে করেন স্টার্টআপ উদ্যোগপতিরা। ক্রিপ্টো কারেন্সি সম্পর্কে সরকারের মনোভাবও স্টার্টআপ সংস্থাগুলিকে হতাশ করেছে। বাজেটে স্পষ্ট ভাষায় জেটলি জানিয়ে দিয়েছেন ক্রিপ্টো-কারেন্সিকে আদৌ বৈধ কারেন্সি বলেই মনে করে না কেন্দ্র। ফলে এই ধরণের ভার্চুয়াল কারেন্সি লেনদেন বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর জেটলি সাহেব। পাশাপাশি অ্যাঞ্জেল ট্যাক্স নিয়ে কোনও আলোচনার অবকাশ রাখেননি অর্থমন্ত্রী। যদিও মৌখিক ভাবে কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প আর স্টার্টআপকে একই বন্ধনীতে ফেলে তাদের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেছেন।

ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড এবং অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টরদের বৃদ্ধির কথা মাথায় রেখে সরকার যে ইতিমধ্যেই বেশ কিছু পরিকল্পনা নিয়েছে এবং আগামী দিনেও পদক্ষেপ করতে চায় সেই বিষয়েও উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু উপযুক্ত দাওয়াই নেই এই বাজেটে।

তবে স্টার্টআপ দুনিয়ার কারও কারও অবশ্য দুধের সাধ ঘোলে মিটেছে। অর্থমন্ত্রী বাজেট ভাষণে সাইবার টেকনোলজি এবং ইমার্জিং টেকনোলজির জন্যে সেন্টার অব একসেলেন্স তৈরি করার কথা বলেছেন। তাতেই খুশি ডিজিটাল ইন্ডিয়া। ব্লকচেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, রবোটিক্স এবং ইন্টারনেট অব থিংগসের মত বিষয়গুলি নিয়ে কাজ করছে এমন স্টার্টআপরা কিংবা ফিনটেক সংস্থাগুলি এর মধ্যেই আশার আলো দেখতে পাচ্ছে। ৩ হাজার তিয়াত্তর কোটি টাকাও বরাদ্দ হয়েছে ডিজিটাল ইন্ডিয়ার স্বপ্ন সফল করার লক্ষ্যে। যদিও ডিজিটাল ইন্ডিয়ার কাজ নিয়ে ২০১৭ সালের কর্মকাণ্ড নিয়ে খুশি নয় কেউই। এবছর গতবারের ত্রুটি সরিয়ে আরও সংহত হবে কেন্দ্র এটাই আশা করছেন সকলে।

জেটলি জানিয়েছেন সরকার আরও দশ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করবে দেশের ডিজিটাল পরিকাঠামো তৈরির কাজে। ভারত নেট প্রকল্পে এই টাকা ব্যবহৃত হবে। ২০১৯ এর মার্চের মধ্যে আড়াই লক্ষ গ্রাম-পঞ্চায়েতকে ভারত নেট প্রকল্পের আওতায় যুক্ত করা যাবে। এ ক্ষেত্রে মনে রাখার দরকার, ভারত নেট প্রকল্পের প্রথম দফার কাজ শেষ। এক লক্ষ গ্রাম পঞ্চায়েতকে ইতিমধ্যে অপটিকাল ফাইবার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে জুড়ে দেওয়ার কাজটা সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে। শুধু তাই নয়, দেশের গ্রামাঞ্চলে ৫ লক্ষ ওয়াইফাই হটস্পট তৈরি করার পরিকল্পনাও নিয়েছে কেন্দ্র। যার ফলে ৫ কোটি মানুষকে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সুবিধে দেওয়া যাবে। এর ফলে গ্রামীণ ভারতে ইন্টারনেট পেনেট্রেশন বাড়বে।

আর ব্লকচেন নিয়ে সরকারের উৎসাহে উল্লসিত স্টার্টআপ দুনিয়া। কালারি ক্যাপিটেলসের মালকিন বাণী কোলা বলছেন, এটা মানুষের পক্ষে একটা ছোট্ট প্রয়াস কিন্তু মানবতার জন্যে অনেকটাই বড়। যার অর্থ তিনি আশাবাদী। ব্লকচেন প্রযুক্তি বিষয়ে ভারতের আনুষ্ঠানিকভাবে যে আগ্রহ সেটাই এই দেশের ভবিষ্যতকে আরও সমৃদ্ধ করবে।